যা হোক এরপর শহীদ সাহেব মুক্তি পাইয়া পূর্ব-পাকিস্তানে আসেন এবং নয় নেতার বিবৃতি সমর্থন করেন। এই সময় তিনি পূর্ব-পাকিস্তানে সর্বত্র সভা-সমিতি করিয়া বেড়ান। দেশের সর্বত্র জীবন ও জাগরণের সাড়া পড়িয়া যায়। আমি এই সময় হাসপাতাল হইতে ছুটি পাইয়াছি বটে, কিন্তু ঘরের বাহির হইতে পারি না। সভা সমিতিতেও যোগ দিতে পারি না। কাজেই লিডারের ঐসব ঝটিকা সফরে সংগী হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয় নাই। কিন্তু খবরের কাগয পড়িয়া, অপরের মুখে, বিশেষতঃ লিডারের নিজ-মুখে, ও-সবের বিবরণ ও তাৎপর্য শুনিয়া আমি গণতন্ত্রের আসন্ন জয়ের সম্ভাবনায় উদ্দীপিত হইয়া উঠিতাম।
১০. পার্টি রিভাইভ্যাল
এই মুদ্দতের সবচেয়ে বড় বিচার-বিবেচনার বিষয় ছিল রাজনীতিক পার্টিসমূহ পুনরুজ্জীবিত করা-না-করার প্রশ্নটি। তার বিশেষ কারণ ছিল এই, যে-বিপ্লবী নেতারা মার্শাল ল’ করিয়া সব পার্টি ভাংগিয়া তাদের টেবিল-চেয়ার নিলাম করাইয়া এবং কাগয-পত্র পোড়াইয়া দিয়াছিলেন এবং সব পার্টি-ফন্ড বাযেয়াফত করিয়াছিলেন, তাঁরাই এখন পলিটিক্যাল পারটি এ্যাক্ট নামক আইন জারি করিয়াছেন। নিজেরা পাকিস্তান মুসলিম লীগ নামে পার্টি করিয়াছেন। অপর-অপর লোককে যার-তার পার্টি জিয়াইয়া তুলিবার উস্কানি দিতেছেন। পার্লামেন্টারি আমলের পার্টি-চেতনা, পার্টি-স্পিরিট ও পার্টি-মনোবৃত্তি চার বছরের মার্শাল ল’তেও আমাদের মধ্য হইতে সম্পূর্ণ দূর হয় নাই। কাজেই বর্তমান পরিবেশে বর্তমান স্বৈরতন্ত্রের মোকাবেলায় পার্টি-অক্ষমতা সম্বন্ধে সকলে সমান সচেতন হন নাই। এ অবস্থায় সর্বোচ্চ স্তরের পার্টি-নেতৃবৃন্দের মধ্যে শহীদ সাহেবই প্রথম পার্টি রিভাইভ্যালের বিরুদ্ধতা করায় আমাদের জন্য এটা ছিল গর্বের বিষয়। কিন্তু অনেকে তাঁকে লও বুঝিয়াছিলেন। শহীদ সাহেব তৎকালে সর্ববাদি-সক্ষত মতে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ায় অন্যান্য দলীয় নেতাদের কেউ-কেউ মনে করেন সুহরাওয়ার্দী পার্টি রিভাইভ্যালের বিরুদ্ধতা করিতেছেন নিজে একচ্ছত্র আধিপত্য রক্ষার জন্য। কোনও পার্টি না থাকিলে সুহরাওয়ার্দী একমাত্র নেতা; আর সব পার্টি রিভাইত হইলে সুহরাওয়ার্দী অন্যতম নেতা; . এটা তাঁদের চোখে সহজেই ধরা পড়িল। কিন্তু এটা ধরা পড়িল না এবং সাধারণতঃ ধরা পড়ে না যে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের অবর্তমানে সকলের পার্টিও ঠোটো জগন্নাথ’ মাত্র।
