কয়েকদিন পরে কিছুটা ভাল হইয়া মানিক মিয়ার বাড়িতে লিডারের সাথে দেখা করিলাম এবং এ বিষয়ে আমার চিন্তার ফল তাঁকে জানাইলাম। তিনি মোটামুটি নিমরাযী হইয়া আমাকে খুব সংক্ষেপে একটি বিবৃতি মুসাবিদা করিতে আদেশ দিলেন। বলিলেন : উভয় পাকিস্তান হইতে ৫০ জন করিয়া মোট এক শ’ নেতার বিবৃতি হইতে হইবে। আমি লিডারের আদেশমত ফুলঙ্কেপ শিটের এক পৃষ্ঠায় একটি বিবৃতির মুসাবিদা করিলাম। তাতে নয় নেতার বিবৃতির সারকথার উপর বুনিয়াদ করিয়া দু-এক দফার দাবি খাড়া করিলাম। উহাই টাইপ করিতে আতাউর রহমান সাহেবের কাছে দিলাম। টাইপ করার সময় আতাউর রহমান আমাকে ফোনে জানাইলেন যে আমার মুসাবিদাটা অতিরিক্ত মাত্রায় ছোট হইয়া গিয়াছে। দু-এক যায়গায় একটু বাড়াইয়া লেখিলে ভাল হয়। তবে তিনি আমার মুসাবিদায় হাত না দিয়া ঐ ধরনের একটা মুসাবিদা করিতে চান। আমার আপত্তি আছে কি না। আমি সানন্দে সম্মতি দিলাম। পরের দিন আমরা দুই মুসাবিদারই টাইপ কপি লইয়া লিডারের সাথে দেখা করিলাম। তিনি উভয় মুসাবিদাই মনোযোগ দিয়া পড়িলেন। আমারটা ফুলঙ্কেপ এক পৃষ্ঠা। আতাউর রহমান সাহেবেরটা দেড় পৃষ্ঠা। তবু লিডার বলিলেন। তিনি আরও ঘোট বিবৃতির মুসাবিদা চাহিয়াছিলেন। উভয় মুসাবিদায়ই খানিকক্ষণ চোখ বুলাইয়া অবশেষে বলিলেন : তোমরা দুইজনে যখন দুইটা করিয়াছ, তখন আমিও একটা করি। কি বল? আমরা সানন্দে সাগ্রহে রাযী হইলাম। পরের দিন তিনি ফুলঙ্কেপের আধা পৃষ্ঠার একটি মুসাবিধা আমাদেরে দেখাইলেন। তাতে তিনি ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র পুনর্বহালকেই আমাদের একমাত্র জাতীয় দাবী করিয়াছেন। সুস্পষ্ট ধরা-ছোঁয়ার মত এবং জনগণের বোধগম্য হওয়ার দিক হইতে এমন পরিক্ষার দাবি আর হইতে পারে না। আমরা তা স্বীকার করিলাম। কিন্তু ঐ শাসনতন্ত্র পূর্ব-পাকিস্তানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন স্বীকৃত হয় নাই; তার ফলে আমরা উহাতে দস্তখত করিতে অস্বীকার করিয়াছিলাম; কাল ও অবস্থার পরিবর্তনে পূর্ব-পাকিস্তানীদের দাবিদাওয়া আরও বেশি দানাবাঁধিয়াছে। ইত্যাদি যুক্তি দিয়া লিডারের মুসাবিদায় আমরা আপত্তি করিলাম। কিন্তু সংগে সংগেই একথাও আমরা বলিলাম যে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা যদি এই বিবৃতিতে অগ্রিম ওয়াদা করেন যে ৫৬ সালের শাসনতন্ত্র অনুসারে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের জাতীয় পরিষদের প্রথম বৈঠকেই তিন বিষয়ের কেন্দ্রীয় ফেডারেশন ও উভয় অঞ্চলকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিয়া শাসনন্ত্র সংশোধন করা হইবে, তবে আমরা, লিডারের মুসাবিদা ঐরূপ সংশোধিত মতে গ্রহণ করিতে প্রস্তুত আছি।
১২. শেষ বিদায়
