এসবই ভাল কাজ। দেশের কল্যাণজনক ও উন্নয়নমূলক কাজ। পার্লামেন্টারি আমলের যে কোনও সরকারের জন্য এর সব কয়টা এবং যে কোনও একটা গৌরব ও অহংকারের বিষয় হইত। কারণ এর মধ্যে কয়েকটি কাজ পার্লামেন্টারি সরকারের পক্ষে করা খুবই কঠিন হইত। মুসলিম ওয়ারিসী ও বিবাহ আইন সংশোধন ও পশ্চিম পাকিস্তানের জমিদারি উচ্ছেদ এই ধরনের কাজ। পার্লামেন্টারি সব সরকারকেই জন মতের উপর নির্ভর করিতে হয়। সেজন্য সব কাজই তাঁদের করিতে হয় ধীরে-ধীরে সহাইয়া-সহাইয়া। কোনও ব্যাপারেই বিপ্লবী কোনও পরিবর্তন তাঁরা আনিতে পারেন না। পারেন না বলিয়াই প্রয়োজন-বোধে জনকল্যাণের জন্যই বিপ্লবের দরকার হয়। বিপ্লবী-সরকার প্রচলিত আইন জনমত সমাজ-ব্যবস্থা ভূঞ্জিত অধিকার কিছুই মানিয়া চলিতে বাধ্য নন। কারণ ও-সব ওলট-পালট করিবার জন্যই বিপ্লব আসিয়াছে। ঠিক তেমনি পার্লামেন্টারি সরকারকে কোনও না-কোন পার্টি বা অর্গানিযেশনের উপর নির্ভর করিতে হয়। প্রতি কাজে পার্টির অনুমোদন লইতে হয়। তারপর আইন-সভায় যাইতে হয়। সেখানে আইন পাস করাইতে হয়। বাজেট মনযুর করাইতে হয়। তারপর কার্যে পরিণত করিতে হয়। বিপ্লবী সরকারকে এসব কিছুই করিতে হয় না। কাজেই। ইচ্ছা করিলেই তাঁরা দেশের কল্যাণজনক ও উন্নয়নমূলক কাজ আশাতীত দ্রুতগতিতে করিতে পারেন। এই হিসাবে আমাদের বিপ্লবী সরকারের কাজ মোটেই আশানুরূপ হয় নাই। অন্য কাজের কথা ছাড়িয়াই দিলাম। কারণ কোনটা ভাল আর কোনটা ভাল। নয়, তা নিয়া বর্তমান সরকার ও আমাদের মধ্যে মতভেদ হইতে পারে। কিন্তু যে বিষয়ে মতভেদ নাই এবং যে কাজটা তাঁরা করিতে চান বলিয়া থাকেন, তার কথাই বলা যাক। এটা কার্টেল-প্রথা ও দুই অঞ্চলের বৈষম্য দূর করার কথা। এ দুইটা দূর হয়ই নাই, বরঞ্চ দিন-দিন বাড়িতেছে।
কিন্তু এটাও আসল কথা নয়। সরকারের ভাল-মন্দ কাজের বিচারে গণতান্ত্রিক সরকার ও বিপ্লবী সরকারের মাপকাঠি এক নয়। গণতান্ত্রিক সরকারকে ভোটাররা ভোট দিয়া গদিতে বসান। কাজেই তাঁরা যদি ভাল কাজ করেন, তবে তার জন্যও যেমন ভোটাররাই প্রশংসার অধিকারী, তেমনি ঐ সরকার যদি খারাপ কাজ করেন তবে তার নিন্দার ভাগীও ভোটাররা। এটা ন্যায়সংগতও। কারণ তেমন অবস্থায় তোটাররাই আবার ভোট দিয়া সে সরকারকে বরতরফ করিতে পারেন এবং করেনও।
৫. বিপ্লবী ও গণতান্ত্রিক সরকারের পার্থক্য
