পক্ষান্তরে যেকোনও সংস্কার প্রবর্তন করিয়া যদি আপনি ওদের ভুঞ্জিত অধিকার নষ্ট করেন, যদি ওদের ‘দই–এর হাড়িতে কৃষ্ট বা লাঠির বাড়িতে ঘৃষ্ট’ কোনটাই না হন, তবে আপনার কপালে দুঃখ আছে? ‘ভাল’ কথায় যদি আপনি নিজের ভাল না বুঝেন, তবে ‘আপ ক্যা সমঝা? আওয়াম কা রাজ আ গিয়া? জনাব, ভুল যাই এ ইয়ে খেয়াল। পিছে বুরা না মানিয়ে।‘
৭. সুহরাওয়ার্দী গেরেফতার
মার্শাল ল’র পৌনে চার বছর পশ্চিম পাকিস্তানে মার্শার ল-বিরোধী কোনও আন্দোলন হইয়াছে কি না জানি না। কিন্তু পূর্ব-পাকিস্তানে হয় নাই। বরঞ্চ প্রথম কয়েক মাস যেন জনসাধারণকে এতে খুশীই মনে হইয়াছিল। আমাদের রাজনীতিকদেরে সিভিল মিলিটারি গবর্নমেন্ট চাকুরিয়ারা যত দোষই দেন না কেন, আমাদের একটা গুণ তাঁদের স্বীকার করিতেই হইবে সেটা এই যে জনমতের বিরুদ্ধে আমরা কিছু করি না। কোনও একটা রাজনৈতিক কাজকে আমরা নিজেরা যত ভাল বা মন্দ মনে করি না কেন, যতক্ষণ জনমত পক্ষে আসা সম্ভবপর না দেখি, ততক্ষণ তার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনও কাজ করি না।
যথাসময়ে জনগণের মধ্যে বাস্তব চেতনা ফিরিয়া আসার পরও রাজনীতিক নেতা কর্মীরা কোনও আন্দোলনের সংকল্প করেন নাই। ইচ্ছা বা চিন্তা যে করেন নাই, তা নয়। চিন্তাও করিয়াছিলেন, ইচ্ছাও করিয়াছেন। কিন্তু উচিৎ মনে করেন নাই। একটা হোট নযির দিলেই চলিবে। অত অসুখ, গায়ে ১০৩ ডিগ্রি জ্বর ও পায়ের বুড়া আংগুলের প্রদাহহেতু পা ফুলিয়া যাওয়ার জুতা-ছাড়া পর-পর কয়টা দিন হাইকোর্টে বক্তৃতা করিয়া সুহরাওয়ার্দী আমাকে খালাস করিলেন। জেলখানা হইতে বাড়ি ফেরা-মাত্র ঐ অসুখ শরীরেই তিনি আমাকে দেখিতে আসিলেন। ঐ শরীর নিয়া আমার জন্য অত কঠোর পরিশ্রম করায় আমার স্ত্রী ও আমি লিডারের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাইলাম। তিনি হাসিয়া বলিলেন : শুধু মৌখিক কৃতজ্ঞতায় তিনি সন্তুষ্ট হইবেন না। তিনি আমার কাছে একটা বড় ফিস্ চান। সে ফিস হইতেছে গণ-আন্দোলনের একটা স্কিম। আমাদের মধ্যে আমিই একমাত্র কংগ্রেস-ট্রইও কম। কাজেই এটা করা আমার ডিউটি। প্রধানতঃ এই কারণেই তিনি আমার খালাসের উপর এত গুরুত্ব দিয়াছেন।
লিডারের চোখে-মুখে প্রবল আগ্রহ ও দৃঢ় সংকল্প দেখিলাম। কিন্তু আমি যখন বুঝাইলাম বিনা-প্রস্তুতি ও বিনা-ট্রেনিং-এ গণ-আন্দোলন শুরু করিলে পরিণামে তাকে অহিংস রাখা যাইবে না এবং তাতে রাষ্ট্রের ও খোদ গণ-আন্দোলনের ক্ষতি হইবে, তখন চট করিয়া লিডার তা বুঝিয়া ফেলিলেন। গণ-ঐক্য গণ-আন্দোলনের জন্য অপরিহার্য এবং সে গণ-ঐক্য আসিতে পারে শুধু নেতা-কর্মীদের ঐক্যের মারফত। অতঃপর লিডার সেই দিকেই মনোনিবেশ করেন। ফলে সে সময়ে দেশে কোনও আসন্ন আন্দোলন ছিল না। কিন্তু যেখানে অশান্তি বা আন্দোলন নাই সেখানেও উস্কানি দিয়া অশান্তি সৃষ্টি করায় আমাদের দেশের আমলাতন্ত্র উস্তাদ।
তাই তারা ১৯৬২ সালের ৩১শে জানুয়ারি করাচিতে জনাব শহীদ সুহরাওয়ার্দীকে নিরাপত্তা আইনে গেরেফতার করিল। পরদিন ১লা ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট আইউব ঢাকায় তশরিফ আনিলেন। বিমান বন্দরেই তিনি ঘোষণা করিলেন: বিদেশীর অর্থ-সাহায্যে পাকিস্তান ধ্বংস করিতে যাইতেছিলেন বলিয়াই সরকার মিঃ সুহরাওয়ার্দীকে গেরেফতার করিয়াছেন।
৮. আমরাও জেলে
