সুতরাং জেনারেল আইউব ১৯৫৮ সালে যা করিলেন তাতে তিনি কোনও গণজ্ঞ হরণ করেন নাই। এক প্যাটার্নের অগণ হইতে অন্য প্যাটার্নের অগণতন্ত্রে দেশকে নিয়া গেলেন মাত্র। আগের প্যাটার্নের অগণতন্ত্রীরা জনগণের ভোটাধিকার আইন করিয়া কাড়িয়া নেন নাই সত্য, কিন্তু কাজে-কর্মে স্বীকারও করেন নাই। নির্বাচনের নামও মুখে আনেন নাই। সে-স্থলে আইউব সাহেব আসিয়া আইন করিয়া ভোটাধিকার বিলোপ করিয়া দিয়াছেন। বলিতে গেলে আইউব সাহেবের কথাটাই সহজবোধ্য। তিনি সোজাসুজি দেশবাসীকে বলিয়াছেন : তোমরা ভোট দিতে জান না। কাজেই তোমাদের ভোটাধিকার দিলাম না। বড় সাফ কথা। কোনও হাংকি-পাংকি নাই। কথাটা আমরা সহজেই বুঝিতে পারি। এই জন্যই আইউব সাহেব বলিয়াছেন দেশবাসী যেটা ভাল বুঝে সেই মত শাসনন্ত্রই তিনি দিয়াছেন। একেই বলে সূটেড টু আওয়ার জিনিয়াস। পক্ষান্তরে সাবেক নেতারা দেশবাসীকে বলিতেন : তোমাদের ভোটাধিকার স্বীকার করি কিন্তু নির্বাচন দিবনা। এটা জনগণের বুঝা সত্যই কঠিন ছিল। সেজন্য ঐ ব্যবস্থা ‘সুটেড টু আওয়ার জিনিয়াস’ ছিল না।
অতএব দেখা গেল সাবেক আমলেও জনগণের শাসন ছিল না। বর্তমান আমলেও জনগণের শাসন নাই। জনগণ হইতে দূরে থাকিতে হইবে, এই নীতিতে দুই আমলই সমান বিশ্বাসী। এই হিসাবেই আমি এই বিশ বছরের মুদ্দতকে দুই বিপরীতধর্মী বা স্ব-ধমী পৃথক যুগ বলিয়া মানিতে পারিলাম না। তাই উভয় আমল লইয়াই একটি ইন্টারিম সালতামামি লিখিলাম।
২. পাপের প্রায়শ্চিত্ত
এবার আলোচনায় আসা যাক। রাজনৈতিক নেতারা যে অনেক পাপ করিয়াছিলেন তাতে সন্দেহ নাই। দেশবাসীর অভিযোগও তাই। নেতারা আট বছরে একটা শাসনতন্ত্র রচনা করিতে পারেন নাই। পুরাতন শাসনতন্ত্রের দেওয়া বাই-ইলেকশনগুলি পর্যন্ত আটকাইয়া রাখিয়াছিলেন। সরকারের আইনসংগত সমালোচনার জন্য অপযিশন পার্টি গঠন করিতে দেন নাই। সরকারের সমালোচকদের পাকিস্তানের দুশমন,ভারতের চর ও ইসলামের শত্রু আখ্যা দিয়া তাঁদেরে নিরাপত্তা আইনে বন্দী করিয়াছিলেন। খবরের কাগযের আফিসে তালা লাগাইয়া সাংবাদিক-স্বত্বাধিকারীদেরে জেলে আটক করিয়াছিলেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পূর্ব-বাংলার ন্যায়সংগত দাবিটাকে পশ্চিম বাংলার উস্কানি আখ্যায় গালিগালাজ করিয়াছিলেন। ছাত্র-জনতার উপর গুলি চালাইয়াছিলেন। পাকিস্তানের অন্যতম স্রষ্টা শহীদ সাহেবকে বহিষ্কার করিয়াছিলেন। তাঁর গণ-পরিষদের মেম্বারশিপ কাটিয়া দিয়াছিলেন। পূর্ব-বাংলার সাধারণ নির্বাচন বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী হক সাহেবের মন্ত্রিসভা বাতিল করিয়া তাঁকে নযরবন্দী করিয়াছিলেন। এইরূপ অন্যায়-অসংগত অগণতান্ত্রিক অত্যাচার চলে আট-আটটা বছর ধরিয়া। কিন্তু তবু এই মুদ্দতে আমাদের দেশরক্ষা বাহিনী রাষ্ট্র-শাসনে হস্তক্ষেপ করে নাই। তারপর এই আট বছরের অপমীদেরে ক্ষমতাচ্যুত করিয়া যখন অবশেষে দেশে একটা শাসন রচিত হইল, যখন সমস্ত বাধা-বিঘু ঠেলিয়া নয়া শাসনতন্ত্র অনুসারে দেশময় একটা সাধারণ নির্বাচন হওয়ার দিন-তারিখ স্থির হইল, ঠিক সেই মুহূর্তে মার্শাল ল