একটু গভীরভাবে ভলাইয়া চিন্তা করিলেই বুঝা যাইবে এবং বর্তমান শাসকরাও ধীরভাবে যথাসমন্ত্রে বিচার করিলে বুঝিবেন, মার্শাল আইন জারির দ্বারা যে বিপ্লব আমাদের দেশে আনা হইয়াছে মোটের উপর তাতে আমাদের লাভের চেয়ে লোকসান হইয়াছে অনেক বেশি। সে পোকানগুলির কুফল মারাত্মক, সুদূরপ্রসারী। সে সবের প্রতিকার খুব কঠিন, সংশোধন খুবই সময়সাপেক্ষ। এমন কয়টি ব্যাপারের দিকে দেশবাসী এবং বর্তমান শাসকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াই আমার এই ইন্টারিম কাল তামামি শেষ করিতে চাই।
৬. লোকসানের খতিয়ান
সংক্ষেপে এইসব লোকলানের সংখ্যাও মোটামুটি দশটি। যথা:
(১) মার্শাল ল প্রবর্তনে গণতান্ত্রিক আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তানের ইমেজ ভাংগিয়া গিয়াছে। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দুনিয়ার নযরে বর্তমানে ভারতই যে এশিয়ার একমাত্র ‘শো পিস অব ডেমোক্র্যাসি’ আখ্যা পাইতেছে, এই সাটিফিকেটের হকদার পাকিস্তানও ছিল। মার্শাল ল প্রবর্তন জাটিফাই করিতে গিয়া পাকিস্তানের সে অধিকার হরণ করা হইয়াছে।
(২) রাজনৈতিক চেতনা-সম্পন্ন গণতন্ত্রে সুশিক্ষিত এবং স্বায়ত্তশাসনের সম্পূর্ণ উপযুক্ত বলিয়া পাকিস্তানের জনগণের যে একটা সুনাম ছিল, সে সুনাম কলংকিত হইয়াছে। এটা সাংঘাতিক রকম মারাত্মক হইয়াছে এই জন্য যে পাশ্ববর্তী এবং গতকালের একই জনতার অংশ ও একই পরিবেশের সৃষ্ট ফল ভারতীয়দের সংগে তুলনায় আমাদেরে হীন ও অনুন্নত জাতি বলিয়া প্রমাণ করা হইয়াছে। এর তাৎপর্য প্রাক-স্বাধীনতা যুগের ভারতীয় হিন্দু ও ভারতীয় মুসলমানের তুলনায় হিন্দুদিগকে মুসলমানদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলিয়া সার্টিফিকেট দিয়াছে। ভারতের হিন্দুদের স্বাধীনতা আলোলনে ভারতীয় মুসলমানেরা বাধা দিয়া ইংরাজের তাবেদারি করিয়া ভারতে ইংরাজ শাসন বহাল রাখিবার চেষ্টা করিয়াছিল, হিন্দুদের এই অভিযোগ সত্য প্রমাণ করা হইয়াছে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের বিকশিত ও প্রসারিত কাঠামোর উপর রচিত ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র বাতিল করিয়া ১৯১৯ সালের শাসনতন্ত্রের সংকুচিত কাঠামোর উপর ১৯৬২ সালের শাসন জারি করিয়া প্রমাণ রা হইয়াছে, ভারতবাসী অর্থাৎ প্রাক-স্বাধীনতার ভারতীয় হিন্দু গণতান্ত্রিক স্বায়ত্তশাসনের যোগ্য বটে কিন্তু মুসলমানরা সে যোগ্যতা আজো অর্জন করে নাই। তাদের ফের-গুরু,সে শুরু করিয়া ১৯১৯ সালের গ্র্যাজুয়েল রিয়েলিযেশন অব সেলফ গবর্নমেন্ট ট্রেনিং দিতে হইবে। সেই জন্যই ১৯১৯ সালের আগের লর্ড রিপনের আমলের মত মিউনিসিপ্যালিটি ও জি। বোর্ডে সরকার মনোনীত অফিশিয়াল চেয়ারম্যানের বিধান পুনঃপ্রবর্তন করা হইয়াছে।
