১০. বিরোধের পরিণাম
সেক্রেটারি শেখ মুজিবুর রহমানকে টেলিফোনে ধরিলাম। রাতে আসিতে বলিলাম। তিনি আসিলেন। হাসিমুখে তাঁর প্রতি চরম রাগ দেখাইলাম। তীর উপর অসাধু উদ্দেশ্য আরোপ করিলাম। এক ঢিলে দুই পাখি মারিবার চমৎকার ব্যবস্থা করিয়াছ, ভাই। তিতা সুরে হাসিমুখে বলিলাম। তিনি অবাক হইলেন। অবাক হইবার ভংগ করিও না। আমি বলিলাম।আতাউর রহমানকে বেইযযত করিয়া তাড়াইয়া আমাকে সেখানে পাঁচ মাসের জন্য বসাইয়া অযোগ্য প্রমাণ করিয়া নির্বাচনের পরে নিজে প্রধানমন্ত্রী হইবার বেশ আয়োজনটা করিয়াছ। আমি কঠোর বিদ্রুপাত্মক ভাষায় বলিলাম। তিনি বিষম ক্রুদ্ধ হইলেন। বলিলেন : মুরুব্বি মানি বলিয়া যা-তা বলিবেন না। শ্রদ্ধা রাখিতে পারিব না। তর্ক করিলাম। যার-তার যুক্তি দিলাম। রাগারাগি সাটা-সাটি করিলাম। এক স্তরে আমার উপর রাগ করিয়া তিনি উঠিয়া পড়িলেন। জোর করিয়া বসাইলাম। যতই রাগ করুন, শেষ পর্যন্ত শান্ত হইলেন, যখন আমি পরিণামে দেশের অবস্থা ও পার্টির পরাজয়ের কথা বলিলাম। যত দোষই তাঁর থাক, তিনি দেশকে ভালবাসেন। পার্টিকেও। সুতরাং শেষ পর্যন্ত উভয়ে শান্তভাবে একমত হইলাম। যেকোনও ত্যাগ স্বীকারের দ্বারা আমাদের দলীয় ঐক্য বজায় রাখিতে এবং আতাউর রহমান-মন্ত্রিসতাকে পদে বহাল রাখিতে হইবে। ইতিমধ্যে দুই-তিনবার মন্ত্রিসভার ওলট-পালট হইয়াছে। আমাদের মন্ত্রিসভা কায়েম করিবার জন্য হক সাহেবকে গবর্নরের পদ হইতে সরাইয়া বুড়া বয়সে তাঁকে অপমান করিতে হইয়াছে। বন্ধুবর সুলতান : উদ্দিন আহমদকে হক সাহেবের স্থলে গবর্নর করিয়া আনিতে হইয়াছে। বামপন্থী আদর্শবাদী ন্যাপ-পার্টি তিন-তিনবার পক্ষ পরিবর্তন করিয়াছে। এর কোনটাই আমাদের জন্য প্রশংসার কথা নয়। এসব ব্যাপারেই মুজিবুর রহমান ও আমি একমত হইলাম। আমার কোনও সন্দেহ থাকিল না যে মুজিবুর রহমান সত্যই অন্ততঃ আগামী নির্বাচন পর্যন্ত আতাউর রহমান মন্ত্রিসভার স্থায়িত্ব কামনা করেন। আমি লিডার ও আতাউর রহমানকে আমার মত জানাইলাম।
ইতিমধ্যে ১৯৩ ধারা জারি হইয়াছিল। লিডারের চেষ্টায় আগস্ট মাসের শেষ দিকে আতাউর রহমানকে মন্ত্রিসভা গঠনের কমিশন দেওয়া হইল। নয়া মন্ত্রিসভা গঠিত হইল বটে, কিন্তু আতাউর রহমান আমাকে জানাইলেন, মন্ত্রী নিয়োগে তীর মত টিকে নাই। লিডারই মন্ত্রীদের তালিকা, এমন কি তাঁদের দফতর বন্টন পর্যন্ত সবই, করিয়াছেন। তিনি অভিযোগ করিলেন, লিডার মুজিবুর রহমানের পরামর্শ মতই এসব করিতেছে। এই দুঃখে তিনি একবার প্রধানমন্ত্রিত্বের এই বোঝা বহিতে অস্বীকার করিতে চাহিলেন। আমি তাঁকে অনেক অনুরোধ করিয়া ‘বিদ্রোহ’ হইতে বিরত করিলাম। কিন্তু আতাউর রহমান শান্ত হইলে কি হইবে, মিঃ কফিলুদ্দিন চৌধুরী ক্ষেপিয়া গেলেন। তিনি আমার বাসায় আসিয়া পদত্যাগের হুমকি দিলেন। আগে রেভিনিউ, সি.