আসিল। বলা হইল ঐ শাসনতন্ত্র কার্যোপযোগী নয়। তদনুসারে ইলেকশন হইলে অনেক অর্থের অপচয় হইত। এমন কি অনেক খুন-জখম হইয়া যাইত। এর আগেই স্বয়ং রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দর মির্যা বলিয়া রাখিয়াছিলেন। এ দেশের মূর্খ জনসাধারণ ভোট দিতে জানে না। তার প্রমাণ, এই মূখেরা না বুঝিয়া ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে শতকরা সাড়ে সাতানব্বইটা ভোট দিয়াছিল। এতে প্রমাণ হইয়াছিল এরা গণতন্ত্রের উপযুক্ত নয়। এদেরে শুধু ডাণ্ডাপিটা করিয়া শাসন করা দরকার। ইলেকশনের নির্ধারিত সময়ের প্রাক্কালে অদৃশ্য হস্তের খেলা চলিল। সুন্দর কাগযে বড় বড় টাইপে সুদৃশ্য-ছাপা পোটারে বলা হইল : রিভলিউশনারি কাউন্সিল চাই। সত্য-সত্যই একদিন ‘রিভলিউশন’ আসিল। মার্শাল ল প্রবর্তিত হইল। রাজনৈতিক নেতাদের পাপের প্রতিকার করিবার জন্যই মার্শাল ল হইয়াছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু সে পাপটা করিয়াছিল কারা? আমরা যে সব কাজকে রাজনৈতিক নেতাদের পাপ মনে করি, সেই পাপের শাস্তি স্বরূপই কি মার্শাল ল হইয়াছিল? প্রশ্নটার উত্তর দিয়াছেন স্বয়ং মার্শাল ল-কর্তারা। তাঁরা মার্শাল ল করিয়া ঘোষণা করিলেন : ১৯৫৪ সালের পরে যাঁরা দেশ শাসন করিয়াছেন, বিচার হইবে শুধু তাঁদেরই। এর অর্থ এই যে, তার আগে যাঁরা দেশ শাসন করিয়াছিলেন, তাঁদের কোনও পাপ ছিল না। যাঁরা তাঁদেরে হটাইয়া নির্বাচনে হারাইয়া শাসনক্ষমতা দখল করিয়াছিলেন, অপরাধ তাঁদের। আট বছরের শাসনতন্ত্রহীন দেশকে যারা একটা শাসনতন্ত্র দিলেন অপরাধ তাঁদের। এই একটিমাত্র ব্যাপার হইতেই মার্শাল ল প্রবর্তনের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজন ধরা পড়িবে। অন্য, কিছু বিচার করার দরকারই হইবে না। মার্শাল ল প্রবর্তনের নয় বছর পর প্রেসিডেন্ট আইউব তাঁর ফ্রেসনট মাষ্টার্স নাম্য রাজনৈতিক আত্মজীবনী লিখিয়াছেন। তাতে তিনি কিভাবে মার্শাল ল আনিলেন তা না বলিলেও কি কারণে আনিলেন তা বলিয়াছেন। জোরদার কৈফিয়ৎ দিয়াছেন।.ও-ধরনের কৈফিয়ত অতীতে সব মার্শাল ল-ওয়ালারাই দিয়াছেন। ভবিষ্যতেও দিবেন। এতে কোনও নূতনত্ব নাই। ও-সবই ধরা-বাঁধা গৎ। ও-সব গতের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ কথাটা এই যে, বৃটিশ প্যাটার্নের গণতন্ত্র পাকিস্তানে ব্যর্থ হইয়াছিল। কথাটা সত্য হইলে আইউবী বিপ্লব সত্যই দরকার ছিল। সত্য হওয়াও অপরিহার্য। কারণ ওটা ছাড়া আইউবী-বিপ্লবের আর কোনও সংগত কারণ ছিল না। বেশির ভাগ দেশেই ‘বিপ্লব’ হইয়াছে ‘রাজ’ বরতরফ করিয়া ‘প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। স্বাভাবিক কারণেই ডিকটেটর বরতরফ করিবার জন্যও বিপ্লব হইয়াছে। কারণ ‘রাজা’ ও ‘ডিকটেটর’ মূলতঃ এবং গণতন্ত্রের দিক হইতে একই চিজ। আমাদের দেশে ‘রাজাও ছিল না, ‘ডিকটেটর’ও ছিল না। তবে প্রধান সেনাপতি আইউব ‘বিপ্লব করিলেন কেন? একমাত্র উত্তর : শাসনতন্ত্রে বিপ্লবী পরিবর্তন আনিবার জন্য। দেশের শাসনতন্ত্র সত্যই ‘বিপ্লব’ ছাড়া ভাংগা যায় না।
