বাইরে আমাদের পরিবার-পরিজন যামিনের জন্য রোজ এ-কোট-ও-কোট করিতেছিল। তাই সরকার ইতিমধ্যে আমাদের তিন জনকেই নিরাপত্তা আইনে বন্দী করিয়া যামিনের সমস্যার সমাধান করিয়া ফেলিলেন। পরে জানিয়াছিলাম, মওলানা সাহেব ও মুজিবুর রহমানের জন্য আমার দুশ্চিন্তা ছিল নিতান্ত অনাবশ্যক। তাঁরা সকাল-সন্ধ্যা সজীর বাগান করিয়া মরিচ-বেগুনের ও নানা প্রকারের মৌসুমী ফুলের চারা লাগাইয়া আনন্দেই কাল কাটাইতেছেন। নিজের হাতে লাগানো গাছের ফুল ত তাঁরা উপভোগ করিবেনই, এমন কি, মরিচ-বেগুন দিয়া ভর্তা-চাটনিও খাইয়া যাইবার সিদ্ধান্ত তাঁরা করিয়া ফেলিয়াছেন। মুজিবুর রহমান আর এক ধাপ আগাইয়া গিয়াছেন। অন্য ওয়ার্ড হইতে একটা ফজলী আমের চারা (কলম নয়) জোগাড় করিয়া নিজের সেলের ছোট আংগিনায় লাগাইয়াছিলেন। জেলার-সুপারকে বলিয়াছিলেন, ঐ গাছের আম খাইয়া যাইবার জন্য তিনি মন বাঁধিয়াছেন। মুজিবুর রহমানের মনের বল দেখিয়া অফিসাররা অবাক হইয়াছিলেন। কিন্তু বেচারা আবদুল খালেক সেলের একাকিত্ব সহিতে পারিলেন না। তিনি ছিলেন হার্টের রোগী। ঘোরতর অসুস্থ হইয়া পড়িলেন। তাঁকে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বদলি করা হইল। ডাক্তারদের পরামর্শে শেষ পর্যন্ত তাঁকে মুক্তি দেওয়া হইল। ইতিমধ্যে হামিদুল হক চৌধুরী, আযগর আলী শাহ ও আবদুল জব্বার সাহেবের বিভিন্ন তারিখে যামিনে খালাস হইয়া গেলেন। ওঁরা কেউ নিরাপত্তা বন্দী ছিলেন না। এইভাবে শেষ পর্যন্ত আমরা জন-চারেক আওয়ামী লীগারই জেলখানায় থাকিলাম নিরাপত্তা বন্দী হিসাবে। তিন-চার মাসেও ‘গ্রাউড অব ডিটেনশন’ না দেওয়ায় আমার দ্বিতীয় ছেলে মহবুব আনাম আমার মুক্তির জন্য হাইকোর্টে রীট করিল। অসুস্থ শরীর লইয়াও সুহরাওয়ার্দী সাহেব জোরালো সওয়াল-জবাব করিলেন। আমার বিচার স্প্যাশাল বেঞ্চে গেল। সেখানেও সুহরাওয়ার্দী সাহেব লম্বা সওয়াল-জবাব করিলেন। শেষ পর্যন্ত ২৯শে জুন ১৯৫৯ সাল হাইকোর্টের স্প্যাশাল বেঞ্চ আমাকে খালাস দিলেন।
ইতিমধ্যে আমার বিরুদ্ধে তিনটা দুর্নীতি দমন আইনের কেস দায়ের হইয়াছিল। মুজিবুর রহমান, ক্যাপটেন মনসুর আলী, কোরবান আলী, আবদুল হামিদ চৌধুরী ও নুরুদ্দিন আহমদ সাহেবানের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির কেস হইয়াছিল। আমরা আসামীরা সবাই আওয়ামী লীগার। আওয়ামী লীগাররাই দুর্নীতিবায এটা দেখানোই এই সব কেসের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। শেষ পর্যন্ত আদালতের বিচারে কারো বিরুদ্ধেই কোনও মামলা টিকে নাই। কথায় বলে, ভালরূপ কাদা ছুড়িতে পারিলে কাদা গেলেও দাগ থাকে। আমাদের বিরুদ্ধে কেসগুলো কে বা কারা কি উদ্দেশ্যে করিয়াছিলেন, এটা অবশ্য দেশবাসীই শেষ বিচার করিবে। কিন্তু এ ব্যাপারে দুই-একটি ঘটনার উল্লেখ না করিয়া পারিতেছি না।
