কাজেই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠিয়াছে। পাকিস্তানে গণতন্ত্রই সত্যই ব্যর্থ হইয়াছিল কি না?
৩. গণতন্ত্র কি ব্যর্থ হইয়াছিল?
সত্য কথা এই যে পাকিস্তান গণতন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পথে চলিয়াছিল। সমস্ত লক্ষণই ঐদিকে অংগুলি নির্দেশ করিতেছিল। আর কিছুদিন গেলে বোধ হয় সত্য-সত্যই ব্যর্থ হইত। তবে এটাও সত্য যে যেদিন আইউব সাহেব বিপ্লব করিলেন, সেদিন পর্যন্ত গণতন্ত্র ব্যর্থ হয় নাই। প্রয়োগই হয় নাই, ব্যর্থ হইবে কি? আট বছর ধরিয়া শাসনতন্ত্র রচনা লইয়া ছিনিমিনি খেলা হইল। পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত সরকার ডিসমিস করা হইল। কেন্দ্রেও নাযিমুদ্দিন সরকার ডিসমিস হইলেন। এবং সর্বশেষ গণ-পরিষদ ভাংগিয়া দেওয়া হইল। এর যেকোনও একটাকে বিপ্লবের অজুহাত করিয়া প্রধান সেনাপতি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করিলে তাঁর কাজের নৈতিক সমর্থন থাকিত। তিনি জনগণের সমর্থন পাইতেন। ঠিক তেমনি, তিনি যদি ১৯৫৯ সালের প্রস্তাবিত সাধারণ নির্বাচনের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করিতেন, নির্বাচনে তাঁর আশংকিত খুন-খারাবি আরম্ভ হইলে পরে তিনি যদি মার্শাল ল প্রবর্তন করিতেন, তবেই তিনি যুগপভাবে দেশবাসীর ও বিশ্ববাসীর নিকট সম্মান ও সমর্থন পাইতেন।
অথচ তিনি নির্বাচনের প্রাক্কালে মার্শাল ল করিলেন তাঁর নিজের কল্পিত ও অনুমিত বিপদ ঠেকাইবার জন্য। এমন সময় করিলেন, যখন রাষ্ট্রচালক রাজনীতিকরা অনেকবার পথভ্রষ্ট হইতে হইতে শেষ পর্যন্ত টাল সামলাইয়া লইয়াছিলেন। অতীতে অনেকবার বিপ্লব করা দরকার হওয়া সত্ত্বেও জেনারেল আইউব রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ হইতে বিরত ছিলেন। বিপ্লব না করিয়া বরঞ্চ তিনি রাজনীতিকদের সহায়তা করিয়াছেন। গণ-পরিষদ ভাংগিয়া দেওয়ার মত অন্যায় বেআইনী ও অগণতান্ত্রিক কাজ হওয়ার সময় তিনি ‘বিপ্লব’ করিয়া রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন নাই। বরঞ্চ নিজে রাজনীতিকের অধীনে মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন। এতে তাঁর সাধু ইচ্ছা এবং গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর আস্থাই প্রমাণিত হইয়াছিল। দেশে গণতন্ত্র বাঁচাইবার শেষ চেষ্টায় তিনি রাজনীতিকদের সহায়তা করিবার জন্যই মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন। এসব কথা যদি সত্য হয়, তবে গণতন্ত্র যখন টাল সামলাইয়া উঠিয়াছিল, শাসন রচিত হইয়া যখন নির্বাচনের দিন-তারিখ পড়িয়াছিল, তখন তিনি তলওয়ার মারিলেন কেন? রচিত শাসনতন্ত্র অচল বলিয়া? সাধারণ নির্বাচনে খুন-খারাবি হইত বলিয়া? এতই দৃঢ় যদি তাঁর বিশ্বাস ছিল, তবে এটা প্রমাণিত হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করিলেন না কেন? এ প্রশ্নের জবাব কেউ দেন নাই। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট আইউবের বই–এও এর জবাব নাই।
