৪. গেরেফতার
বেশিদিন ভাবিতে হইল না। অতঃপর যা শুরু হইল, তা রাজনীতি নয় রাজা নীতি। ১০ই অক্টোবরের রাত দুইটার সময় প্রায় ভাংগিয়া-ফেলার-মত দরজা-ধাক্কা ধাক্কিতে ঘুম ভাংগিল। দরজা খুলিতেই দেখিলাম এলাহি কাণ্ডা আংগিনা-ভরা সশস্ত্র পুলিশ ও সৈন্যবাহিনী। আমাকে গেরেফতার করিতে আসিয়াছে। বেশ, ধরিয়া নিয়া যান। না, বাড়ি বানা-তল্লাশ হইবে। কারণ নিরাপত্তা আইনে নয়, দুর্নীতি দমন আইনে। বলিলাম ও দুর্নীতি দমন আইনে এমন অগ্রিম গেরেফতার করার ত বিধান নাই। আগে নোটিশ দিতে হইবে। কেস করিতে হইবে। তারপর না গেরেফতার? পুলিশ বাহিনীর নেতা ডি. এস. পি.। তিনি হাসিয়া বলিলেন : এতদিন আইন তাই ছিল বটে, এখন তা বদলান হইয়াছে। মিঃ যাকির হোসেন গবর্নর হইয়া সন্ধ্যার দিকে ঢাকা ফিরিয়াই গবর্নমেন্ট হাউসে পুলিশ ও অন্যান্য বড়-বড় অফিসারদের কনফারেন্স করিয়াছেন। সেখানেই তিনি দুর্নীতি দমন আইন সংশোধন করিয়া অর্ডিন্যান্স জারি করিয়াছেন। ডি. এস. পি. সাহেব এই কনফারেন্স হইতেই সোজা আমার বাসায় আসিয়াছেন। তিনি এক কপি আইনের বই ও তার লাইনের ফাঁকে হাতের-লেখা সংশোধনটি দেখাইলেন। বলিলেন : অর্ডিন্যান্সের সারমর্ম ঐ। গবর্নর সাহেব করাচি হইতে তালিকা লইয়াই আসিয়াছেন। তালিকাভুক্ত সবাইকে গেরেফতারের জন্য চারিদিকে পুলিশ অফিসাররা বাহির হইয়া গিয়াছেন। ডি.এস.পি. সাহেব ঘনিষ্ঠতা দেখাইয়া বলিলেন : সবাই আপনার মত বড়-বড় নেতা। আরও ঘনিষ্ঠভাবে বলিলেন : মোটমাট চৌদ্দজনের তালিকা। কে কে, আভাসে-ইংগিতে তাও বলিয়া ফেলিলেন। সব শুনিয়া আমি বলিলাম। কিন্তু ডি.এস.পি. সাহেব, ঐ অর্ডিন্যান্স গেযেট না হওয়া পর্যন্ত বলবৎ হইতে পারে না। ডি.এস.পি, হাসিয়া বলিলেন সে বিষয়ে। কোন চিন্তা করিবেন না সার, গেযেট একস্ট্রা-অর্ডিনারি ছাপার জন্য ই. বি. জি. প্রেমে কপি চলিয়া গিয়াছে। আপনাদের কোর্টে নেওয়ার আগেই ছাপা হইয়া আসিয়া পড়িবে। অগত্যা আমি সন্তুষ্ট, ইংরাজিতে যাকে বলে স্যাটিসফাইড, হইলাম। বলিলাম :
তবে খানা-তল্লাশ শুরু করেন। তাঁরা শুরু করিলেন। রাত্র দুইটা হইতে বেলা দশটা পর্যন্ত আটটি ঘন্টা বাড়িটা তছনছ করিলেন। আলমারি, বাক্স, সুটকেস, তোষক, বালিশ, বিছানার উপর-নিচ, বাথরুম, পাকঘর, আমার মোটামুটি বড় লাইব্রেরির বড়-বড় আইন পুস্তকের মলাট-পাতা, কিছু বাদ রাখিলেন না। দীর্ঘ আট ঘন্টা ধরিয়া এই তছনছু চলিল। বেলা দশটার দিকে আমাকে এনটি-কোরাপশান আফিসে নেওয়া হইল। সেখানে গিয়া যাঁদেরে পাইলাম, এবং অল্পক্ষণ মধ্যেই যাঁদেরে আনা হইল, সব মিলাইয়া হইলাম আমরা মোট এগার জন। তাঁদের মধ্যে জনাব হামিদুল হক চৌধুরী, জনাব আবদুল খালেক, জনাব শেখ মুজিবুর রহমান, এডিশনাল চিফ সেক্রেটারি মিঃ আষগর আলী শাহ, চিফ ইঞ্জিনিয়ার মিঃ আবদুল জব্বার প্রভৃতির নামই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ডি.আই.জি, মহীউদ্দিন আহমদের আগমন অপেক্ষায় আমাদের বসাইয়া রাখা হইল। ঘন্টা দুই-তিন অপেক্ষা করা হইল। তাঁর দেখা নাই। অবশেষে সমবেত এস.পি.ডি.এস.পি.রাই আমাদের পৃথক-পৃথক বিবৃতি নিতে লাগিলেন এক-একজন করিয়া। সম্পত্তির তালিকা। আয়-ব্যয়ের হিসাব। লম্বা লম্বা বিবৃতি। এসব করিতে সন্ধ্যা হইয়া গেল। ইতিমধ্যে আসামীদের সকলের বাড়ি হইতেই খানা আসিয়াছিল। পরিবারের লোকজনকেও আসিতে দেওয়া হইয়াছিল। তাঁরাই দুইটা-তিনটার দিকে আমাদের খাওয়াইয়া গিয়াছেন।
