এই সর্বাংগীন সদাচারের মধ্যে চাঁদের কলংকের মতই ছিল আতাউর রহমান মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত বিরোধ। এই বিরোধের সবটুকুই ব্যক্তিগত ছিল না, অনেকখানিই ছিল নীতিগত। কিন্তু কতটা নীতিগত আর কতটা ব্যক্তিগত, তা নিশ্চয় করিয়া বলা এখন সম্ভব নয়, তখনও ছিল না। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয়কে নষ্ট করিয়া দেওয়ার জন্য অনেকেই দায়ী ছিলেন। কতকগুলি নীতিগত বিরোধও দায়ী ছিল। কিন্তু সবার চেয়ে বেশি ও আশু দায়ী ছিল মুজিবুর রহমানের। একগুয়েমি। ১৯৫৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তফ্রন্ট ভাংগিয়া দেওয়ার মূলেও ছিল মুজিবুর রহমানের কার্যকলাপ। মুজিবুর রহমানের নিজের কথা ছিল এই যে ঐ পাঁচমিশালী আদর্শহীন ম্যারেজ-অব-কনভিনিয়েন্স যুক্তফ্রন্ট ভাংগিয়া আওয়ামী লীগকে প্রকৃত গণ-প্রতিষ্ঠান হিসাবে বাঁচাইয়া তিনি ভালই করিয়াছেন। পক্ষান্তরে অনেকের মত, আমার নিজেরও, যুক্তফ্রন্ট ভাংগিয়া তিনি পূর্ব-বাংলার বিপুল ক্ষতি করিয়াছেন। এপক্ষে-ওপক্ষে বলিবার কথাও অনেক আছে। বলিবার অনেক লোকও আছেন। কিন্তু শেষ কথা এই যে যুক্তফ্রন্ট ভাংগা যদি দোষের হইয়া থাকে তবে সে দোষের জন্য মুজিবুর রহমানই প্রধান দায়ী। প্রায় সব দোষই তাঁর। আর ওটা যদি প্রশংসার কাজ হইয়া থাকে তবে সমস্ত প্রশংসা মুজিবুর রহমানের। তবে যুক্তফ্রন্টের বিরোধের সুযোগ লইয়া পরাজিত কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা যে পূর্ব-বাংলার উপর গবর্নরী শাসন প্রবর্তন করিয়াছিলেন, যুক্তফ্রন্ট ভাংগার ফলে যে ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে পূর্ব-বাংলার দাবি-দাওয়া গৃহীত হইতে পারে নাই, এবং সেই হইতে ১৯৫৮ সালে দেশের চরম দূর্দৈব আসা পর্যন্ত সমস্ত ঘটনাকে যে যুক্তফ্রন্ট ভাংগার বিষময় পরিণাম বলা যায়, এটা দল-মত-নির্বিশেষে প্রায় সবাই স্বীকার করিয়া থাকেন। তবু এর বিচারের জন্য ইতিহাসের রায়ের অপেক্ষা করিতে হইবে।
৭. লিডারের দূরদর্শিতা
কিন্তু ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লিডার যখন আমাকে আতাউর রহমান মুজিবুর রহমান বিরোধের কারণ নির্ণয় ও প্রতিকার নির্দেশ করিতে আদেশ করেন, তখন একমাস পরে চরম বিপদের কথা কল্পনাও করিতে পারি নাই। তথাপি মুজিবুর রহমানের কাজ-কর্ম আমার ভাল লাগিতেছিল না। তাঁর প্রতিষ্ঠান-প্রীতি আসলে নিজের প্রাধান্য-প্রীতি বলিয়া আমার সন্দেহ হইতেছিল। আমার নিজেরও এ ব্যাপারে অভিযোগ ছিল। কেন্দ্রে আমাদের মন্ত্রিত্ব যাওয়ার পরে লিডার প্রতিষ্ঠানের সংগঠনের দিকে অধিকতর মনোযোগী হইলেন। লিডারের বিপুল সংগঠনী প্রতিভা ও অমানুষিক পরিশ্রম সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের আদর্শ-উদ্দেশ্য ও সংগঠন লইয়া লিডারের সংগে আমার শুধু মতভেদ নয়, বিরোধও অনেক হইয়া গিয়াছে। মন্ত্রিত্ব যাওয়ার পরে তিনি আমাকে একদিন খুব সিরিয়াসলি বলিলেন : তুমি অন্য সব কাজ ফেলিয়া আওয়ামী লীগকে