ব্যক্তিগত কথা বাড়াইয়া পাঠকদের ধৈর্যের উপর যুলুম করিতে চাই না। শুধুদুই একটা কথা বলিয়াই এ ব্যাপারে ইতি করিতে চাই। আমি পারমিট-লাইসেন্সের মালিক বাণিজ্যমন্ত্রী। শিল্পপতিদের ভাগ্যবিধাতা শিল্পমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর উপর আমার বেজায় প্রভাব। তাই পারমিট-লাইসেন্সের বদলা আমি চার কোটি টাকা পার্টি-ফণ্ড তুলিয়াছি। যে দেশে স্কুল-মাদ্রাসা মসজিদ-হাসপাতালের তহবিলও শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি হইয়া যায়, সেখানে চার কোটি টাকার পার্টি-ফন্ড হইতে আমি ব্যক্তিগত সুবিধা কিছুই গ্রহণ করিব না, এমন অবাস্তব কথা বিশ্বাস করিবার মত আহামক লোক আমাদের দেশে একজনও নাই। কাজেই তারা যদি মনে করিয়া থাকে, ঐ টাকা দিয়া আমি অন্ততঃ বেনামিতে পাকিস্তানের বড় বড় শহরে কয়েকখানা বাড়ি-ঘর করিয়াছি, দুই-চারটা শিল্প-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান স্থাপন করিয়াছি, তবে দেশবাসীকে দোষ দেওয়া যায় না। চার কোটি টাকার এতসব বড়-বড় পর্বত যখন মাত্র দশ-পরে হাজারের তিনটি কেসের মুষিক প্রসব করিল, তখন যারা বিস্মিত হইয়াছিল, তারা দুঃখিত হয় নাই। আর যারা দুঃখিত হইয়াছিল তারা বিস্মিত হয় নাই। তিনটি কেসের প্রথমটি আয়ের চেয়ে সম্পত্তি বেশি করার অভিযোগ। মার্কিন সাহায্যের পূর্ব-পাকিস্তানের অংশ চার কোটি টাকার সবটাই আমি মারিয়া দিয়াছি, এই ধারণা হইতেই অভিযোগটা উঠিয়াছিল। যারা অভিযোগটা করিয়াছিল তারা নিজেরাই ওটায় বিশ্বাস করে নাই। ইট ওয়ায টু বিগ টু বিলিত। কিন্তু চার কোটি না হউক, চল্লিশ লক্ষ, চল্লিশ লক্ষ না হউক, চার লক্ষ, চার লক্ষ না হউক চল্লিশ হাজার টাকাও এতবড় প্রতাপশালী শিল্প-বাণিজ্যমন্ত্রী ডান হাত–বাঁ হাত করে নাই! এতবড় বেওকুফকে কোনও প্রধানমন্ত্রী তাঁর শিল্প-বাণিজ্যমন্ত্রী করিতে পারেন, এটা। স্বয়ং পুলিশও বিশ্বাস করিতে পারে নাই। তাই তাঁরা পূর্ব-পাকিস্তান চাষ করিয়া শেষ পর্যন্ত বহু অর্থব্যয়ে উচ্চপদস্থ অনেক পুলিশ কর্মচারি পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠাইয়াছিল। ঐসব সুযোগ অভিজ্ঞ তীক্ষ্ণবুদ্ধি পুলিশ কর্মচারি, যাঁরা ত্রিশ হাত কুয়ার নিচে হইতে চোরাই মাল উদ্ধার করিতে পারেন তাঁরা, দীর্ঘদিন পশ্চিম পাকিস্তানের শহর-নগর ও ব্যাংকাদি চাষ করিলেন। নিরাশ হইয়া ফিরিয়া আসিলেন। বোধ হয় রাগ করিয়া বলিলেন : এত শুনিলাম। কিছু পাইলাম না। এতবড় ক্ষমতাশালী মন্ত্রী হইয়াও কিছুকরিল না। লোকটা মন্ত্রী হওয়ার যোগ্যই না। আসলে লোকটা একটা ইডিয়ট। অগত্যা ফাইনাল রিপোর্ট দিলেন। বাকি থাকিল দুইটা। তার একটাতে এক ভদ্রলোক আমার