এণ্ড বি. ও লেজিসলেটিত তিন-তিনটা দফতর ছিল তাঁর। তাঁকে না জানাইয়াসি, এন্ড বি, দফতর কাটিয়া নিয়া নয়া মন্ত্রী মিঃ আবদুল খালেককে দেওয়া হইয়াছে। প্রসংগতঃ উল্লেখযোগ্য যে মিঃ আবদুল খালেক আমার বিশেষ স্নেহ-ভাজন ছোট ভাই। তিনি যোগ্যতার সাথে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব করিয়াছেন। আমরা যারা এক সময় কেন্দ্রে মন্ত্রিত্ব করিয়াছি, তাঁদের কারও পক্ষেই আর প্রাদেশিক মন্ত্রী হওয়া উচিত নয়। একথা আমি নীতি হিসাবে লিডারের কাছে এবং পার্টি-বৈঠকে বলিয়াছি। তবু খালেক সাহেবকে একহ্মপ জোর করিয়া এই নয়া মন্ত্রিসভায় নেওয়া হইয়াছে এবং তাঁকেই সি, এন্ড বি, দফতর দেওয়া হইয়াছে। মিঃ কফিলুদ্দিনের অভিযোগ, এটা মুজিবুর রহমানের কাজ। তিনি অপমানিত হইয়াছেন। কাজেই আর মন্ত্রিত্ব করিবেন না। কফিলুদিন বয়সে আর সবার বড় হইলেও আমার ছোট। কাজেই তাকে ধমকাইলাম। বেগাৰ্তা করিলাম। হাতে ধরিলাম। বলা যায় পায়েও ধরিলাম। কারণ বড় ভাই ছোট ভাই-এর হাত ধরাকেই পা ধরা বলা যায়। অবশেষে কফিলুদ্দিন শান্ত হইলেন।
১১. লিডারের ভুল
কিন্তু আমার মন শান্ত হইল না। মাত্র পাঁচমাস বাকী ইলেকশনের। এ সময়ে শ্রদের রদ-বদলের কোনও দরকারই ছিল না। তার উপর প্রধানমন্ত্রীর অমতে এটা করা আরও অন্যায় হইয়াছে। এটা আমাদের পার্টির দুর্ভাগ্যের লক্ষণ; পতনেরও পূর্বাভাস। আমার আশংকার কথা লিডারকে বলিলাম। তিনি ভুল বুঝিলেন। ভাবিলেন, আতাউর রহমানের কথামত আমি লিডারকে এসব কথা বলিতেছি। লিডারের এক শ’ একটা গুণের মধ্যে এই একটা সাংঘাতিক দোষ। তাঁর মত ডেমোক্র্যাটও খুব কম নেতাই আছে। আবার তাঁর মত ডিক্টেটরও খুব কম দেখিয়াছি। তাঁর চরিত্রের অন্তর্নিহিত এই বৈপরীত্য লক্ষ্য করিয়াই আমি লিডারকে কথায়-কথায় বলিতাম। ইউ আর এ ডিক্টেটর টু এস্টাব্লিশ ডেমোক্র্যাসি। তিনি অনেক সময় হাসিতেন। কিন্তু দুই-একবার গম্ভীরও হইয়া পড়িতেন। তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ও অসংখ্য গুণের জন্য আওয়ামী লীগ উপকৃত হইয়াছে যেমন, তাঁর দুই-একটা দোষের জন্য তেমনি আওয়ামী লীগের এবং পরিণামে দেশের ক্ষতিও হইয়াছে অপরিসীম। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, ১৯৫৪ সালের ডিসেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সম্প্রসারিত সভার সর্বসম্মত অভিমতের বিরুদ্ধে তিনি মোহাম্মদ আলী বগুড়ার কেবিনেটে মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিলেন। মন্ত্রিত্ব গ্রহণের পর এক সাংবাদিকের ঐ প্রকার প্রশ্নের জবাবে বলিলেন : আওয়ামী লীগ আবার কি? আমিই আওয়ামী লীগ। সাংবাদিক আবার প্রশ্ন করিলেন? এটা কি আওয়ামী লীগের মেনিফেষ্টা-বিরোধী না? জবাবে লিডার বলিলেন : আমিই আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টো এই ঘটনার পরে