৮. বিরোধের কারণ
১৯৫৮ সালের গোড়ার দিকেই এই বিরোধ পাবলিকের আলোচনার বিষয়বস্তু হইয়া পড়ে। জুন মাসের প্রাদেশিক পরিষদ বৈঠকে আমরা সরকার পক্ষ ভোটে হরিয়া যাই। কে, এ. পির সাথে প্রায়-সমাপ্ত ব্যবস্থাটা শেষ মুহূর্তে ভাংগিয়া দেওয়ার এটাই ছিল প্রথম শাস্তি। ন্যাপের ভোটের উপর আমাদের গবর্নমেন্ট নির্ভরশীল ছিল। তারা ছিল পিছুটান। এন্টি-গ্লিং ক্লোডোর অপারেশনে প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান রাযী হওয়ায় হিন্দু সমর্থকদের অনেকেই বিরুদ্ধে গেলেন। আমাদের সংগীন অবস্থা সুস্পষ্ট হইয়া উঠিল। লিডার আমাকে গোপনে তদন্ত করিয়া রিপোর্ট দিতে বলেন : কার দোষ? কি কারণে এই বিরোধ সৃষ্টি হইয়াছে? লিডারের তখন পুরা সন্দেহ হইয়া গিয়াছে যে মুজিবুর রহমান নিজে প্রধানমন্ত্রী হইবার জন্য আতাউর রহমানের অযোগ্যতা ও অজনপ্রিয়তা প্রমাণের চেষ্টা করিতেছেন। এর মধ্যে তদন্ত করিবার কি আছে? লিডার নিজেই দুইজনকে পৃথক-পৃথকভাবে জেরা-যবানবন্দি করিলেই ত হয়। আমি তাই বলিলাম। লিডার জবাব দিলেন, তিনিও ও-ধরনের সবই করিয়াছেন। এখন আমি কি করিতে পারি তাই দেখিতে চান। আমি সাধ্যমত চেষ্টা ও ‘তদন্ত’ করিলাম। তদন্তের বিষয় ছিল উভয় বন্ধুর সাথে প্রাণ খুলিয়া দেশের মানে পূর্ব-বাংলার ভবিষ্যৎ নির্মাণে আওয়ামী লীগের ভূমিকা এবং সেই পটভূমিকায় তাঁদের উভয়ের কর্তব্য। উভয়েই খুব জোরের সংগে যে সব কথা বলিলেন তার সারমর্ম গিয়া দানা বাঁধিল দুইটি পৃথক শাসননীতিতে। আতাউর রহমান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দায়িত্ব শৃংখলাবদ্ধ দক্ষ এডমিনিস্ট্রেশন। জিলা-মহকুমা শাসকবৃন্দ হইতে আরম্ভ করিয়া সেক্রেটারিয়েট পর্যন্ত সকল অফিসার রাজনীতিক পার্টিবাযি, মেম্বরদের প্রভাব ও কর্মীদের চাপমুক্ত অবস্থায় নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি মত কাজ করুন, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা এই। দলীয় কর্মী ও মেম্বরদের হস্তক্ষেপ তিনি পসন্দ করিতেন না। পার্মানেন্ট অফিশিয়ালরা সর্বদাই রাজনীতিক প্রভাবমুক্ত থাকিবেন, অন্যথায় পার্লামেন্টারি শাসন ব্যবস্থা চলতে পারে না, এই মত তিনি দৃঢ়ভাবে পোষণ করিতেন।
পক্ষান্তরে মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠানের সেক্রেটারি। এ বিষয়ে তাঁর মত সুস্পষ্ট। প্রতিষ্ঠানকে জনপ্রিয় ও শক্তিশালী করা তাঁর দায়িত্ব। নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ করা এবং দলীয় সরকারকে দিয়া সেসব ওয়াদা পূরণ করান প্রতিষ্ঠানের নেতা হিসাবে তাঁর কর্তব্য। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে দেখা গিয়াছে, মুষ্টিমেয় ‘অফিসার ছাড়া সকলেই মুসলিম লীগ মনোভাবাপন্ন। আওয়ামী লীগ সংগঠনের উপর আগে তাঁরা শুধু যুলুমই করেন নাই, আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভায় আসাটাও তাঁরা পসন্দ করেন নাই। তাই নানাভাবে আওয়ামী মন্ত্রিসভাকে ডিসক্রেডিট করাই এদের সংঘবদ্ধ ইচ্ছা। এঁদের দিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি ও কর্মপন্থা সফল করাইতে হইলে ইহাদের উপর আওয়ামী লীগ কর্মীদের সজাগ দৃষ্টি রাখা দরকার। এই উদ্দেশ্যে জিলা ও মহকুমা অফিসারদের উপর আঞ্চলিক আওয়ামী লীগের যথেষ্ট প্রভাব থাকা আবশ্যক।