কিন্তু বিপ্লবী সরকারের কেস তা নয়। ভোটাররা তাঁদের ভোট দিয়া গদিতে বসান নাই। বিপ্লবের নেতারা নিজের ইচ্ছায়, নিজের প্ল্যান-প্রোগ্রাম লইয়া ভোটারগণের মত না লইয়া অনেক সময় ভোটারদের অমতে জোর যবরদস্তিতে, গদি দখল করেন। উদ্দেশ্য দেশের ভাল করার দরকার এই জন্য যে ভোটের সরকার দিয়া ঐসব কাজ হইতেছিল না। হওয়ার উপায়ও নাই। গণতন্ত্রী সরকার ঠিকমত দেশকে চালাইতে পারিতেছিলেন না বলিয়াই বিপ্লবের নেতারা জোর করিয়া তাঁদের হাত হইতে গদি ছিনাইয়া নিয়া নিজেরা বসিয়াছেন। কাজেই ভাল তাঁদের করিতেই হইবে। কোনও অজুহাতেই তাঁদের ব্যর্থ হওয়া চলিবে না। ব্যর্থ হইলে তাঁরা নিজেরা এবং তাঁরা একা অপরাধী হইবেন। সুতরাং ভাল কাজ করিলে তাঁরা প্রশংসা পাইবেন না। কারণ ওটা করা ছিল তাঁদের ফরয। বিপ্লবীর দায়িত্বে মজার ব্যাপার এইখানে। সফল হইলে প্রশংসা নাই কিন্তু ব্যর্থ হইলে নিন্দা আছে।
তথাপি বিপ্লবী সরকার প্রশংসা পাইতে পারেন এবং পাইয়াও থাকেন যদি তারা বিপ্লবকে জাসৃটিফাই করিতে পারেন। অর্থাৎ তাঁরা যদি এমন কাজ করেন যা কোনও গণন্ত্রী সরকারের দ্বারা সম্ভব হইত না, যত যোগ্য বা যত ভাল সরকারই হউন না কেন। যেমন রাজতন্ত্র তুলিয়া প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ধনিকদের ধন বাযেয়াফত করিয়া এক চোটে সমাজতন্ত্রের প্রবর্তন। এমন বিপ্লবী পরিবর্তন আনা ছাড়া আর কোন কাজের জন্যই বিপ্লবী সরকার প্রশংসা পাইতে পারেন না। সাধারণ মামুলি উন্নয়নমূলক কাজের জন্য ত নয়ই। তাছাড়া দৃশ্যতঃ যে সব কাজ কোনও সরকারের আমলের আসলে সে কাজ তাঁদের নাও হইতে পারে। বাপ আম গাছ লাগাইয়া গেলে ছেলের আমলে তাতে যদি ফল ধরে, তবে সে উন্নতিকে ছেলের আমলের উন্নতি না বলিয়া বরঞ্চ বাপের আমলের উন্নতিই বলিতে হইবে। পাকিস্তানের বর্তমান শিয়োন্নয়নের অনেক কাজই আগের সরকাররা করিয়া গিয়াছেন। সবদেশেই অমন হইয়া থাকে। সরকারের মধ্যে একটা কনটিনিউটি একটা অবিচ্ছিন্নতা থাকিলে এই ধরনের কাজ হয় সকল সরকারের। শসা পান আগে পরেরসবসরকাররাই সমানভাবে। বর্তমান সরকার যদি আগের-আগের সব সরকারকেই ধূচিয়া গাল দিয়া সব কাজের কৃতিত্ব নিজেরা নিতে চান, তবেই এ ধরনের হিসাবের কথা উঠে। তবেই লোকের মনে পড়ে। করাচি ও চাটগা বন্দর, আদমজী জুট মিল, কর্ণফুলী পেপার মিল, খুলনা নিউযপ্রিন্ট মিল ও ডকইয়ার্ড, কেগঞ্জ সার-মিল, কাপ্তাই বাঁধ ইত্যাদি সবই আগের সরকার করিয়া পিয়াছেন। লোকে আরও মনে পড়ে যে বর্তমান সরকারের রূপপুর ঘোড়াশাল ইত্যাদি কি পচ-৪ বছরের প্রসব-বেদনার পরেও মাঝে-মাঝেই ফলস পেইন প্রমাণিত হইতেছে।
তবু এসব শিল্পিক ও আর্থিক উন্নতি-অবনতি লইয়া বর্তমান সরকার ও অপযিশন নেতৃবৃন্দের মধ্যে যে বাদানুবাদ চলিতেছে সে বিতর্কে আমি লেখক সাহিত্যিক হিসাবে এই পুস্তকে কোনও একপক্ষ অবলম্বন করিতে চাই না। ও-সবের বিচার-তার ইতিহাসের উপরই ছাড়িয়া দিতে চাই। কোনও লোক গদিতে থাকা পর্যন্ত তীর আমল সম্বন্ধে সত্যিকার নিরপেক্ষ ইতিহাস লেখা চলে না। যা চলে তা একদিকে সীমাহীন তোষামোদ, অপরদিকে পক্ষপাত দু একতরফা নিলা।
