১. বজ্রপাত
৭ই অক্টোবর ১৯৫৮ সাল। রাত আটটা। রেডিওতে শুনিলাম, দেশে মার্শাল ল হইয়াছে। প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্যা শাসন ‘এ্যাব্রোগেট’ করিয়াছেন। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা ও আইন-পরিষদ ভাংগিয়া দিয়াছেন। প্রধান সেনাপতি জেনারেল আইউব খাঁকে প্রধানমন্ত্রী ও চিফ মার্শাল ল এ্যাডমিনিস্ট্রেটর নিযুক্ত করিয়াছেন।
স্তম্ভিত হইলাম। রেডিওতে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সেনাপতির মুখে কথাটা না শুনিলে বিশ্বাস করিতাম না। ওঁদের মুখে শুনিয়াও বিশ্বাস করা সহজ হইল না। শাসন বাতিল করার ক্ষমতা এরা পাইলেন কোথায়? মিলিটারি কু করিতে যে শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা লাগে না, এটা আমি তখনও বুঝি নাই। কিন্তু শাসনতন্ত্র বাতিল করিয়া সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করিলে শাসনতন্ত্রের সৃষ্ট প্রেসিডেন্টও যে থাকেন না, এটাও কি ওঁরা বুঝেন নাই? না বুঝার কথা নয়। কাজেই কোথাও কোনও মারপ্যাঁচ আছে। যত মারপ্যাঁচই থাকুক, কোমরে যার জোর আছে, অর্থাৎ দেশরক্ষা বাহিনী যাঁর পক্ষে তাঁরই জয় হইবে, এটা বুঝা গেল। কিন্তু কেন কি উদ্দেশ্যে এই বিপ্লবের তছনছ করা হইল, বোঝা গেল না। রাজাহীন প্রজাতন্ত্র শাসনতন্ত্র বাতিল করার উদ্দেশ্য কি হইতে পারে?
অন্য কিছু চিন্তা করিবার ছিল না বলিয়াই এইসব সুস্পষ্ট নিরর্থক চিন্তা করিতেছিলাম। আর ভাবিবই কি ছাই। কোনই কূল-কিনারা করিতে পারিলাম না। কার সাথেই বা কথা বলিব? প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান করাচিতে। পার্টির সেক্রেটারি মুজিবুর রহমানও সেখানে। লিডার সুহরাওয়ার্দীও করাচিতেই থাকেন। কেউ নাই ঢাকায়। দলের মন্ত্রীদের কারো কারো খোঁজ করিলাম। না, কেউ বাসায় নাই। গবর্নর জনাব সুলতানুদ্দিন আহমদ অন্তরংগ বন্ধু-মানুষ। তাঁকে টেলিফোন করিতে হাত উঠাইলাম। দ্বিতীয় চিন্তায় বাদ দিলাম। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী কয়েকদিন আগে ঢাকায় আসিয়াছেন। অগত্যা তাঁকেই ধরিলাম। কথা হইল। তিনিও আমার মতই স্তম্ভিত। আর কিছু জানেন না। ইশারা-ইংগিতে বলিলেন : টেলিফোনে এ বিষয়ে আলাপ করা নিরাপদ নয়। ঠিকই ত! ছাড়িয়া দিলাম। বাসার কাছেই ‘ইত্তেফাক’ অফিস। অগত্যা সেখানে যাইব ভাবিলাম। এমন সময় গবর্নরের টেলিফোন পাইলাম। স্বয়ং তিনিই ধরিয়াছেন। বলিলেন : গাড়ি পাঠাইছি। চইলা আস। আর কিছু বলিলেন না।
গাড়ি আসিল। গবর্নমেন্ট হাউসে গেলাম। কথা হইল। তিনিও স্তম্ভিত হইয়াছে। আভাসে-ইংগিতেও কোনও আহট পান নাই। বলিলাম : কাজটা সম্পূর্ণ বে-আইনী। গবর্নর শাসনন্ত্র বজায় রাখিতে আইনতঃ ও ন্যায়তঃ বাধ্য। কাজেই তিনি এটা অগ্রাহ্য করিতে পারেন। স্বীকার করিলেন। কিন্তু এটাও তিনি বলিলেন : শাসন অনুসারেই প্রধানমন্ত্রীর উপদেশ ছাড়া তিনি কিছু করিতে পারেন না। তিনি আসলে প্রধানমন্ত্রীর রবার