অবশেষে সন্ধ্যার সময় আমাদের এস.ডি.ওর এললাসে হাযির করা হইল। এজলাসে এস.ডি.ও, সাহেব একা নন। তাঁর পাশে বসা কর্নেল স্তরের একজন মিলিটারি অফিসার। আমাদের পক্ষের উকিলরা যামিনের দরখাস্ত করিলেন। কোন এযাহার ছাড়াই আমাদের গেরেফতার করা হইয়াছে, সে কথা বলিলেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারা মতে আমাদের যামিন দিতে বাধ্য, এই মর্মে অনেক আইন নযির দেখাইলেন। পাবলিক প্রসিকিউটরযামিনের বিরুদ্ধকরিলেন। আসামীরাসবাই প্রভাবশালী জনপ্রিয় নেতা। এরা বাহিরে থাকিলে সমস্ত তদন্ত কার্যই ব্যাহত হইবে।
এস.ডি.ও, সাহেব কথা বলিলেন না। চোখ তুলিয়া আমাদের বা উকিলদের দিকে একবার নযরও করিলেন না। মাথা হেট করিয়া যেমন বসিয়াছিলেন, তেমনি বসিয়া আমাদের দরখাস্তে ‘রিজেক্টেড’ লিখিয়া বাহির হইয়া গেলেন। আমাদেরে জেলখানায় নেওয়া হইল। সবাইকে নেওয়া হইল পুরানা হাজতে। শুনিতে যত খারাপ;আসলে অত খারাপ নয়। বরঞ্চ জেলের মধ্যে একটা সবচেয়ে ভাল জায়গার অন্যতম। প্রকাণ্ড একটা হলঘর। সবাই এক সংগে থাকা যায়। এটাই এ ঘরের আকর্ষণ। দিনে ত বটেই রাতেও সব একত্রে, সভা করিয়া, তাস-দাবা খেলিয়া কাটান যায়।
৫. জেল খানায়
এখানে ঢুকিয়াই পাইলাম মওলানা ভাসানীকে! তাঁকে অবশ্য করাপশান আইনে ধরা হয় নাই, ধরা হইয়াছে নিরাপত্তা আইনে। যে আইনেই হউক, আমরা সবাই মেঝেয় ঢালা বিছানা করিয়া রাত কাটাইলাম। তাতে কোনই অসুবিধা হইল না। কারণ সারারাত দেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আলোচনায় ব্যস্ত রহিলাম।
কিন্তু কর্তৃপক্ষ যেন আমাদের ‘জেলের মধ্যে অত সুখ’ সহ্য করিতে পারিলেন না। পরদিনই মওলানা ভাসানীকে ‘সেলে’ নিয়া গেলেন। তারপর এক-এক করিয়া মুজিবুর রহমান, আবদুল খালেক ও আমাকে পৃথক-পৃথক সেলে আবদ্ধ করিলেন। প্রথম-প্রথম মানসিক কষ্ট হইল খুবই। কিন্তু সহিয়া উঠিলাম। তখন নিজের চেয়ে বন্ধুদের জন্য চিন্তা হইল বেশি। আমি নিজে লেখক ও পাঠক। দিন-রাত হাবি-জাবি লিখিয়া ও বই পড়িয়া সময় কাটাইতে লাগিলাম। কিন্তু বন্ধুরা না লেখেন, না পড়েন। সুতরাং ‘সেলে’ ওঁদের দিন কিভাবে একাকী কাটে সে দুশ্চিন্তা আমাকে পাইয়া বসিল। এত কষ্টেও একটা খবর পাইয়া নিজের কথা ভুলিয়া গেলাম। ২৮শে অক্টোবরের খবরের কাগযে পড়িলাম প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্যা স্টেপ ডাউন করিয়াছেন। প্রেসিডেন্টির গদি ত্যাগ করিয়াছেন। চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর ও প্রধানমন্ত্রী জেনারেল আইউব খা প্রেসিডেন্টের আসনে উপবিষ্ট হইয়াছেন। হাসিব কি কাঁদিব হঠাৎ স্থির করিতে পারিলাম না। নিজের ফাঁদে নিজে পড়িবার এমন দৃষ্টান্ত সাম্প্রতিক ইতিহাসে ত নাই-ই, নীতি কথার বই-এ ছাড়া আর কোথায় পড়িয়াছি, তাও মনে করিতে পারিলাম না। হায় বেচারা মির্যা। ইলেকশন ঠেকাইয়া প্রেসিডেন্টি কায়েম করিবার উদ্দেশ্যেই নিশ্চয় ঐ ‘বিপ্লব’ করিয়াছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টগিরিই ছাড়িতে হইল। বিপ্লব ঘোষণার মাত্র একুশদিন পরেই খবরের কাগযে পড়িলাম, তিনি সস্ত্রীক বিলাত চলিয়া গেলেন। বলা হইল, সেখানেই তিনি স্থায়ীভাবে থাকিবেন। ‘বিপ্লব’ ঘোষণা করিবার অব্যবহিত পরেই তিনি বক্তৃতা করিয়াছিলেন : এ বিপ্লবের বিরুদ্ধতা বরদাশত করা হইবে না। যাদের এটা পসন্দ হইবেনা, তারা সময় থাকিতে দেশ ছাড়িয়া চলিয়া যাউক। হায় কপাল! সকলের আগে এবং সম্ভবতঃ একা তাঁকেই সময়ে থাকিতে দেশ ছাড়িতে হইল।
