১. কৈফিয়ত
‘আমার-দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বাহির হইবার পর দেশের রাজনীতিক জীবনে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটিয়াছে। সে পরিবর্তন আইউব শাহির অবসান। গণ আন্দোলনের ফলেই এই ডিক্টেটরের পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু সে পতনের ফল জনগণ ভোগ করিতে পারে নাই। কারণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় নাই। পুনরায় মার্শাল ল প্রবর্তিত হইয়াছে।
কাজেই আমিও আমার বই-এর ‘পুনশ্চ’ লিখিতে বসিলাম। চিঠি-পত্রেই পুনঃ লেখার রেওয়াজ আছে। বই-এ পুস্তকে পুনশ্চ লেখার রেওয়াজ নাই। তবু পুস্তকটিকে আপ-টু-ডেট করিবার জন্যই এই ‘পুনশ্চ’ লেখা আবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে। একটি আলাদা অধ্যায় না লিখিয়া ‘পুনশ্চ’ লিখিলাম কেন, বিভিন্ন পাঠক তার বিভিন্ন কারণ আৰিার করিতে পারেন। কিন্তু আমার নিজের বিবেচনায় কারণ মাত্র তিনটি।
এক, আমার বই এর শেষ অধ্যায়ের নাম কালতামামি। সে ‘কালতামামিতে’ আমি ‘ইন্টারিম রিপোর্ট দিয়াছি’, ‘ফাইনাল রিপোর্ট’ দেই নাই। তারপরে দুই বছর চলিয়া গিয়াছে। আরেকটা মার্শাল ল হইয়াছে। সেটা আজও চলিতেছে। তাই ফাইনাল রিশোরে সময় আসে নাই। পাকিস্তানের ইতিহাসেই নতুন অধ্যায় যোগ হয় নাই। এ অবস্থায় আমার বই-এ একটা নূতন অধ্যায় যোগ করা ভাল দেখায় না।
দুই, ইকারিম রিপোর্টকে ‘ফাইনাল রিপোর্ট’ না করা পর্যন্ত আরেকটা অধ্যায় লেখাও যায় না। শুধু আরেকটা অধ্যায় যোগ করার জন্যই যদি ‘ইনটারিম রিপোর্টকে’ ‘ফাইনাল রিপোর্ট’ করিতে চাই,তবে শেরে-বাংলার স্বনামধন্য আফিমুদ্দিন দারোগার ‘ফাইনাল রিপোর্টের মতই ফাইনাল রিপোর্ট লিখিতে হয়। পাঠকরা প্রায় সবাই আফিমুদ্দিন দারোগা সাহেবকে জানেন। শেরে-বাংলা তাঁর সন্তুর বছরের রাজনীতিক জীবনের হাজার-হাজার জনসভায় লক্ষ-লক্ষ শ্রোতার কাছে এই দারোগা সাহেবের ফাইনাল রিপোর্টের কথা বলিয়াছেন। তাতে দারোগা সাহেব হইয়াছেন যেমন মশহুর, তাঁর ‘ফাইনাল রিপোর্ট’টিও হইয়াছে তেমনি চিরস্মরণীয়। এই রিপোর্টে দারোগা সাহেব লিখিয়াছিলেন : ‘কেস টু নো ক্লু; সাইনড আযিমুদ্দিন।‘ আমার ইন্টারিম রিপোর্টকে ফাইনাল রিপোর্ট করিতে হইলে দারোগা সাহেবকেই অনুকরণ করিতে হয়। কারণ কেস মোটামুটি একই। কিন্তু ফার্দার ক্লু’র আশায় আমি তা করিলাম না। আমার রিপোর্টওফাইনাল হইল না। নয়া অধ্যায়ও লেখা হইল না।
