মিটিবে, ততদিন ভারতের সাথে অন্য কোন ব্যাপারে কথাই বলিব না, এ যুক্তিটাও ঠিক নয়। সিন্ধু অববাহিকা চুক্তির শিক্ষা এই।
১৯৬৭ সালে অপযিশন দলের বিপ্লবী যুগের সব চেয়ে বড় কাজ পি. ডি. এম. গঠন। এর প্রথম বৈশিষ্ট্য এই যে ১৯৬৫ সালের ‘কপের’ মৃত এটা শুধু নির্বাচনী মৈত্রী নয়। দ্বিতীয়তঃ পূর্ব-পাকিস্তানের গ্রহণযোগ্য একটা শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর উপর এর বুনিয়াদ। শহীদ সাহেবের শেষ ইচ্ছাই এতে রূপ পাইয়াছে। পশ্চিম পাকিস্তানী সকল দলের নেতারা এই সর্বপ্রথম তিন বিষয়ের ফেডারেল কেন্দ্র মানিয়া লইয়াছেন। ইহা নিশ্চিত রূপেই পাকিস্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের শুভ সূচনা।
৩০. কালতামামি
কালতামামি
ত্রিশা অধ্যায়
১. ইন্টারিম রিপোর্ট
১৯৪৮ হইতে ১৯৬৭ পর্যন্ত এই কুড়ি বছরের মুদ্দতটাকে ‘কাল’ না বলিয়া ‘মহাকাল’ বলাই উচিৎ। এই মুদ্দতে যে সব ঘটনা ঘটিয়াছে, তা অঘটনই হোক আর দুর্ঘটনাই থোক সবই মহাঘটনা। মুদ্দতটাও বিশ বছরের। প্রায় দুই যুগের সমান। দুই ডিকেড ত বটেই। অতএব এটা মহাকাল। আজও তামাম হয় নাই। কাজেই এর কাল তামামি লেখা চলে না। এ কাল আজও চলিতেছে। যতদূর নযর চলে আরও চলিবে। কাজেই আমার দেখা রাজনীতির শেষ অধ্যায় হিসাবে আমি যে কাল-তামামি লিখিতেছি, এটাকে পাঠকরা ইন্টারিম রিপোর্ট ধরিয়া লইবেন। আমার হায়াতে না কুলাইলে আমার পরবর্তীরাই এর চূড়ান্ত রিপোর্ট (উকিল মানুষ বলিয়া ‘ফাইনাল’ রিপোর্ট কথাটা ব্যবহার করিলাম না) লিখিবেন। তখন সব ব্যাপারই আরও পরিস্ক প্রেক্ষিতে টু পারসপেকটিতে দেখা যাইবে। ফলে সে চূড়ান্ত রিপোর্ট আমার আজকার ইন্টারিম রিপোর্টের সিদ্ধান্ত ওলট-পালট হইয়া যাইতে পারে। তবু আমার কথাটা বলিয়া যাওয়া উচিৎ মনে করিলাম।
কেউ-কেউ মনে করিতে পারেন, এই বিশ বছরের লম্বা মুদ্দতটাকে দুই ভাগে দুই যুগে ভাগ করিলেই ত অন্ততঃ প্রথম দিককার যুগ সম্বন্ধে একটি চূড়ান্ত কাল তামামে লেখা যাইত। এটা করাও সহজ ছিল। কারণ এই মুদ্দতের সাবেক ও বর্তমান শাসকরা এই বিশ বছরের দুই বিপরীতধর্মী যুগে ভাগ করিয়া থাকেন। অবশ্য বিপরীত মতলবে। সাবেকরা বলিয়া থাকেন, প্রথম দশ বছর পার্লামেন্টারি যুগ, আর দ্বিতীয় দশ বছর ডিকটেটরি যুগ। বর্তমানরা বলিয়া থাকেন, আগেরটা ডিকেড অব ডিকে, আর পরেরটা ডিকেড-অব-প্রোগেস। সাবেকদের যুক্তি এই যে তাঁদের আমলে দেশে গণতন্ত্র ছিল না। বর্তমান শাসা দেশরক্ষা বাহিনীর অসদ্ব্যবহার করিয়া মার্শাল ল জারি করিয়াছেন। বেআইনীভাবে শাসনতন্ত্র বাতিল করিয়াছেন। দেশবাসীর গণতান্ত্রিক অধিকার কাড়িয়া নিয়াছেন। দেশে একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। বর্তমানরা জবাবে বলেন যে আগে দেশে গণতন্ত্র-টন্ত্র কিছু ছিল না। বাতিল শাসনতন্ত্রটাও ওয়ার্কেল ছিল না। রাষ্ট্র নায়কদের পদ ও ক্ষমতা লইয়া নিজেদের মধ্যে কামড়া-কামড়ি করিয়া দেশটাকে রসাতলে নিতেছিলেন। তাই বর্তমান নেতারা আগের নেতাদের ধাক্কা মারিয়া গদি হইতে সরাইয়া দেশটাকে ধ্বংসের হাত হইতে রক্ষা করিয়াছেন।
এই দুই পক্ষের যে পক্ষের মতই ঠিক হোক, উভয়ের মতেই এই মুদ্দতটা দুই সুস্পষ্ট যুগে বিভক্ত। এই হিসাবে আমিও দুই দলের দুই মতের সহিত এক হইয়া এই যুগকে দুই কলে ভাগ করিতে পারিতাম। কাল তামামি লেখা আমার পক্ষে সহজ হইত।