(৩) পাইকারীভাবে সমস্ত রাজনীতিকদের অর্ডিন্যান্স বলে অপরাধী সাব্যস্ত করিয়া পাকিস্তানের জাতীয় নেতৃত্বই মসি-লিপ্ত করা হইয়াছে। এই ব্যবস্থাটা উপরের দুই নম্বর দফায় খুবই পরিপূরক হইয়াছে। বলা হইয়া গিয়াছে যেমন, তেমনিভারে নেতা। এই সব দণ্ডিত নেতাদের প্রায় সবাই কায়েদে-আযম ও কাস্লেদে-মিল্লাতের সহচর অনুচর সহকর্মী ও মন্ত্রী ছিলেন। ‘সহচর দিয়াই মানুষের বিচার করা যায়’ এই নীতির বলে এতে কায়েদে আযম-কায়েদে মিল্লাতেরও বিচারটা হইয়া গেল। প্রাক স্বাধীনতা যুগে হিন্দু-নেতারা মুসলিম-নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মুখে-মুখে যে সব গাল দিলে, আইউব সাহেব হাতে-কলমে প্রমাণ করিয়া দিয়াছেন।
(৪) ভোটাধিকার খাটাইবার যোগ্যতা নাই, এই অভিযোগেই পাকিস্তানের সগণের ভোটাধিকার কাড়িয়া নেওয়া হইয়াছে। এই অহমতের দ্বারা পাকিস্তানের বুনিয়াদী অসুলই উড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে। তোট দিয়াই জনগণ পাকিস্তান হাসিল করিয়াছিল। কলা হইয়া গেল ওটাও ছিল ভোটাধিকার প্রয়োগের অযোগ্যতার প্রমাণ।
(৫) পাকিস্তান রাষ্ট্রের ফেডারেল কাঠামো ভাংগিয়া দিয়া সে স্থলে ঐকিক ইউনিটারি কে দাঁড় করাইয়া পাকিস্তানের মূল পরিকল্পনার ভিত্তি ভাংগিয়া দেওয়া হইয়াছে। তাতে পাকিস্তানের সংহতি ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করা হইয়াছে।
(৬) এতে উভয় অঞ্চলের পাকিস্তানীদের ঐক্য-বোধের মূলে কুঠারাঘাত করা হইয়াছে। তাদের মধ্যে ‘আমরা’ ও ‘তোমরা’-ভাব সৃষ্টি করা হইয়াছে। প্রেসিডেন্ট আইউব নিজে পূর্ব-পাকিস্তানীদের ‘ভারতের আদিম অধিবাসী, ধর্ম-কৃষ্টিতে হিন্দু প্রাবাধীন, চির-পরাধীন, সন্দেহপরায়ণ ও স্বাধীন জীবনযাপনে অনভ্যস্ত’ আখ্যা দিয়া এবং পূর্ব ও পশ্চিমের গৃহযুদ্ধের হুমকি দিয়া জাতীয় সংহতির ঘোরতর অনিষ্ট করিয়াছেন। এসব কথা বলিতে গিয়া তিনি শুধু গোটা পূর্ব-পাকিস্তানীদের উপর অবিচারই করেন নাই; সত্য ও ইতিহাসের তিনি অপমান করিয়াছেন। এই পরিস্থিতি ব্যক্তির সৃষ্ট নয়, বিপ্লবের কুফ; কারণ স্বয়ং আইউব সাহেবই বিপ্লবের অবদান।
(৭) জাতির পিতা কায়েদে-আযমের জন্মস্থান ও মৃত্যুস্থান করাচি হইতে জাতির পিতার নিজ হাতে স্থাপিত রাজধানী সরাইয়া পাঞ্জাবে নিয়া যাওয়ায় জাতির পিতার সমান, মর্যাদা ও ইমেজে আঘাত করা হইয়াছে। জাতির পিতার ইমেজ তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান এবং তাঁর শেষ ইচ্ছা ও ওসিয়ত রক্ষার দায়িত্ব-বোধ আমাদের জাতীয় ঐক্যবোদ্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপাদান। সব নব-সৃষ্ট জাতির পিতা সম্বন্ধেই একথা সত্য। ভৌগোলিক ব্যবধান ও অন্যান্য পার্থক্যের দরুন এটাই আমাদের প্রধান জাতীয় সম্পদ।