তিন, আমাদের শাসকগোষ্ঠীর প্রায় সকলের স্বীকৃত মতেই পাকিস্তান রাষ্ট্র ও পাকিস্তানী জনগণ পুনঃ পুনঃ ধ্বংসের কাছাকাছি আসিয়া পড়িতেছে। প্রতিবারই একজন রক্ষা কর্তা আসিয়া আমাদের সে ‘আসন্ন ধ্বংস’ হইতে ‘রক্ষা’ করিতেছেন। কিন্তু প্রতিবারই আমরা ধ্বংসের অধিকতর নিকটবর্তী হইতেছি। প্রতিবারই পরের বারের রক্ষাকর্তা আসিয়া বলিতেছেন। এমন ঘোর সংকট পাকিস্তানের জীবনে আর হয় নাই। এ কথার তাৎপর্য এই যে আগের বারের রক্ষা-কা, যে পরিমাণ বিপদ হইতে আমাদিগকে রক্ষা করিয়াছিলেন, পরের বারের রক্ষাকর্তার সামনের বিপদ তার চেয়ে অনেক বেশী ঘোরতর। এ কথার মানে এই যে আগের বারের রক্ষা কর্তা, আমাদিগকে বিপদ হইতে রক্ষা করিতে গিয়া আরও বেশী বিপদে ফেলিয়াছেন। গোলাম মোহাম্মদ হইতে জেনারেল আইউব, জেনারেল আইউব হইতে জেনারেল ইয়াহিয়া সবাই পাকিস্তানকে আসন্ন ধ্বংসের হাত হইতে রক্ষাও যেমন করিয়াছেন, দেশকে তেমনি ধ্বংসের আরও কাছে পাইয়াছেন। দুই-দুইবারই মার্শাল ল’ প্রবর্তনের প্রয়োজন হইয়াছে। আগের বারে গোলাম মোহাম্মদ যা করিয়াছিলেন, সেটাও কার্যতঃ মার্শাল ল’ই ছিল। কাজেই দেখা যায় পুনঃ পুনঃ মার্শাল ল’ই আমাদের বরাত। বর্তমান মার্শাল ল’ উঠাইবার জন্য প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া স্পষ্টতঃই আন্তরিক চেষ্টা করিতেছেন। তা সত্ত্বেও আমাদের বরাতের দোষেই নেতাদের কার্য কলাপে ‘ঠকের বাড়ির নিমন্ত্রণে’র মত যা ঘটিতে পারে তারই নাম পুনশ্চ।
২. রাজনৈতিক ঘুর্ণীঝড়
১৯৪৮, ১৯৫৮, ১৯৬৮ এই তিনটি সালই আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতির পিতা কায়েদে-আযমের আকস্মিক জীবনাবসান। দশ বছর পরে ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তানে গণতন্ত্রের অবসান। আরও দশ বছর পরে ১৯৬৮ সালের অক্টোবর মাসে গণতন্ত্র হত্যাকারী জেনারেল আইউবের স্বৈরাচারের অবসান।
প্রথম দুইটি সাল সম্বন্ধে কোনও অস্পষ্টতা ও দ্বিমত নাই। কিন্তু তৃতীয়টির বেলা তেমন স্পষ্টতা নাই বলিয়া দ্বিমত হইতে পারে। দৃশ্যতঃ জেনারেল আইউকের পতন ঘটে ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে। কিন্তু যাঁরাই ঘটনাবলী অবলোকন পর্যবেক্ষণ ও অনুধাবন করিয়াছেন তাঁরাই জানেন যে ছয় মাস আগেই ১৯৬৮ সালের অক্টোবরে আইউবের পতন অবধারিত ও সুনিশ্চিত হইয়া গিয়াছিল। প্রেসিডেন্ট আইউবের ফুসফুসের সাংঘাতিক ব্যারামটা আসলে তাঁর অসুখের কারণ নয়, পরিণাম। আইউব বুদ্ধিমান ব্যক্তি। দেওয়ালের লিখন তিনি পড়িতে পারিয়াছিলেন। বিপদ আসন্ন তিনি বুঝিতে পারিয়াছিলেন অনেক আগেই। জুয়ারী যেমন ডেম্পারেট হইয়া মরি বাঁচি যা থাকে কপালে বলিয়া সর্বস্ব দিয়া শেষ ‘দান’ ধরে,আইউব তার শেষ ‘দান’ ধরিয়াছিলেন ‘উন্নয়ন দশকে’। ‘শেষ দানে’ জুয়ারীর ভাগ্য পরিবর্তনও হইতে পারে; আবার পতন ত্বরান্বিতও হইতে পারে। প্রেসিডেন্ট আইউবের বেলা এই পরেরটাই ঘটিল।
