(৮) এই রাজধানী স্থানান্তরে রাষ্ট্রের রাজধানী ও কেন্দ্রীয় সরকারকে পূর্ব পাকিস্তানী জনগণের নাগালের বাহিরে নেওয়া হইয়াছে। কোস্টাল ট্রাফিক ন্যাশনালাইজ করিয়া জাহাজের সংখ্যা বাড়াইয়া সাবসিডির সাহায্যে তাড়া কমাইয়া রাজধানীতে যাতায়াত পূর্ব-পাকিস্তানীদের জন্য সহজ ও সুলভ করিয়া এবং উভয় অঞ্চলের জনসাধারণের মধ্যে অধিকতর প্রত্যক্ষ ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা করিয়া জনগণের স্তরে জাতীয় সংহতিকে সফল করিবার যে বিপুল সম্ভাবনা ও একমাত্র পন্থা ছিল, রাজধানীকে সমুদ্র পথ হইতে বহু দূরে সরাইয়া সে সম্ভাবনা ও পন্থা চিরতরে লোপ করা হইয়াছে।
আইউব যতগুলি সেট বিষয় আসেটল্ড করিয়াছেন, তার মধ্যে রাজধানী স্থানান্তরটাই সবচেয়ে মারাত্মক। মারাত্মক এই জন্য যে আইউব-কৃত অন্যান্য ওলট পালটের সংশোধনের মত সহজে এটার সংশোধন হইবে না। হইবে না এই জন্য যে যাদের ঘরের দুয়ারে রাজধানী গিয়াছে তাঁরা ছাড়িতে চাহিবেন না। অর্থ-ব্যয় বারবার রাজধানী স্থানান্তর ইত্যাদি অনেক কুযুক্তি দিবেন। দেওয়া শুরুও করিয়াছেন। রাজধানীর হকদার ছিল পূর্ব-পাকিস্তানীরা। শুধু জাতির পিতার খাতিরে তারা করাচিতে রাজধানী মানিয়া লইয়াছিল। পশ্চিম পাকিস্তানীরা যদি কায়েদের স্মৃতির মর্যাদা না দেয়, তবে একা পূর্ব-পাকিস্তানীরা দিলে কি লাভ? অতএব পূর্ব-পাকিস্তানীরা এখন ন্যায়তঃই চাইবে ঢাকায় রাজধানী আসুক। এটা শুধু মেজরিটির গণতান্ত্রিক দাবিই নয়, শতকরা নৰ্বইজন পূর্ব-পাকিস্তানী নব্বই বছর বাঁচিয়াও নিজের দেশের রাজধানী দেখিয়া মরিতে পারিবে না, প্রশ্নটা শুধু তাও নয়, রাজধানীর সংগে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও অর্থ বন্টন ও প্রয়োগ, আঞ্চলিক অসাম্য দূরীকরণ, সরকারী-বেসরকারী চাকুরী, সাপ্লাই, কন্ট্রাকদারি, বিদেশী মিশন ইত্যাদি সমস্ত ব্যাপারই অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। অবস্থাগতিকে অন্যান্য সব কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানই পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। কাজেই পূর্ব পাকিস্তানীরা রাজধানী ছাড়া বাঁচিতে পারে না। এই জটিল সমস্যাটিই আইউব খুলিয়া দিয়াছেন।
(৯) পার্টি-রাজনীতিকে মসি-মলিন কুৎসিৎ করা হইয়াছে। প্রেসিডেন্সিয়াল বা পার্লামেন্টারি কেবিনেট যে সিস্টেমেই দেশ শাসিত হউক না কেন, রাজনৈতিক পার্টি উভয় ক্ষেত্রেই আবশ্যক। বর্তমান বিপ্লব এই দলীয় রাজনীতিকেই কুৎসিৎ মসিলিপ্ত ও বদ-সুরত করিয়াছে। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট আইউব নিজে কায়েদে-আযমের পরিচালিত ও পাকিস্তান অর্জনকারী মুসলিম লীগের নামানুসারে নিজের পার্টি খাড়া করিয়াছেন বটে কিন্তু তাতে ঐ মুসলিম লীগকে পার্টির মর্যাদা দেওয়া হয় নাই, ক্যারিকেচার করা হইয়াছে মাত্র। কায়েদে-আযম গভর্নর জেনারেল হইয়া মুসলিম লীগের সভাপতিত্বে ইস্তাফা দিয়াছিলেন। আইউব সাহেব হেড-অব-দি স্টেট হিসাবেই হেড-অব-দি- মুসলিম লীগ হইয়াছে ও থাকিতেছেন। এই মুসলিম লীগের অফিসবিয়ারাররা নির্বাচিত হন না। প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিয়োজিত ও পদচ্যুত হন। নির্বাচনে ‘মুসলিম লীগ মেনিফেস্টো’ প্রচারিত হয় না, হয় ‘মাই মেনিফেস্টো’।