কাজেই পশ্চিম পাকিস্তানে সব নেতারাই যার-তাঁর পার্টি রিভাইভ করিয়া ফেলিলেন। এ ব্যাপারে জামাতে-ইসলামীর নেতা মওলানা আবদুল আলা মওদুদীই রাস্তা দেখাইলেন। অন্যান্য পার্টি-নেতারা তাঁর অনুসরণ করিলেন। তাঁরা অবশ্য যুক্তি দিলেন : পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের মত রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন না হওয়ায় সেখানে পার্টি রিভাইত না করিয়া কোনও কাজই করা যাইবে না। ফলে লিডার পশ্চিম পাকিস্তানে রিভাইভ্যাল ও পূর্ব-পাকিস্তানে নন রিভাইভ্যাল এই দ্বৈতনীতি অবলম্বন করিতে বাধ্য হইলেন। এই অবস্থায়ই তিনি জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এন. ডি. এফ.) গঠন করেন। পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা যাঁর-তাঁর পার্টি রিভাইভ করিলেও পূর্ব-পাকিস্তানে তাঁদের পার্টি-কার্যকলাপ– প্রসারিত করিবেন না, এই ধরনের আশ্বাস তাঁরা লিডারকে দিলেন। কিন্তু ঐ দ্বৈত নীতি শহীদ সাহেবের মত সবল ও সুউচ্চ নেতা ছাড়া আর কাকেও দিয়া কার্যকরী করা সম্ভব ছিল না। সেজন্য শহীদ সাহেব পূর্ব-পাকিস্তানের সকল দলের নেতাদেরই রিভাইভ্যাল-বিরোধী রাখিবার কার্যকরী পন্থা অবলম্বনের চেষ্টায় তৎপর হন। এটা লিডারের কাছে যেমন সুস্পষ্ট ছিল, অপর সকলের কাছেও তেমনি সুস্পষ্ট ছিল যে আর যে পার্টি যাই করুক, যতদিন ন্যাপ ও আওয়ামী লীগ রিভাইব না হইতেছে, ততদিন গণ-ঐক্যের কোনও ক্ষতিই কেউ করিতে পারিবেন না। পূর্ব পাকিস্তানে আসল গণ-সমর্থিত পার্টি বলিতে এই দুইটি। আর এখানকার ছাত্র-তরুণসহ গোটা জনসাধারণ রিভাইভ্যালের বিরোধী। শহীদ সাহেবের ঝটিকা সফরের বিরাট-বিরাট জনসভার বক্তৃতায় এই গণ-ঐক্য দিন দিন অধিকতর শক্ত ও মযবুত হইতেছিল।
১১. এক দফা জাতীয় দাবি
লিডার তাঁর সফরের ফাঁকে-ফাঁকে ঢাকায় আসিলে আমার রোগশয্যায় আমাকে দেখিতে আসিতেন। স্বভাবতঃই তাঁর সাথে উঁচুস্তরের অন্যান্য নেতারাও থাকিতেন। এমনি এক সাক্ষাতে সংগী নেতাদের সামনেই তিনি বলিলেন যে ন্যাপ-নেতারা তাঁর কাছে মিনিমাম প্রোগ্রাম হিসাবে চৌদ্দ-পরটা দফা উপস্থিত করিয়াছেন। প্রসংগক্রমে বলা ভাল যে অনেকেই মনে করিতেন, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের উদ্দেশ্য হিসাবে শুধু গণন্ত্র পুনর্বহালের মত অস্পষ্ট ও জনগণের দুর্বোধ্য কথার বদলে ধরা ছোঁয়ার মত একটি সুস্পষ্ট আদর্শ দরকার। তারই নাম দেওয়া হইয়াছিল মিনিমাম প্রোগ্রাম। বিভিন্ন পার্টি-নেতারা এই মিনিমামই লিডারের খেদমতে পেশ করিতেছিলেন। এটা অন্যায়ও ছিল না, অনধিকার চর্চাও ছিল না। তবু মিনিমাম দাবির দফা-সংখ্যা এত বেশি দেখিয়া আমাদের বাস্তব-বুদ্ধির অভাবেই বোধ হয় লিডার বিব্রত বোধ করিতেছিলেন। আমি লিডারকে বলিলাম : অত বেশি দফার দাবি তিনি না মানিতে পারেন, তবে তাঁর নিজেরও এক দফা দাবির দৃঢ়তা কিছুটা শিথিল করিতে হইবে। খানিক আলোচনার পর তিনি এ বিষয়ে চিন্তা করিয়া আমার মত তাঁকে জানাইতে উপদেশ দিলেন।