৬. দুর্নীতির অভিযোগ
আমাদেরে গেরেফতার করার দুই-এক দিন পরেই গবর্নর যাকির হোসেন আমাদের সাথে জেলখানায় দেখা করেন। কথা প্রসংগে বলেন : তার ইচ্ছায় আমাদেরে গ্রেফতার করা হয় নাই। কেন্দ্রের হুকুমেই এটা হইয়াছে। এর কয়দিন পরে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্যা খবরের কাগযের রিপোর্টারদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন? পূর্ব-পাকিস্তানী নেতৃবৃন্দের গেরেফতার সম্বন্ধে কেন্দ্রীয় সরকার কিছুই জানেন না। পূর্ব-পাকিস্তান সরকারের ইচ্ছামতই ওঁদের গেরেফতার করা হইয়াছে। এরও কিছুদিন পরে তঙ্কালিন আই.জি.ও অস্থায়ী চিফ সেক্রেটারি জনাব কাযী আনওয়ারুল হক মেরেবানি করিয়া আমার সাথে দেখা করেন। কাযী আনওয়ারুল হকের মরহুম পিতা কাজী এমদাদুল হক, আমাদের সাহিত্যিক-গুরু ছিলেন। সেই উপলক্ষে আমি কাযী আনওয়ারুল হককে ছোট ভাই-এর মতই স্নেহের চোখে দেখিতাম। তিনিও বোধ হয় আমাকে বড় ভাই-এর মতই সম্মান করিতেন। জেলখানার সাক্ষাতে তাঁর সে-শ্ৰদ্ধার ভাব অক্ষুণ্ণ পাইলাম। তিনি দরদ-মাখা গলায় বলিলেন : আপনার মত লোকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ হওয়ায় আমরা অনেকেই অন্তরে ব্যথা পাইয়াছি। কিন্তু সার, আপনারও দোষ আছে। চার কোটি টাকার এতবড় একটা বদনাম খবরের কাগয়ে ছড়াইয়া পড়িল, আপনি তার কি প্রতিকার করিলেন? আমি বিস্ময়ে বলিলাম। বলেন কি কাযী সাহেব? আমি প্রতিবাদ করি নাই? যে মর্নিং নিউয এই বদনামের প্রচারক, তারা আমার প্রতিবাদ ছাপে নাই সত্য কিন্তু করাচির ‘ডন ও ঢাকার সব কাগযে বিশেষতঃ ইত্তেফাকে পুরা প্রতিবাদ ছাপা হইয়াছে। আপনি পড়েন নাই?
পড়িয়াছি নিশ্চয়ই। কাযী সাহেব বলিলেন। কিন্তু আমি প্রতিবাদের কথা বলি নাই। প্রতিকারের কথা বলিয়াছি। আপনার মানহানি মামলা করা উচিত ছিল।
মামলা করার আমার ইচ্ছা, শহীদ সাহেবের বাধা দান, সব কথা কাযী সাহেবকে বলিয়া উপসংহারে বলিলাম। কিন্তু কাযী সাহেব, খবরের কাগযে রাজনীতিক নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পড়িয়াই বিনা-তদন্তে এর আগে কাউকে গেরেফতার করিয়াছেন কোনও দিন? রাজনীতিক দলাদলিতে কত অভিযোগ পাল্টা-অভিযোগই ত হয়। সেসব দোষাদুবিই যদি মামলা দায়েরের বুনিয়াদ হয়, তবে আপনারা আছেন কিসের জন্য? এতক্ষণে কাযী সাহেব স্বীকার করিলেন এসব রাজনৈতিক ব্যাপার। উপরের হুকুমেই সরকারী কর্মচারিরা এটা করিতে বাধ্য হয়। আমি প্রেসিডেন্ট মিষ ইস্কান্দরের ঘোষণার দিকে কাযী সাহেবের মনোযোগ আকর্ষণ করিলে তিনি মুচকি হাসিলেন, কিছু বলিলেন না।
