অবশ্য আমার মত অতটা বিদঘুঁটে ছিল না। তবু সুবিচারী র্যাশনালিস্ট হিসাবে আমার। সুনাম রক্ষার জন্য ঐ বদনাম বহনের মত স্যাক্রিফাইসটুকু করিতাম। ফলে বুদ্ধিমান গোঁড়ারা আমাকে র্যামনালিস্ট না বলিয়া এম্বিভ্যালেন্ট (মতহীন লোক) বলিতেন গোঁড়ামির বদনামের চেয়ে এই বদনামটাকে আমি অধিক সম্মানজনক মনে করিতাম।
লিডার কিন্তু আমার নিরপেক্ষতায় খুশি হইলেন কিন্তু। হাসিয়া বলিলেন : বিবদমান দুই পক্ষেরই দুশমন হওয়ার এমন সোজা রাস্তা আর নাই। কিন্তু আমি এদেরে লইয়া করি কি? আমি সহজ উত্তর দিলাম : নির্বাচন পর্যন্ত স্টেটাস কোও, যেমন আছে তেমনি, বজায় থাক।
৯. লিডারের দুশ্চিন্তা
লিডারের দুশ্চিন্তা দূর হইল না। তিনি তখন সেন্ট্রাল সার্কিট হাউসে থাকিতেন। একদিন খুব সকালে টেলিফোনে ডাকিলেন। গিয়া দেখিলাম, আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় আরও অনেকেই আসিয়াছেন। কিন্তু সবার সাথে লিডার এক সাথে দেখা করিবেন না। পৃথক-পৃথক দেখা করিবেন। আমাকেই বোধ হয় প্রথম ডাকিলেন একদম মেটার-অব-ফ্যাক্ট বিষয়ী আলাপ। প্রধানমন্ত্রী ও সেক্রেটারির বিরোধের ফলে পার্টি ও প্রতিষ্ঠানের দ্বিধাবিভক্তি, বিভিন্ন জিলায় তার প্রতিক্রিয়া (লিডারও এই সময় জিলায়-জিলায় সফর করিতেছিলেন, তাঁর ফলে মন্ত্রিসভার সংকটজনক অবস্থা, আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে (১৯৫৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন ঠিক হইয়া গিয়াছে) আমাদের আভ্যন্তরীণ বিভেদের কুফল ইত্যাদি সংক্ষেপে অথচ দক্ষতার সংগে আমাকে বুঝাইয়া দিলেন। সবই ঠিক। সুতরাং মতভেদের ফাঁক নাই। লিভারের সংগে একমত হইলাম। তিনি শুইয়াছিলেন। এইবার উঠিয়া বসিলেন। বলিলেন : আমি চিন্তা করিয়া ঠিক করিয়াছি তোমাকেই প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব নিতে হইবে। আতাউর রহমানের দ্বারা আর চলিতেছেনা।আমি তাজ্জব হইলাম। তলে-তলে অবস্থা এতটা খারাপ হইয়াছে? এই পরামর্শ লিডারকে কে দিয়াছে। আমি মনে-মনে খুবই গরম হইলাম। কিন্তু বাহিরে শান্ত থাকিয়া লিডারের সংগে তর্ক জুড়িলাম। আধ ঘন্টা চল্লিশ মিনিটের মত তর্ক করিয়া লিডারকে বুঝাইবার চেষ্টা করিলাম : (১) নির্বাচনের মাত্র পাঁচ মাস আগে প্রধানমন্ত্রী বদলাইয়া লাভের চেয়ে লোকসান হইবে বেশি; (২) নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব নিতে ব্যক্তিগতভাবে আমার ঘোরতর আপত্তি আছে; (৩) আতাউর রহমানের উপর বেশির ভাগ দলীয় সদস্যের আস্থা নষ্ট হইয়াছে, কথাটা মোটেই সত্য নয়। প্রথম দফার পক্ষে যুক্তি দিলামঃ আতাউর রহমান-বিরোধী এই অভিযান দলাদলির ফল। এই উপদলীয় কোন্দলে লিডারের সারেন্ডার করা উচিত নয়। তার বদলে নির্বাচনের পরে যাকে