অতঃপর চৌধুরী সাহেব দৃঢ় প্রত্যয়ের সুরে বলিলেন যে তাঁর নিশ্চিত বিশ্বাস নির্বাচন হবে না। নির্বাচনের আগেই একটা কিছু ঘটিয়া যাইবে। তার অনেক আলামতই তিনি দেখিতেছেন। একটা আলামত এই যে মাত্র দুই-একদিন আগে তিনি নিজে দেখিয়াছেন চাঁটগা হইতে স্পেশ্যাল ট্রেন বোঝাই হইয়া মিলিটারি ঢাকার দিকে আসিতেছে। অতি উচ্চ হাসিতে তাঁর সন্দেহ দূর করিবার চেষ্টা করিলাম। বলিলাম। ও-সব স্মাগলিং বন্ধ করার জন্য ‘অপারেশন ক্লোড ডোরের’ আম্রোজন। তিনি আমার কথায় বিশ্বাস করিলেন না। না করিবার অনেক কারণও বলিলেন। কেউ কাকেও বুঝাইতে পারিলাম না। যার-তার মত লইয়া বিদায় হইলাম।
এর পর মনে পড়িল, কয়েকদিন আগে বন্ধুবর আবু হোসেন সরকার ও মোহন মিয়াও এই ধরনের কথা বলিয়াছিলেন : শহরে বন্দরে ও রেল স্টেশনে সৈন্যবাহিনীর অস্বাভাবিক যাতায়াত দেখিয়াই তাঁরা বলিয়াছিলেন একটা কিছু যেন হইতেছে। ঐ অপারেশন ক্লোড ডোর দিয়া তাঁদেরও বুঝাইয়াছিলাম। তাঁরা যেন অগত্যা বলিয়াছিলেন : হৈতেওবা পারে।
২. পূর্বাভাস
সূতরাং দেখা গেল, আমি ছাড়া আর সকলেই যেন বিপদ আশংকা করিতেছিলেন। আজ বুঝিলাম, ওদের চেয়ে আমি কত নির্বোধ। নইলে এসব কথা আমার মনে বাজিল না কেন? অল্প কিছুদিন আগে করাচিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিঃ ল্যাংলি এবং তাঁরও আগে মার্কিন ফার্স্ট সেক্রেটারি মিঃ ড্যাদার সাথে পাকিস্তানের প্রতি মার্কিন এ্যাটিচুড নিয়া আলাপ-আলোচনা করিতেছিলাম। উভয়েই পাকিস্তানী রাজনীতির সাম্প্রতিক ভাব-গতিতে দুর্ভাবনা প্রকাশ করিয়াছিলেন। আসন্ন নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তানে মুসলিম লীগ জয়লাভ করিবে এবং প্রাদেশিক সরকার গঠন করিবে, এসম্বন্ধে তাঁদের পূর্ব-ধারণা দৃঢ় ছিল। তাঁরা বিশ্বাস করিতেন আওয়ামী লীগ মার্কিন-বিরোধী। আওয়ামী লীগের সুস্পষ্ট মত সিটো বাগদাদ প্যাক্টের বিরুদ্ধে এটা তাঁদের জানা কথা। মওলানা ভাসানী বাহির হইয়া যাওয়ার পরও আওয়ামী লীগে এই মতের লোকই বেশি। কিন্তু ভাতে তাঁদের ভয়ের কোন কারণ নাই। আওয়ামী লীগের অধিকাংশের মত যাই থাকুক, তাঁদের অবিসম্বাদিত নেতা সুহরাওয়ার্দীকে মার্কিন-নেতারা বিশ্বাস করেন। তিনি নীতি হিসাবেই ইংগ-মার্কিন বন্ধুত্বে বিশ্বাসী। মুসলিম লীগও মার্কিন সমর্থক, এ বিশ্বাসও তাঁদের দৃঢ়। সুতরাং আগামী নির্বাচনের পরে যখন পূর্ব-পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তানে মুসলিম লীগ সরকার গঠন করিবে, তখন কেন্দ্রে দুই পার্টির কোয়েলিশন সরকার হইতেই হইবে। এই কোয়েলিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী সুহরাওয়ার্দী ছাড়া আর কেউ হইতে পারেন না। সুতরাং মার্কিন-সমর্থক পশ্চিম পাকিস্তান সরকার ও সুহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকারও মার্কিনঘেষা হইতে বাধ্য। মার্কিন দূতাবাসের চিন্তা-ধারা যখন এই পথে, ঠিক সেই সময় সর্দার আবদুর রব নিশতারের মৃত্যুতে খান আবদুল কাইউম খা মুসলিম লীগের সভাপতি হন। সভাপতি হইয়াই তিনি মার্কিনীদের প্রতি কটু-কাটব্যে মওলানা ভাসানীকেও ছাড়াইয়া গেলেন। বিরাট-বিরাট জনসভায় তিনি এই ধরনের বক্তৃতা করিয়া বিপুল সম্বর্ধনা-অভিনন্দন পাইতে লাগিলেন। সারা পশ্চিম পাকিস্তানের সর্বত্র এবং খোদ করাচিতে মুসলিম লীগ-সমর্থক বিরাট জনতা মার্কিন দূতাবাসের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের ও মার্কিনী দালাল বলিয়া কথিত ইস্কান্দর মির্যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাইতে লাগিল। ঠিক এই সময়েই মার্কিন-দূতাবাসের ঐসব অফিসারকে বিষণ্ণ ও পাকিস্তানের ভবিষ্যত সম্বন্ধে উদ্বিগ্ন দেখিয়াছিলাম। আসন্ন নির্বাচনের ফলে পাকিস্তান পশ্চিমা রাষ্ট্র গোষ্ঠী হইতে বাহির হইয়া যাইবে, স্বয়ং সুহরাওয়ার্দীও আর ঠেকাইয়া রাখিতে পারিবেন না। এ সম্পর্কে তাঁদের মনে এই সময়ে আর কোনও সন্দেহ দেখিলাম না। আগামী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট মির্যা আর প্রেসিডেন্ট হইতে পারিবেন না। এই সন্দেহ হওয়ার পর হইতে তিনিও নানা কৌশলে নির্বাচন ঠেকাইবার চেষ্টায় ছিলেন। আমার সন্দেহ, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হইয়াও আমেরিকানরা এই কারণে এই সময়ে পাকিস্তানের আসন্ন নির্বাচনের বিরোধী হইয়া উঠিয়াছিলেন। এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট মির্যার সাথে তাঁদের যোগাযোগ হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এই কারণে আমার মনে হয় পূর্ব-পাকিস্তান আইন-পরিষদে বিরোধী দলের গুণ্ডামি, কেন্দ্রে ফিরোয় খাঁর মন্ত্রিসভায় খামখা রদ বদল, পোর্টফলিও লইয়া অর্থহীন বিসম্বাদ ইত্যাদি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একই অদৃশ্য হস্ত পর্দার আড়াল হইতে এই পুতুল নাচ করাইয়াছিল। এমন কি সি. আই. এ.-র হাত থাকাও অসম্ভব নয়।
৩. কর্ম শুরু
পরদিন। ৮ই অক্টোবর। সেক্রেটারিয়েট-ভবনে একটা মিটিং ছিল। কয়েকদিন আগে পূর্ব-পাকিস্তান সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির উৰ্দ্ধগতি দাম সম্বন্ধে তদন্ত করিবার জন্য কমোডিটি-প্রাইস-কমিশন নামে একটি কমিশন নিযুক্ত করিয়াছিলেন। আমাকে এই কমিশনের চেয়ারম্যান করা হইয়াছিল। এই কমিশনেরই প্রথম বৈঠক ছিল ৮ই অক্টোবর সকাল নটায়। সেক্রেটারিয়েট-বনে। মার্শাল ল জারি হওয়ায় কমিশনের বৈঠক মোটেই হইবে কি না, জানিবার জন্য আমি কমিশনের সেক্রেটারি মিঃ কেরামত আলী সি. এস. পি.-কে টেলিফোন করিলাম। তিনি জানাইলেন তিনি কোনও বিপরীত নির্দেশ পান নাই। কাজেই কমিশনের কাজ চলিবে। নির্ধারিত সময়ে বৈঠকে উপস্থিত থাকিতে তিনি আমাকে অনুরোধ করিলেন। আমি গেলাম। আমার সভাপতিত্বে সভার কাজ শুরু হইল। সব মেম্বররাই উপস্থিত হইলেন। দশ-বারজন মেম্বরের মধ্যে জন-তিনেক এম, এল এ ছাড়া আর সবাই সেক্রেটারি ও ডি. আই. জি. স্তরের অফিসার। নিয়ম-পদ্ধতি সম্বন্ধে প্রাথমিক আলোচনা শেষ হইবার আগেই কমিশনের সেক্রেটারির বাহিরে ডাক পড়িল। তিনি ফিরিয়া আসিয়া জানাইলেন যে কমিশনের সর্বশেষ পযিশন জানার জন্য গবর্নমেন্ট হাউসে নির্দেশ চাহিয়া ফোন করা হইয়াছে। সে নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত কমিশনের কাজ আর আগাইতে পারে না। অতএব, আমরা সভার কাজ বন্ধ করিয়া চা-বিস্কুট-পান-সিগারেট খাওয়ায় মন দিলাম। হাযার বিপদেও মানুষ খোশালাপে বিরত হয় না। জানাযার নমাযে ও দাফনে সমবেত মানুষও গল্প করে। আমরাও খোশালাপ শুরু করিলাম। মার্শাল ল সম্বন্ধেও। মার্শাল ল’টা সে জাতির বিপদ, অন্ততঃ পূর্ব-পাকিস্তানে মার্শাল ল’র সমর্থনে কোনও লোক পাওয়া যাইবে না, আমার এই আস্থা ও বিশ্বাস এক ফুৎকারে মিলাইয়া গেল এই বৈঠকেই। মার্শাল ল’র পরে এটাই আমার বাহিরের লোকের সাথে প্রথম মিলন। সমবেত লোকেরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত চিন্তাশীল লোক। আমি দেখিয়া মর্মাহত হইলাম যে এই উচ্চ পদস্থ অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল সরকারী কর্মচারীদের অনেকেই এটাকে জাতির বিপদ বলিয়া মনে করেন নাই। বরং কাজে কথায় ও মুখ-ভংগিতে মনে হইল এতে যেন তাঁদেরই জয় হইয়াছে। মনটা দমিয়া গেল। আর কোনও উৎসাহ থাকিল না। গবর্নমেন্ট হাউস হইতে হাঁ-সূচক কোনও নির্দেশ আসিল না। সাইনিডাই সভা ভাংগিয়া দিয়া বিদায় হইলাম। আর কি কি বিপদ আসিতে পারে, তার অপেক্ষা করিতে লাগিলাম।