পূর্ব-পাকিস্তানের ছাত্র-জনতা বিশেষতঃ ঢাকার ছাত্র-তরুণ ও জনসাধারণ বিক্ষোভে ফাটিয়া পড়িল। পনর দিন ঢাকায় রাস্তায়-রাস্তায় কি কি ঘটিয়াছিল এবং তার পরেও বহুদিন পূর্ব-পাকিস্তানের সর্বত্র কি প্রচণ্ড বিক্ষোভ। চলিয়াছিল, তা সকলের চোখের দেখা ব্যাপার। আমার উল্লেখের প্রয়োজন করে না। আমার সে মোগ্যতাও নাই। কারণ ৬ই ফেব্রুয়ারির রাত্রেই আমাকে আমার চতুর্থ পুত্র মনযুর আনাম (তখন ইউনিভার্সিটির ছাত্র-সহ গেরেফতার করা হয়। জেলখানায় অতি অল্পক্ষণের মধ্যেই ইত্তেফাক সম্পাদক মিঃ তফাযযল হোসেন (মানিক মিয়া), শেখ মুজিবুর রহমান, কফিলুদ্দীন চৌধুরী, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, মিঃ কোরবান আলী, মিঃ তাজুদ্দিন আহমদ প্রভৃতি প্রায় বিশ-বাইশ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী (অধিকাংশই আওয়ামী লীগার) আমাদের সহিত একই ওয়ার্ডে মিলিত হইলেন। আমরা জেলখানায় থাকিতে-থাকিতেই প্রেসিডেন্ট আইউব নয়া শাসনতন্ত্র ঘোষণা করিলেন। ঐ সময়েই ২৭শে এপ্রিল (১৯৬২) শেরে-বাংলা এ. কে.ফযলুল হক এন্তেকাল করিলেন। আমরা শোকে সত্যসত্যই মুহ্যমান হইলাম। শোক-চিহ্ন স্বরূপ আমরা কাল ব্যাজ পরিতে জেলকর্তৃপক্ষের অনুমতি চাহিলাম এবং কাল সালু অথবা ছাতির কাপড় যা পাওয়া যায়, আমাদের নিজস্ব পয়সা হইতে তা কিনিয়া দিতে অনুরোধ করিলাম। জেলকর্তৃপক্ষ আমাদের প্রার্থনা মনযুর করিলেন। আমদের সাথে অন্যান্য ওয়ার্ডের রাজবন্দীরা এবং দেখাদেখি সাধারণ কয়েদীরাও কাল ব্যাজ পরিলেন। আমরা গোড়াতে সাতদিনের জন্য ব্যাজ ধারণের অনুমতি পাইয়াছিলাম বটে কিন্তু বহুদিন আমরা সে ব্যাজ খুলি নাই। জেলকর্তৃপক্ষও ব্যাজ খুলিবার তাকিদ দেন নাই।
৯. নয় নেতার বিবৃতি
নয়া শাসন ঘোষণার দুই মাস মধ্যে উহা জারি হয়। জারি হওয়ার পর দিনের মধ্যেই পূর্ব-পাকিস্তানের প্রতিনিধি-স্থানীয় নয় জন নেতা ঐ শাসনতন্ত্র অগ্রাহ্য করিয়া এবং নয়া গণ-পরিষদ কর্তৃক শাসন রচনার প্রস্তাব দিয়া এক বিবৃতি প্রচার করেন ২৫শে জুন। এই বিবৃতি খুবই জনপ্রিয় হয় এবং ‘নয় নেতার বিবৃতি’ বলিয়া প্রচুর খ্যাতি লাভ করে। পূর্ব-পাকিস্তানের সর্বত্র জনসাধারণ, তাদের প্রতিনিধি-স্থানীয় বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান যথা উকিল-মোখতার লাইব্রেরি, চেম্বার-অব-কমার্স, বিভিন্ন সভা-সমিতি-এসোসিয়েশন বিপুলভাবে এই বিবৃতির সমর্থন করে। আমি এই সময়ে দুরন্ত পুর্যাল এফিউশন রোগে গুরুতর অসুস্থ হইয়া পড়ি। তাতে আঠার দিন সংজ্ঞাহীন বা কোমায় ছিলাম। অনেকদিন হাসপাতালে ছিলাম। হাসপাতাল হইতে মুক্তি পাইবার পরেও উহার পুনরাক্রমণ হওয়াতে আবারও মাসখানেকের মত হাসপাতালে থাকিতে হইয়াছিল। অবশ্য সম্পূর্ণ আরোগ্য হইতে আমার প্রায় দুই বছর লাগিয়াছিল। কিন্তু প্রাথমিক সংকট কাটিয়া যাওয়ার পরই আমি নয় নেতার বিবৃতিতে জনগণের সমর্থন ও উল্লাস দেখিয়া অতিশয় আনন্দিত হইয়াছিলাম। এবং তাতেই আমার রোগ অর্ধেক সারিয়া গিয়াছিল। আমার ঐ মারাত্মক রোগে আমার নেতা সহকর্মীরা, তদানীন্তন গবর্নর জনাব গোলাম ফারুক, তৎকালীন হাসপাতাল-প্রধান ডাঃ কর্নেল হক, বিশেষজ্ঞ ডাঃ শামসুদ্দিনের নেতৃত্বে হাসপাতালের সকল ডাক্তাররা আমার জন্য যেভাবে রাত-দিন পরিশ্রম খোঁজ-খবর ও তত্ত্বাবধান করিয়াছিলেন, সে কথা আমার কৃতজ্ঞতার সাথে চিরকাল মনে থাকিবে।