(১০) গণতন্ত্রের চেহারা খারাপ করা হইয়াছে। প্রেসিডেনশিয়াল ও পার্লামেন্টারি এই দুইটা পশ্চিমী গণতান্ত্রিক পন্থা ছাড়াও সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহে যে পার্টি ডিক্টেটরশিপ চলিতেছে, তাকেও গণতান্ত্রিক বলা যায় এবং বলা হইতেছে। কারণ, সেখানে রাষ্ট্রনায়করা পশ্চিমা গণতন্ত্রের মত সোজাসুজি ভোটারদের আয়ত্তাধীন না হইলেও পার্টির সদস্যগণের কর্তৃত্বাধীন। কিন্তু আইউব সাহেব যে পদ্ধতি প্রচলন করিয়াছেন, তাতে প্রেসিডেন্ট ও তার মন্ত্রীদের উপর মুসলিম লীগ পার্টির বা আইন পরিষদের অথবা ইলেকটরেল কলেজ নামক ব্যাসিক ডিমোক্র্যাটদের কোনও ক্ষমতা নাই। কারণ ব্যাসিক ডিমোক্র্যাটরা সরকারী কর্মচারির অধীন। সরকারী কর্মচারিরা প্রেসিডেন্টের অধীন। কাজেই এটা আসলে পার্টি-ডিক্টেটরশিপনয়, ব্যক্তি-ডিক্টেটরশিপ। এটাকে ব্যাসিক ত দূরের কথা, কট্রোল ডিমোক্র্যাসি বলিলেও ‘ডিমোক্রাসি’ কথাটার অমর্যাদা করা হয়।
এইসব লোকসানের কুফলের সবগুলি মিলিয়া বা এর যে-কোনও দুই-একটা পাকিস্তানের সংহতি ও নিরাপত্তা বিপন্ন করিতে পারে এবং করিতেছে। দেশবাসীর দুর্ভাগ্য এই যে রাষ্ট্রনেতারা একজনের পর আরেকজন কেবল ভুলের উপর ভুলই করিয়া যাইতেছেন। পূর্ববর্তী সরকারের ভুল-ভ্রান্তির জন্য দেশবাসীর ভোগান্তির সীমা ছিল না। সেই ভোগান্তির অবসান ঘটাবার মহৎ উদ্দেশ্য লইয়া যাঁরা আসিলেন, তাঁরা আগের ভুলের প্রতিকারের বদলে নুতন করিয়া মারাত্মক সব ভুল করিতে লাগিলেন।
এতসব ভুল-ভ্রান্তি অন্যায়-অনাচার সহিয়াও পাকিস্তান টিকিয়া আছে। ইনশাআল্লাহ্ টিকিয়া থাকিবেও। কিন্তু এই টিকিয়া থাকায় নেতাদের কোনও কৃতিত্ব নাই। পাকিস্তান টিকিয়া আছে রাষ্ট্রনেতাদের জন্য নয়, তাঁরা সত্ত্বেও সকল দলের সকল আমলের রাষ্ট্রনায়করা চেষ্টা করিয়াও রাষ্ট্র ধ্বংস করিতে পারেন নাই খোদার ফযলে সে রাষ্ট্রের হায়াত আছে। এর শুধু টিকিয়া থাকার নয়, বাঁচিয়া থাকারও অধিকার আছে। বুদ্ধি যতই কম হউক, আর ভূল-ভ্রান্তি যতই জটিল হউক, বিশ বন্ধ সময় তা বুঝিবার জন্য যথেষ্ট। এবার সকলে মিলিয়া নয়া অভিজ্ঞতার আলোতে নব উদ্যমে পাকিস্তানকে সুগঠিত শক্তিশালী গণতান্ত্রিক আধুনিক রাষ্ট্রে ও পাকিস্তানীদের সুসংবদ্ধ মূখী ও সুশিক্ষিত নাগরিক-গোষ্ঠীতে পরিণত করিয়া ওদিককার কায়েদে আযম ও কায়েদে-মিল্লাক্সে আর এদিকের শেরে-বাংলা ও শহীদে-মিল্লাতের লাহোরের স্বপ্নকে সফল করিয়া কুন। আমিন।
৩১. পুনশ্চ
পুনশ্চ