আত্নীয় বলিয়া পরিচয় দিয়া এক শিল্প-ব্যবসায়ীর নিকট হইতে তের হাযার টাকা আদায় করিয়াছিলেন। মন্ত্রীর সাথে ব্যবসায়ী ভদ্রলোকের দেখা নাই। কোনও মন্ত্রী বা পদস্থ লোকের নাম করিয়া অন্য কেউ কিছু করিলে মন্ত্রী বা পদস্থ লোক অপরাধী হন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত একথা বিশ্বাস করিলেন না। গেল সে কেসও। বাকি থাকিল একটি। এটি করাচিতে। ঐ ভদ্রলোক কলিকাতা হইতে টেক্সট বুক আমদানির জন্য দশ হাজার টাকার লাইসেন্স পাইয়াছিলেন। তিনি টেক্সট বুক কমিটির বই-এর একজন পাবলিশার। আমার মন্ত্রিত্বের বহু আগে হইতেই তিনি পাবলিশার ও ছাপাখানার মালিক। তিনি ঐ টাকায় টেক্সট বুক আমদানিও করিয়াছিলেন। কিন্তু সেই পুস্তক নিজের জিলায় না দিয়া ঢাকার বাজারে বিক্রয় করিয়াছেন, এই তাঁর অপরাধ। অপরাধ যদি হইয়াই থাকে, তবে তা করিয়াছেন তিনি। অথচ পুলিশ তাঁর নামে মামলা করিয়া মামলা লাগাইলেন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আমার নামে। বাণিজ্যমন্ত্রী লাইসেন্স না দিলে ত তিনি ঐ অপরাধ করিতে পারিতেন না। এটাই বোধ হয় ছিল পুলিশের যুক্তি। কিন্তু গবর্নমেন্ট পুলিশের এই যুক্তি মানিলেন না। মামলা স্যাংশনের জন্য যখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে গেল, পুলিশের দুর্ভাগ্যবশতঃ তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মিঃ হবিবুল্লা খান যিনি অল্পদিন আগেও ছিলেন একজন সেশন জজ। তিনি মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলেন। জনাব হবিবুল্লা খান সাহেবকে অশেষ ধন্যবাদ। তিনি ঐ নির্দেশ না দিলে আমার মত অসুস্থ লোক করাচি কেস করার টানা-হেচড়া সত্যই বরদাশত করিতে পারিতাম না। এটাও খান সাহেব নিশ্চয়ই বিবেচনা করিয়াছিলেন।
এইভাবে শারীরিক দুর্গতির হাত হইতে আমি রক্ষা পাইলাম। কিন্তু মানসিক দুর্গতি কাটিল না। দুর্নীতির অভিযোগের এই বিশেষ দিকটি লইয়া আমি অনেক চিন্তা ভাবনা করিয়াছি। মন্ত্রীদের ঘুষ-রেশওয়াত খাওয়ার অভিযোগ সম্বন্ধে আমি একটা বিশেষ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছি। কায়েমী স্বার্থীদের ভুঞ্জিত অধিকারের মনোপলিতে হাত দিলেই আপনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ হইবে। এটা আসলে দুর্নীতি করিতে রাযী না হওয়ার দুর্নীতি। মন্ত্রী হইয়া যদি ওদের ভুঞ্জিত অধিকারের হাত না দেন, তবে আপনি খুব ভাল মন্ত্রী। এক-আধটু খোঁচা-টোচা মারিয়া তুষ্ট হইয়া হাত গুটাইলে আরও ভাল। এইভাবে আপনি আরামে তাঁদের মনোপলি মুনাফার ‘ছটাকখানি অংশও পাইতে পারেন। মন্ত্রিত্ব যাওয়ার পরেও গুড কণ্ডাক্টের পুরস্কার স্বরূপ পেনশনও পাইতে থাকিতে পারেন।
