১২. লজ্জাস্কর ঘটনা
যা হোক মন্ত্রিসভা গঠন করিয়াই আইন পরিষদের বৈঠক ডাকিতে হইল। স্পিকার আবদুল হাকিম সাহেবের প্রতি আমাদের পার্টি-নেতাদের আস্থা ছিল না। তাঁর উপর একটা অনাস্থা-প্রস্তাবও দেওয়া হইয়াছিল। সে প্রস্তাব বিবেচনার সুবিধার জন্য নিজে হইতে ডিপুটি-স্পিকারের উপর ভর দিয়া সরিয়া বসা তাঁর উচিৎ ছিল। তিনি তা না করিয়া নিজেই সে প্রস্তাব বাতিল করিয়া দিলেন। এই ভাবে স্পিকারের সাথে প্রত্যক্ষ সংঘাত লাগায় মুজিবুর রহমান আমাকে বলিলেন : ডিপুটি-স্পিকারকে শক্ত করিয়া আমাদের পক্ষ করিতে হইবে। ডিপুটি-স্পিকার শাহেদ আলী আমার ক্লাস ফ্রেণ্ড ও হোস্টেল-মেট। আমরা উভয়ে অনার্স দর্শনের ছাত্র বলিয়া আমাদের হৃদ্যতাও ছিল আর সকলের চেয়ে গভীর। তিনি ইতিপূর্বেও হাউসে প্রিয়াইড করিয়াছেন এবং আমাদের পক্ষেই রুলিং দিয়াছেন। কিন্তু স্পিকার ছিলেন তখন বিদেশে। এখন স্পিকার দেশে হাযির। তাঁর সাথে আমাদের পার্টির সংঘাত। এই অবস্থায়ই তাঁকে বুঝাইয়া একটু মযবুত করিয়া দিতে মুজিবুর রহমান আমাকে ধরিলেন। আমি ডিপুটি স্পিকারের বাড়ি গেলাম। অনেক কথা হইল। তিনি মযবুত হইলেন।
ডিপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে হাউস শুরু হইল। হাউস শুরু হইল মানে অপযিশন দলের হট্টগোল শুরু হইল। শুধু মৌখিক নয়, কায়িক। শুধু খালি-হাতে কায়িক নয়, সশস্ত্র কায়িক। পেপার ওয়েট, মাইকের মাথা, মাইকের ডান্ডা, চেয়ারের পায়া-হাতল ডিপুটি-স্পিকারের দিকে মারা হইতে লাগিল। শান্তিভংগের আশংকা করিয়া সরকার পক্ষ আগেই প্রচুর দেহরক্ষীর ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। তাঁরা হাতে চেয়ারে ডিপুটি স্পিকারকে অস্ত্র-বৃষ্টির ঝাঁপটা হইতে রক্ষা করিতে লাগিলেন। অপযিশনের কেউ-কেউ মঞ্চের দিকে ছুটিলেন। তাঁদের বাধা দিতে আমাদের পক্ষেরও স্বাস্থ্যবান শক্তিশালী দু-চারজন আগ বাড়িলেন। আমার পা ভাংগা ছিল। তাই না যোগ দিতে পারিলাম মারামারিতে, না পারিলাম সাবধানীদের মত হাউসের বাহিরে চলিয়া যাইতে। নিজ জায়গায় অটল-অচল বসিয়া বসিয়া-সিনেমায় ফ্রি স্টাইল বক্সিং বা স্টেডিয়ামে ফাউল ফুটবল দেখার মত এই মারাত্মক খেলা দেখিতে লাগিলাম। খেলোয়াড়দের চেয়ে দর্শকরা খেলা অনেক ভাল দেখে ও বুঝে। আমি তাই দেখিতে ও বুঝিতে লাগিলাম।
যা দেখলাম, তাতে ভদ্রের ইতরতায় যেমন ব্যথিত হইলাম; বুদ্ধিমানের মুখতায় তেমনি চিন্তিত হইলাম। গণপ্রতিনিধিরা বক্তৃতা ও ভোটের দ্বারা দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করিবার দায়িত্ব লইয়াই আইনসভায় আসিয়াছেন। গুন্ডামি করিয়া কাজ হাসিল করিতে আসেন নাই, ভাল কাজ হইলেও না। শিক্ষিত ভদ্র ও সমাজের নেতৃস্থানীয় বয়স্ক লোকেরাও কেমন করিয়া ইতরের মত গুন্ডামি করিতে পারেন, চেনা-জানা সুপরিচিত, সমান শিক্ষিত ভদ্র সহকর্মী ডিপুটি স্পিকারের উপর সমবেতভাবে মারাত্মক অস্ত্রের শিলাবৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে পারেন, তা দেখিয়া আমার সারা দেহমন ও