কাজেই যদি মনে করা হয়, পাকিস্তান রক্ষার জন্য নয়, দেশের আর্থিক কাঠামো বাঁচানোর জন্যও নয়, ব্যক্তিগত উচ্ছাকাংখা পূরণের জন্যই প্রেসিডেন্ট আইউব রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করিয়াছেন, তবে তা নিতান্ত অযৌক্তিক হইবে না। কিন্তু সে ব্যক্তিগত উচ্চাকাংখাও দেশ-সেবার জন্য হইতে পারে। হাযার সাধু উদ্দেশ্য লইয়াও সামরিক শক্তি-বলে বা বেআইনীভাবে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের কোনও অধিকার কোনও সেনা-নায়ক বা সরকারী কর্মচারির নাই, সেটা আলাদা কথা। এখানে তা আমার আলোচ্যও নয়। এখানে আমার প্রতিপাদ্য বিষয় শুধু এই যে প্রধান সেনাপতি জেনারেল আইউব নিতান্ত সাধু-উদ্দেশ্য-মিশ্রিত-ব্যক্তিগত-উচ্চাকাংখায় মার্শাল ল করিয়াছেন। তা করিতে গিয়া তিনি অনেক ভাল কাজও করিয়াছেন, অনেক খারাপ কাজও করিয়াছেন। তুলনায় যদি দেখা যায়, তাঁর ভাল কাজের ওজন খারাপ কাজের চেয়ে ভারি, তবে তাঁর তারিফ ও তাঁর কাজের সমর্থন করিতেই হইবে।
৪. অবিমিশ্র অভিশাপ নয়
মার্শাল ল, সামরিক বিপ্লব ও ব্যক্তিগত ডিকটেটরশিপের কোনওটাই নির্ভেজাল অভিশাপ নয়। অনেক সময় ঐ সবের দ্বারা পরিণামে দেশ ও দেশবাসী জনসাধারণের উপকার হইয়া থাকে। রাজ ও ডিকটেটরশিপের বিরুদ্ধে উপরোক্ত ধরনের বিপ্লব সর্বদাই দেশের কল্যাণ করিয়া থাকে, তাতে দ্বিমত নাই। তাছাড়াও শুধুমাত্র শাসনতন্ত্র ও সামাজিক-অর্থনীতিক কাঠামো বদলাইবার উদ্দেশ্যে বিপ্লব হইলেও তা দেশের মংগল সাধন করিতে পারে। আইউব সাহেব যদি মোটামুটি দেশের কল্যাণ করিয়া থাকেন, তবে তাঁর গোড়ার ক্ষমতা দখলের অন্যায় ও বেআইনী কাজটাও জনসাধারণ ও ইতিহাসের বিচারে ভাল কাজ বিবেচিত হইবে।
আগে তাঁর ভাল কাজগুলিরই উল্লেখ করা যাক। তিনি (১) পশ্চিম পাকিস্তানের সামন্ততান্ত্রিক ভূমি-ব্যবস্থার নীতিত অবসান করিয়াছেন, (২) একবিবাহকে কার্যতঃ বাধ্যতামূলক করিয়াছেন, (৩) দুই পাকিস্তানের আর্থিক বৈষম্য স্বীকার করিয়াছেন, (৪) রেলওয়ে প্রদেশকে দিয়াছেন, ৫) কয়েকটি নিখিল পাকিস্তানীয় অর্থ-বন্টন প্রতিষ্ঠানের হেড আফিস ঢাকায় স্থানান্তরিত করিয়াছেন, (৬) শিল্পোন্নয়ন কর্পোরেশনকে দূই প্রদেশের মধ্যে দ্বিধা-বিভক্ত করিয়াছেন, (৭) পশ্চিম পাকিস্তানের সর্বত্র গ্রাম্য স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তন করিয়া উভয় পাকিস্তানের নিম্নস্তরের স্বায়ত্তশাসনকে একই প্যাটার্নের করিয়াছেন, (১) জাতীয় শিপিং কর্পোরেশন গঠন করিয়াছেন এবং (১০) সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের সহিত ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করিয়া বৈদেশিক নীতিকে সুসংগত করিয়াছেন।