স্ট্যাম্প মাত্র। বুঝিলাম তাঁর কথাই ঠিক। আরেকটা খবর দিলেন। তাঁর বেগম সাহেব করাচি গিয়াছিলেন। তাঁকে প্রেসিডেন্ট হাউসে নেওয়া হইয়াছে। খানিক আগে তাঁর সাথে কথা হইয়াছে। ব্যাপার-স্যাপার সুবিধার নয়। সাবেক আইজি মিঃ যাকির হোসেনকে যরুরী খবরে করাচি নেওয়া হইয়াছে। সুলতানুদ্দিনের দৃঢ় সন্দেহ তাঁর বদলে মিঃ যাকির হোসেনকেই গবর্নর করা হইতেছে। দেখা গেল, আমরা দুইজনই সমান নিরুপায়। উভয়ের মন খারাপ। আলাপ জমিল নাবাসায় ফিরিয়া আসিলাম। যাইতে-আসিতে দেখিলাম সারা শহর থমথমা।
বাড়ির সবাই স্তম্ভিত, বিষণ্ণ। কারও মুখে কথা নাই। কাজেই নির্বিবাদে নির্বিঘ্নে সবাই চিন্তা করিতে লাগিলাম। পরপর কয়েকটা ঘটনা মনে পড়িয়া গেল। একটা মাত্র তিন-চারদিন আগের ঘটনা। বাসায় একটা প্রেস-কনফারেন্স ডাকিয়াছিলাম। প্রায় জন পঁচিশেক সাংবাদিক সমবেত হইয়াছিলেন। আসন্ন নির্বাচনে শান্তি-শৃংখলার সংগে দেশের এই সর্বপ্রথম জাতীয় নির্বাচন সমাধায় সাংবাদিকরা কিরূপে সাহায্য করিতে পারেন, তা বলার জন্যই এই প্রস-কনফারেন্স। আমি নিজে ত্রিশ বছরের সাংবাদিক। রাজনীতিক কর্মী হিসাবে বহু নির্বাচন করার অভিজ্ঞতাও আমার আছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হইতে তাঁদেরে দেখাইলাম ও সাংবাদিক ইচ্ছা করিলে শান্তি শৃংখলার সাথে নির্বাচন সমাধাও করিতে পারেন। আবার ইচ্ছা করিলে মারাত্মক অশান্তিও সৃষ্টি করিতে পারেন। সাংবাদিকরা সকলে আমার সাথে একমত হইলেন। যাঁর-তাঁর দলীয়-আস্থা-নির্বিশেষে তাঁরা নিরপেক্ষভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে তাঁদের কর্তব্য করিবেন, এই আশ্বাস দিয়া সন্ধ্যার অনেক পরে তাঁরা বিদায় হইলেন।
সাংবাদিকরা চলিয়া যাওয়ার পরও তিন-চারজন লোক থাকিলেন। এরা একেবারে পিছনের কাতারে ছিলেন বলিয়া তাঁদের দিকে এতক্ষণ বিশেষ লক্ষ্য করি নাই। এক-আধবার ওদিকে ন্যর দিয়াই বুঝিয়াছিলাম, ওঁরা আমার রোজকার মজলিসী বন্ধু। কিন্তু সাংবাদিকরা চলিয়া যাইবার পর দেখিলাম ওঁদের মধ্যে একজন আমার বন্ধু হইলেও রোজকার মজলিসী দরবারী লোক নন। তিনি আমার ল্যান্ডলর্ড মিঃ ই. এ. চৌধুরী। তিনিও মাঝে মাঝে আসেন। আমাকে বড়ভাই মানেন। আমিও তাঁকে ছোট-ভাই মানি। কিন্তু আমার দরবারী তিনি নন। কাজেই তাঁকে দেখিয়া অবাক হইলাম। বাড়িভাড়ার তাগাদায় আসেন নাই ত? হাসিয়া বলিলাম চৌধুরী, কবে থনে সাংবাদিক হৈলা? তিনি খুবই রসিক যুবক। আমার রসিকতার রস গ্রহণ করিয়া হাসিলেন। বলিলেন : কিন্তু ভাইসাব আমি ভাবতাছি, আপনে এই বৃথা পরিশ্রম ও অর্থ-ব্যয়টা করলেন কেন? আমি বিষয়ে বলিলাম: কোনটারে তুমি বৃথা পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয় কইতেছ? চৌধুরী সাহেব গম্ভীর হইয়া পাল্টা প্রশ্ন করিলেন। ‘আপনে কি সত্যই বিশ্বাস করেন ইলেকশন হবে? আমি আরও বিশিত হইয়া বলিলাম : বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন কোথায়? ইলেকশনের দিন-তারিখ ত ঠিক য়াৈই গেছে।