খুশি প্রধানমন্ত্রী করিও এই কথা বলিয়া সব থামাইয়া দেওয়া লিডারের উচিৎ। যদি তিনি তা না করেন তবে উপদলীয় কোন্দল আরও বাড়িবে; আতাউর রহমানের সমর্থকরা এই অপমান শুইয়া গ্রহণ করিবেন না। নূতন আকারে উপদলীয় কলহ দেখা দিবে। দ্বিতীয় দফার পক্ষে আমার যুক্তিটা ছিল নিতান্ত ব্যক্তিগত। সাধারণ নির্বাচনের মাত্র পাঁচ মাস আগে প্রধানমন্ত্রিত্ব আমার কাঁধে ফেলিলে আমার রাজনৈতিক মৃত্যু ঘটিবে। আতাউর রহমান তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বে যত ভাল কাজ করিয়াছেন, তাঁর প্রশংসাটুকু থাকিবে তাঁরই। আর তিনি যদি কোন খারাপ কাজ করিয়া থাকেন, তবে, তার নিন্দাটুকু সবই আসিবে আমার ঘাড়ে। কাজেই যিনি এ সময় আমার উপর প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব চাপাইতে চান, তাঁকে আমার পরম হিতৈষী বলা চলে না। তৃতীয় দফায় আমার যুক্তি ছিল এই যে আওয়ামী লীগ দলীয় মেম্বরদের প্রায় সকলেই আতাউর রহমানের সমর্থক, এটা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা-জাত ধারণা। সুতরাং তাঁর প্রতি অধিকাংশ মেম্বরের আস্থা নাই, এ কথা সত্য নয়। লিডারকে অন্যরূপ ধারণা যাঁরা দিয়াছেন তাঁরা ভূ খবর দিয়াছেন।
লিডারের মুখে স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করিলাম। আমি সাহস পাইয়া আরও কিছু কথা বললাম। আসন্ন আইন পরিষদের বৈঠকে আমাদের স্ট্রাটেজি ও আগামী নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের কর্তব্য আলোচনা করিলাম। মনে হইল আতাউর রহমান বিরোধী মতটা তাঁর অনেকখানি নরম হইয়াছে। আমি বিদায় হইলাম।
নেতাদের যাঁরা অন্য রুমে অপেক্ষা করিতেছিলেন তাঁদের মধ্যে সবার আগে ডাক পড়িল দলের চিফ হুইপ মিঃ আবদুল জব্বার খদ্দরের। আমি তাঁর সাথে খুব জোরে মুসাফেহা করিয়া বিকালে আমার সংগে দেখা করিতে বলিলাম। তিনি লিডারের কামরায় ঢুকিলেন। সমবেত অন্যান্য বন্ধুদের জেরা এড়াইয়া দ্রুতগতিতে গিয়া নিজের গাড়িতে উঠিলাম। পথে সমস্ত ব্যাপারটা দুহরাইলাম। কলনায় একটা আন্দায় করিলাম। না, যেকোনও শক্তি দিয়া এই পতন রুখিতেই হইবে। খদ্দরকে আসিতে বলিয়াছিলাম বিকালে। তার বদলে তিনি আসিলেন তখনই। আমার বাসায় ফিরার বড়জোর এক ঘন্টা পরেই। তিনি আসিয়া লিডারের সাথে তাঁর আলাপের রিপোর্ট করিলেন। মোটামুটি প্রায় একই কথা। প্রধানমন্ত্রী বদলাইতে হইবে। ঐ প্রসংগে লিডার আমার নাম করায় তিনি আর বিকাল পর্যন্ত ধৈর্য রাখিতে পারিলেন না। তিনি মনে-মনে ধরিয়া লইয়াছিলেন, আমি রাযী হইয়াছি। তিনি আতাউর রহমান সাহেবের একজন ঘোর সমর্থক। কাজেই আমাদের সে মর্মে অনুরোধ করিতেই তাঁর আসা। আমি হাসিয়া সব কথা বলিলাম। যুক্তিও দিলাম। তিনি নিশ্চিন্ত হইয়া বাড়ি গেলেন।