লিডারের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাতেই দুঃখ করিয়া বলিলাম : কার্যতঃ আপনিই আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের ‘মেনিফেস্টো’ এটা ঠিক, কিন্তু প্রকাশ্যে ও-কথা বলিতে নাই। তাতে আওয়ামী লীগের মর্যাদা ও বাড়েই না, আপনারও না। জিন্না সাহেব মুসলিম লীগের ডিক্টেটর-নেতা ছিলেন। কিন্তু কোনও দিন তা মুখে বলেন নাই। বরং কংগ্রেস ও বড়লাটের সহিত আলোচনা করিতে গিয়া সব সময়েই বলিতেন : ওয়ার্কিং-কমিটির সাথে পরামর্শ না করিয়া আমি কিছু বলিতে পারিব না। লিডার নিজের ভুল স্বীকার করিয়া আফসোস করিয়াছিলেন। কিন্তু অনিষ্টটা তখন হইয়া গিয়াছে। অতীতের ভুলের অভিজ্ঞতায় তিনি ভবিষ্যতে ভুল করিতে বিরত হইতেন না। একই ধরনে একই কারণে তিনি পুনঃ পুনঃ একই রকম ভূল করিতেন। ১৯৫৭ সালের আগস্ট মাসে কৃষক-শ্রমিক পার্টির মেজরিটির সাথে গবর্নর হক সাহেবের সমর্থন দেওয়ায় আওয়ামী লীগের একটা বোঝাপাড়া হয়। এই বোঝাঁপড়ায় কে, এস, পিনোন্না মিয়া-মোহন মিয়া গ্রুপ সুহরাওয়ার্দী-নেতৃত্ব মানিয়া নেন। লিডার নিজেই সে বোঝাঁপড়া অনুমোদন করেন। তারপর হঠাৎ বিনা-কারণে এই বোঝাঁপড়া ভাংগিয়া দেন। বুঝা গেল মুজিবুর রহমানের পরামর্শেই তিনি এটা করিলেন। তাতে লিডার শুধু নিজেকেই ছোট করিলেন না। আওয়ামী লীগ, আওয়ামী মন্ত্রিসভা ও পূর্ব-পাকিস্তানের ভবিষ্যৎও বিপন্ন করিলেন। আমার বিবেচনায় এটা ছিল বিশাল ব্যক্তিত্বশালী লিডারের নিতান্ত শিশু সুলভ দুর্বলতার দিক। ১৯৫৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইস্কান্দর মির্যার কথায় আমাদের সর্বসম্মত অনুরোধ ঠেলিয়া ‘এক ইউনিট’ ব্যাপারে রিপাবলিকান পার্টির সহিত শত্রুতা রু করিয়াছিলেন। ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই সুহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার পতন হয়। বেশ কিছুদিন পরে বড় দেরিতে তিনি মির্যার ষড়যন্ত্র ধরিতে পারিয়াছিলেন। ১৯৪৭ সালে পূর্ব-বাংলার লিডার ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের সময় হইতে আরম্ভ করিয়া এই দশ-এগার বছর লিডারকে একই রকম শিশু-সুলত ভুল করিতে দেখিয়া আমার বড় দুঃখ হইত। অত দুঃখেও আমি রসিকতা করিয়া একদিন বলিয়াছিলাম স্যার, খোদাকে অসংখ্য ধন্যবাধ, আপনার বিবি নাই। তিনি বিস্মিত হইয়া বলিলেন : কেন? আমি বলিলাম : থাকিলে অনেকবার আপনার বিবি তালাক হইয়া যাইত। হাদিস শরিফে আছেঃ একই রকমে কোনও মুসলমান তিনবার ঠকিলে তার বিবি তালাক হইয়া যায়। হাদিসটা সহি কি যইফ জানি না। তবে তাতে মূল্যবান উপদেশ ও প্রচুর অন্ন রস আছে। তা লিডার আগে ছাত-ফাটা অট্টহাসি করিলেন। পরে গম্ভীর হইয়া বলিলেন ‘জীবনে শুধু জিতিলেই চলে না, হারিতেও হয়। জান, মহত্বের জয়ের চেয়ে হারই বেশি।‘