কিন্তু এই সহজ পথ ফেলিয়া আমি কঠিন পথ ধরিলাম এই জন্য যে, এই দুই দলের কারও মত আমি গ্রহণ করিতে পারিলাম না। আমার বরাবরের তথাকথিত ‘অভ্যাস’-মত এটাও সত্য এটাও সত্য বলিতে পারিলাম না। জীবনের প্রথম এইবার বলিলাম এটাও সত্য না; এটাও সত্য না। এ জন্য আমি দুঃখিত। আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায় এই মুদ্দতটা আসলে দুই যুগ নয়, একই যুগ। অন্ততঃপক্ষে একই যুগের এপিঠ-ওপিঠ। আইনতঃ ও টেকনিক্যালি দুই আমলের মধ্যে যত পার্থক্যই থাকুক না কেন, কার্যতঃ পার্লামেন্টারি শাসন এদেশে কোন দিনই ছিল না। আমাদের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খাঁ পার্লামেন্টের ফ্লোরে দাঁড়াইয়া সগর্বে ঘোষণা করিয়াছিলেন। আমার বিচারে আমার পার্টি (মুসলিম লীগ) পার্লামেন্টের চেয়ে বড়। কাজেই তাঁর আমলে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র ছিল না। তবে কি এক-পার্টি-শাসন ছিল? জনগণের মুখের উপর মুসলিম লীগের দরজা সশব্দে বন্ধ করিয়া দিয়া তিনি দেখাইয়াছিলেন, তাঁর আমল পার্টি-ডিকটেটর শিপও ছিল না। তারপর প্রধানমন্ত্রীর দুর্ভাগ্যজনক হত্যাকাণ্ডের পরে পার্লামেন্ট বা মুসলিম লীগকে জিগ্গাসা না করিয়াই গবর্নর-জেনারেল নাযিমূদ্দিন যেদিন প্রধানমন্ত্রী হইলেন, সেদিনও দেশে পার্লামেন্টারি শাসন ছিল না। আইন-পরিষদে মেজরিটি থাকা সত্ত্বেও যেদিন তিনি বড়লাট গোলাম মোহাম্মদ কর্তৃক ডিসমিস হইলেন, সেদিনও দেশে পার্লামেন্টারি শাসন ছিল না। তারপর বগুড়ার মোহাম্মদ আলী যেদিন আমেরিকা হইতে গবর্নর-জেনারেলের বগল দাবা হইয়া উড়িয়া আসিয়া প্রধানমন্ত্রী হইলেন এবং পরে মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট হইলেন, তখনও দেশে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র ছিল না। এই প্রধানমন্ত্রীই যখন পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে সদলবলে হারিয়া গিয়া বিজয়ী যুক্তফ্রন্টকে গবর্নমেন্ট চালাইতে দিলেন না, সেদিনও দেশে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র ছিল না। তারপর বেশির ভাগ তথাকথিত পার্লামেন্টারি নেতার নীরব ও সরব সমর্থনে গবর্নর-জেনারেল গণ পরিষদ ও পার্লামেন্ট ভাংগিয়া দিয়া যেদিন অর্ডিন্যান্স-বলে দেশ শাসন করিতে লাগিলেন, অর্ডিন্যান্স বলেই পশ্চিম পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশগুলি উড়াইয়া দিলেন, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের পাঁচ কোটি ও সাড়ে তিন কোটি লোকের প্রতিনিধিত্ব প্যারিটি প্রবর্তন করিলেন, সেদিনও দেশে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র ছিল না। তারপর নির্বাচন করিয়া নয়, হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টে মামলা-মোকদ্দমা করিয়া যেদিন একটি নয়া গণ-পরিষদ আদায় করা হইল, চালাকি ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাস ঘাতকতা করিয়া গবর্নর-জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রী একই পশ্চিম পাকিস্তান হইতে লইয়া নয়া সরকার গঠন করা হইল এবং সেই সরকার জোড়াতালি দিয়া একটি নির্বাচন-পদ্ধতিবিহীন অসমাপ্ত শাসন রচনা করিলেন, সেদিনও দেশে পার্লামেন্টারি শাসন চালু ছিল না। এক কথায় উপরে বর্ণিত কোন সরকারই ভোটারদের নাগালের মধ্যে ছিলেন না। আট বছরে দেশে কোনও শাসনই রচিত হয় নাই। শাসন রচনার পরও দুই বছরে কোন নির্বাচন হয় নাই।