লিডার আমাদের কথাটা ফেলিয়া দিলেন না। চিন্তা করিলেন। নোট করিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের বুঝাইবার দায়িত্ব নিলেন। আমাদের প্রস্তুত থাকার আদেশ-উপদেশ দিয়া তিনি করাচি চলিয়া গেলেন। সেখানে অসুস্থ হইয়া পড়িলেন। চিকিৎসার জন্য যুরিখ লণ্ডন বৈরুত গেলেন। আর আসিলেন না। তাঁর বদলে আমাদের দুর্ভাগ্যের ঘোর অন্ধকার ছায়া লইয়া আসিল তাঁর লাশ। ১৯৬৩ সালের ৫ই ডিসেম্বর তিনি বৈরুতের এক হোটেলে এন্তেকাল করিলেন। তাঁর আত্মীয়-স্বজন তাঁকে করাচিতে দাফন করিতে চাহিলেন। কিন্তু পূর্ব-পাকিস্তানবাসী দাবি করিল তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে পূর্ব-পাকিস্তানের মাটিতে দাফন করিতে হইবে। তাই হইল। পূর্ব পাকিস্তানের অপর প্রাণপ্রিয় নেতা শেরে বাংলার পাশে তাঁকে দাফন করা হইল।
তারপর-তারপর দু’চারদিন আগে-পিছে ন্যাপ ও আওয়ামী লীগ উভয় প্রতিষ্ঠানই রিভাইভ হইয়া গেল। ফলে ঐ দূরদর্শী মহান নেতার উপদেশ কার্যতঃ তাঁরই অনুসারীরা অগ্রাহ্য করিলেন। একমাত্র পূর্ব-পাকিস্তানের এন, ডি. এফ. অন্ততঃ মতবাদের দিক দিয়া মহান নেতার ওসিয়ত পার্টিহীন গণ-ঐক্যের কথা ক্ষীণ কণ্ঠে বলিয়া যাইতে থাকিল।
এরপরে দেশের রাজনীতিতে যা-যা ঘটিয়াছে তার সবগুলিকেই ডিভিয়েশনের অরিজিনাল সিনের স্বাভাবিক পরিণতি বলা যাইতে পারে। পার্লামেন্টারী ব্যবস্থায় যা করা সম্ভব ও উচিৎ, বর্তমান বুনিয়াদী গণতন্ত্রের অবস্থাতেও তাই করা যায় মনে করিয়া ১৯৬২ সাল ও ১৯৬৫ সালের নির্বাচনে নেতারা সিরিয়াসলি অংশ গ্রহণ করিলেন। পরিণামে যা অবশ্যম্ভাবী তাই হইল। বিশেষতঃ ১৯৬৫ সালের নির্বাচনটাই গণতন্ত্রী নেতাদের চৈতন্য উদয়ের জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিৎ ছিল। মোহতারেমা ফাতেমা জিন্নার জনপ্রিয়তা ও প্রাইমারি ভোটারদের বিপুল সমর্থনও অপযিশনকে জিতাইতে পারে নাই। পারিলে আইউব শাসনতন্ত্রকে অগণতান্ত্রিক বলা যাইত না।
ঐ সনেরই অপর উল্লেখযোগ্য ঘটনা পাক-ভারত যুদ্ধ। ‘যুদ্ধ নয় শান্তি’ ‘শত্রুতা নয় বন্ধুত্ব’ই পাকিস্তান ও ভারতের বাঞ্ছণীয় সম্পর্ক, এই খাঁটি সত্য ও বাস্তব কথাটা প্রেসিডেন্ট আইউব যতবার যত জোরে বলিয়াছেন, তেমন আর কোনও পাকিস্তানী নেতা বলেন নাই। তথাপি ভাগ্যের পরিহাস, তাঁরই আমলে এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটা ঘটিল যা পার্লামেন্টারি আমলে কোনও পক্ষই কল্পনাও করে নাই।
অথচ তার মাত্র পাঁচ বছর আগে ১৯৬০ সালেই সিন্ধু অববাহিকা চুক্তির মত মহাপরিকল্পনাটা স্বাক্ষরিত হয় এবং সে উপলক্ষে পণ্ডিত নেহরু প্রথম ও শেষবারের মত পাকিস্তান পর্দাপণ করেন। এর সবটুকু প্রশংসা প্রেসিডেন্ট আইউবের এ কথা স্বীকার করিতেই হইবে। সেই সংগে এও মানিতে হইবে যে যতদিন কাশ্মির বিরোধ