মস্তিষ্ক বরফের মত জমিয়া গিয়াছিল। সে বরফেরও যেন উত্তাপ ছিল। আমারও রাগ হইয়াছিল। সে অবস্থায় আমার হাতে রিভলভার থাকিলে আমি নিজের আসনে বসিয়া আক্রমণকারীদের গুলি করিয়া মারতে পারিতাম। ওঁরা সবাই আমার সহকর্মী শিক্ষিত ভদ্রলোক। অনেকেই অন্তরংগ বন্ধু। তবু তাঁদের গুলি করিয়া মারিতে আমার হাত কাঁপিত না। নিছক অক্ষমতার দরুন অর্থাৎ রিভলভারের অভাবে তা করিতে পারি নাই। করিতে পারিলে আমিও ওঁদেরেই মত গুন্ডা আখ্যা লাভের যোগ্য হইতাম। বেশকম শুধু হইত ওঁদের হাতে মাইকের মাথা, পেপার ওয়েট আমার হাতে রিভলভার। বুঝিলাম ওঁদেরও মনে আমারই মত রাগ ছিল। সে রাগের কারণ ডিপুটি স্পিকার অন্যায়ভাবে সরকার পক্ষকে সমর্থন করিতেছিলেন। ডিপুটি-স্পিকারকে হত্যা করিবার ইচ্ছা অপযিশন মেম্বরদের কারও ছিল না নিশ্চয়ই। এমনকি, অমন অসভ্য গুন্ডামিতে যাঁরা অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন, তাঁদের সকলে জানিয়া-বুঝিয়া ইচ্ছা করিয়া ঐ আক্রমণ করেন নাই। আমি নিরপেক্ষ দর্শকের দৃষ্টি দিয়াই দেখিয়াছি, হামলাকারীদের অনেকেই স্পন্টেনিয়াসলি, নিজের অজ্ঞাতসারেই, যেখন শুধু দেখাদেখি পাটকেল নিক্ষেপ করিতেছেন। এটা যেন হাটের মার। সবাই মারিতেছে, আমিও একটা মারি, ভাবটা যেন এই। কিন্তু ফল কি হইতেছিল? দেহরক্ষীরা চেয়ারের উপর চেয়ার খাড়া করিয়া ডিপুটি স্পিকারের সামনে প্রাচির তুলিয়া ফেলিয়াছিলেন। সে প্রাচিরটা ভেদ করিয়া হামলাকারীদের পাটকেল ডিপুটি স্পিকারের মাথায় নাকে মুখে লাগিতেছিল। শাহেদ আলী কোনও বীর বা ডন-কুস্তিগির পাহলওয়ান ছিলেন না। সাদাসিধা শান্ত-নিরীহ ছোট কদের একটি অহিংস ভাল মানুষ ছিলেন তিনি। দর্শনের ছাত্র না শুধু। চলনে-আচরণেও ছিলেন দার্শনিক। ওকালতি বা রাজনীতির চেয়ে স্কুল-কলেজের মাস্টারি করাই তাঁকে বেশি মানাইত। এমন লোকের উপর অমন হামলা। দেহরক্ষীরা চেয়ারের পাহাড় না তুলিলে তিনি ঐ মঞ্চের উপরই মরিয়া একদম চ্যাপ্টা হইয়া যাইতেন। পরের দিন হাসপাতালে তিনি সত্য-সত্যই মারা যান। এই হত্যাকাণ্ডের আদালতী বিচার হয় নাই। ভালই হইয়াছে। বিচার হইলে অনেক মিয়ারই শাস্তি হইত। দেশের মুখ কালা হইত। কিন্তু আদালতী বিচার না হইয়া গায়েবী বিচার হইয়াছে। তাতে দেশের মুখ কালা হইল কিনা পরে বুঝা যাইবে; কিন্তু দেশের অন্তর যে কালা হইয়াছে সেটা সংগে সংগেই বোঝ গিয়াছে। ঐ ঘটনার পনর দিনের মধ্যেই মার্শাল ল। শাহেদ আলীর অপমৃত্যুকে মার্শাল ল প্রবর্তনের অন্যতম কারণ বলা হইল। অর্থাৎ পরের ঘটনার জন্যই আগেরটা ঘটিয়াছিল বা ঘটান হইয়াছিল। আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভাকে সমর্থন করিতে গিয়া শাহেদ আলী নিহত হইলেন অপযিশনের টিল-পাটকেলে। অথচ পূর্ব বাংলার দুশমনরা তখনও বলিলেন এবং আজও বলেন : আওয়ামী লীগই শাহেদ আলীকে হত্যা করিয়াছে। কোন্ পাপে এ মিথ্যা তহমত। দুর্ভাগ্য একা আসে না। তার মানে, দুর্ভাগ্যের কারণ বা কর্তা যাঁরা তাঁদের যেন শনিতে পাইয়া বসে। শনিতে ধরে উভয় পক্ষকেই। কারণ দুর্ভাগ্যের মধ্যেও এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষ দেয়। ঢাকায় এই কেলেংকারিতেও আমাদের পাপের ভরা পূর্ণ হইল না। করাচিতেও দরকার হইল যত নষ্টের গোড়া মির্যার আর এক চাল। সরল সোজা আয়েশী প্রধানমন্ত্রী ফিরোয নুনকে দিয়া বলাইলেন : আওয়ামীদের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ঢুকিতে হইবে। মন্ত্রিসভার দায়িত্ব বহন করিতে হইবে। বাহির হইতে সমর্থন দিয়া ফপরদালালি টন্ কামারি করিতে দেওয়া হইবে না। এসব কথায় আওয়ামী লীগ নেতাদের কান না দেওয়া উচিৎ ছিল। আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় না যাওয়ার অনেক কারণ ছিল। তার মধ্যে প্রধান কারণ আওয়ামী লীগ মন্ত্রিত্বে অংশ না নিয়াই নূন-মন্ত্রিসভার সমর্থন দিবে এই চুক্তি হইয়াছিল। এই ত্যাগের বদলা যুক্ত-নির্বাচন প্রথায় আগামী সনের ১৫ই ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হইয়াছে। নির্বাচনের আগে আইন-পরিষদের আর কোনও অধিবেশন হওয়ার দরকার নাই। নূন-মন্ত্রিসভা বিনাবাধায় মন্ত্রিত্ব চালাইয়া যাইতেছেন। তবু আওয়ামী লীগকে মন্ত্রিসভায় যাচিয়া জায়গা দেওয়ার প্রস্তাবকে স্বভাবতঃই সন্দেহের চোখে দেখা উচিৎ ছিল এবং খুব ভাবিয়া-চিন্তিয়া কাজ করা কর্তব্য ছিল। আওয়ামী লীগকে লইয়া খেলা করিবার জন্যই যে মির্যা এই প্রস্তাব দেওয়াইয়াছেন, এটা ছিল সুস্পষ্ট। করাচির খবরের কাগযগুলি গোড়া হইতেই বলা শুরু করিল আওয়ামী লীগের মন্ত্রী নেওয়া হইবে বটে, কিন্তু সহরাওয়ার্দী ও আবুল মনসুরকে নেওয়া হইবে না। এই ধরনের ‘সংবাদ’ ছাপিয়া মির্যর দল গোড়া হইতেই লিডার ও আমাকে বেকায়দায় ফেলিলেন। এ অবস্থায় আমাদের মুখ দিয়া মন্ত্রিত্বে না। যাওয়ার কথাটা কেমন অশোভন দেখায় না। বন্ধুরা ভাবিবেন আমরা নিজেরা যাইতে পারিব না বলিয়াই বুঝি বিরোধিতা করিতেছি। এ রিস্ক নিয়াও বাধা দিলাম। আতাউর রহমান, মানিক মিয়া ও আমি বিরোধিতা করিলাম। যতদূর জানি লিডারও এ সময়ে মন্ত্রিত্বে যাওয়ার বিরোধী ছিলেন। এটা যে মির্যার একটা চাল, এ কথায় মুজিবুর রহমানও আমার সাথে একমত ছিলেন। কিন্তু কেন জানি না, কার বুদ্ধিতে বুঝি নাই, মুজিবুর রহমান আমাদের কাউকে না জানাইয়া কয়েকজন হবু মন্ত্রী লইয়া হঠাৎ করাচি চলিয়া গেলেন। মন্ত্রিত্বের শপথ নিলেন। ভাল পোর্টফলিও পাওয়া গেল না বলিয়া চার-পাঁচ দিন পরে পদত্যাগ করিলেন। সেই রাত্রেই মার্শাল ল। কি চমৎকার প্ল্যান্ড ওয়েতে সব কাজ করা হইয়াছিল। প্ল্যানটা ছিল সুস্পষ্ট। স্বার্থান্ধ ছাড়া আর সবাই বুঝিয়াছিলেন। লিডারও বুঝিয়াছিলেন। কিন্তু সেই দুর্বলতার জন্য তিনি এবারেও দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলিতে পারেন নাই। ১৯৪৮ সালের আগস্টে, ১৯৫৪ সালের এপ্রিল ও অক্টোবরে লিডারের যে সামান্য দুর্বলতায় দেশ ও আওয়ামী লীগ চরম বিপদের সম্মুখীন হইয়াছিল, ১৯৫৮ সালের অক্টোবরেও সেই একই দুর্বলতা আমাদের কাল হইল।
২৯. ঝড়ে তছনছ
ঝড়ে তছনছ
উনত্রিশা অধ্যায়