প্রতিষ্ঠানের সেক্রেটারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের এইরূপ শক্তিশালী করিতে চাহিতেছেন; পার্টির প্রধানমন্ত্রী তাতে বাধা দিতেছেন। সেক্রেটারির ন্যরে জিলা আওয়ামী লীগ বড়, প্রধানমন্ত্রীর কাছে জিলা ম্যাজিস্ট্রেট বড়। এটা আসলে শাসনান্ত্রিক প্রশ্ন নয়, শাসনতান্ত্রিকও বটে। পার্টি বড় না, মন্ত্রিসভা বড়? প্রশ্নটা কিন্তু আকারে ও এলাকায় আরও বড়। পার্টি বড় না, আইনসভা বড়। আইনতঃ নিশ্চয়ই। আইন-সভা বড়। কারণ আইনসভার সার্বভৌমত্বের, সরেইন্টি-অব-দি লেজিসলেচারের, উপরই গণতন্ত্রের বুনিয়াদ। কিন্তু ন্যায়তঃ পার্টি বড়। পার্টিতে আগে সিদ্ধান্ত হইবে; আইন-সভা সেই সিদ্ধান্তে অনুমোদনের রবার স্ট্যাম্প মারিবে মাত্র। কারণ অপযিশন দলের মেম্বাররাই শুধু সরকারী বিলের বিরুদ্ধে যাইতে পারেন, পযিশন’ দলের মেম্বররা পারেন না। পার্টি গবর্নমেন্ট চালাইতে পার্টি ডিসিপ্লিন দরকার। পার্টি ‘পযিশনে’ আসে নির্বাচনে মেজরিটি করিতে পারিলে। নির্বাচনে জয়ী হইতে গেলে নির্বাচনী ওয়াদা বা মেনিফেস্টো দেওয়া দরকার। সে মেনিফেস্টো কার্যকরী করা পার্টির নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। কাজেই সে দায়িত্ব পালনের উপায় নির্ধারণ ও আইন-রচনার কাজটা পার্টিতে স্থির হওয়া দরকার। পার্টির মেম্বররা কাজেই আইন পরিষদে দাঁড়াইয়া পার্টি-সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাইতে পারেন না। এই ভাবেই পার্টি গবর্নমেন্ট কার্যতঃ আইন-পরিষদের সভারেইনটিকে পার্টি-প্রতিষ্ঠানের সভারেইনটিতে পরিণত করেন। এটা গণতন্ত্র ও পার্টি গবর্নমেন্টের চিরন্তন অন্তর্বিরোধ, ইটার্নেল কন্ট্রাডিকশন। ইহার সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরিয়া করিয়া আসিতেছেন। কিন্তু তাঁদের সমাধানের আশায় আমরা বসিয়া থাকিতে পারিনা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও পার্টি-সেক্রেটারির বিরোধ এমন আসন্ন হইয়াছে যে এটা এখনি মিটানো দরকার। আমি লিডারকে তদনুসারে আমার মত জানাইলাম। আমার অভিমত অনুসারে ‘দোষ কার’ প্রশ্নের মীমাংসার কোনও সূত্র পাওয়া গেল না। আমার মতে উভয়ের দোষ ফিফটি-ফিফটি। আমার একটা সুনাম বা বদনাম ছাত্রজীবন হইতেই ছিল। আমি নাকি কোনও বিতন্ডায় এক পক্ষ নিতে পারিতাম না। বলিতাম : এটাও সত্য, ওটাও সত্য। সেজন্য কলিকাতায় বন্ধুমহলে, বিশেষতঃ সাংবাদিক-মহলে, আমার অপর এক নাম ছিল ‘মিঃ এটাও সত্য ওটাও সত্য। মুসলিম লীগের ত্রিশের দশকের সাম্প্রদায়িক নীতির জন্য আমি ঘোরর মুসলিম লীগ-বিরোধী ছিলাম। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব আমাকে অতিশয় ভাবাইয়া দেয়। এই সময় হইতে প্রায় তিন বছর কাল আমার রাজনীতিক চিন্তায় ভাবান্তর ঘটে। এই সময় আমি যা-যা বলিতাম, তারই নাম দিতেন বন্ধুরা : কংগ্রেসও ঠিক, মুসলিম লীগও ঠিক; জাতীয়তাও ঠিক, সাম্প্রদায়িকতাও ঠিক; পাকিস্তানও ঠিক, অখণ্ড ভারতও ঠিক।