ইংলণ্ডের লেবার-পার্টির ধরনে গড়িয়া দাও। আমি প্রতিবাদ করিবার আগেই আমার পেটের কথা তিনি বুঝিয়া ফেলিলেন। বলিলেন : মানে, গড়িব আমিও, তুমি শুধু প্ল্যান দাও। আমি হাসিলাম। লিডার বুঝিলেন। আমি দায়িত্ব নিলাম। তিনি অতঃপর ইংলন্ডের লেবার পার্টির হিস্ট্রি, সংগঠন, আদর্শ ইত্যাদি বিষয়ক কয়েকখানি পুস্তক আমাকে দিলেন। আমি দায়িত্ব গ্রহণ করিয়া লিডারকে বলিলাম : এ দায়িত্ব পালন করিতে হইলে আমাকে পার্লামেন্টারি রাজনীতি হইতে মুক্তি দিতে হইবে। তিনি হাসিয়া ইংরাজীতে বলিলেন : পুলের নিকট আসিলেই তা পার হইব। আমি পার্টি সম্বন্ধে অধ্যয়ন শুরু করিলাম। এ খবর আতাউর রহমান-মুজিবুর রহমান উভয়েই রাখিতেন। কাজেই তাঁদের সংগেও আমার আলোচনা চলিল। একদিন কেন্দ্রীয় আইন-পরিষদের বৈঠকের সময় করাচিতে সমারমেন্ট হাউস নামক মেম্বরমেসে কতিপয় প্রথম কাতারের আওয়ামী নেতার সামনে আতাউর রহমান প্রস্তাব দিলেন যে আমার পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতিত্ব গ্রহণ করা উচিৎ। মওলানা ভাসানীর পদত্যাগের পর কয়েকমাস ধরিয়া ঐ পদ খালি ছিল। ভাইস-প্রেসিডেন্ট মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ স্থলবর্তী হিসাবে কাজ চালাইয়া যাইতেছিলেন। সবাই উৎসাহের সাথে আতাউর রহমানের প্রস্তাব সমর্থন করিলেন। পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুসারে প্রতিষ্ঠানের অফিসবিয়ারাররা মন্ত্রিত্ব বা অন্য কোনও সরকারী পদ গ্রহণ করিতে পারেন না। পার্লামেন্টারি রাজনীতি হইতে সরিয়া যাইবার উপায় হিসাবে এই একটা বড় সুযোগ। লিডারের দেওয়া পার্টি-সংগঠনের দায়িত্বও এতে পালন করিতে পারি। আমি আতাউর রহমানের প্রস্তাবে তাই মোটামুটি সম্মতি দিলাম।
কিন্তু কয়েকদিন পরেই আমরা করাচি থাকিতেই জানিতে পারিলাম মুজিবুর রহমান ইতিমধ্যে ঢাকা ফিরিয়া ওয়ার্কিং কমিটির এক সভায় মওলানা তর্কবাগীশকে স্থায়ী সভাপতিত্বে বহাল করিয়াছেন। আতাউর রহমান কাগমে প্রকাশিত খবরটার দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া বলিলেন : দেখলেন ভাইসাব, আপনেরে সভাপতি করায় সেক্রেটারির অসুবিধা আছে।
ঘটনাটা ছোট কিন্তু তুচ্ছ নয়। অথচ ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য খুবই এমবেরেসিং। সমালোচনা করা কঠিন; প্রতিবাদ করা আরও কঠিন। অথচ আতাউর রহমানের অভিযোগ সত্য। সত্যই মুজিবুর রহমানের মধ্যে এই দুর্বলতা ছিল যে তিনি যেটাকে পার্টি-প্রীতি মনে করিতেন সেটা ছিল আসলে তাঁর ইগইম আত্ম-প্রীতি। আত্ম-প্রীতিটা এমনি আত্মভোলা’ বিভ্রান্তিকর মনোভাব যে ভাল-ভাল মানুষও এর মোহে পড়িয়া নিজের পার্টির, এমন কি নিজেরও, অনিষ্ট করিয়া বসেন। আমি যখন কংগ্রেসের সামান্য একজন কর্মী ছিলাম, তখনও উঁচুস্তরের অনেক কংগ্রেস নেতার মনোভাব দেখিয়া বিশিত ও দুঃখিত হইতাম। তাঁদের ভাবটা ছিল এই ‘স্বরাজ দেশের জন্য খুবই দরকার। কিন্তু সেটা যদি আমার হাত দিয়া না আসে, তবে না আসাই ভাল। আমার বিবেচনায় মুজিবুর রহমানের মধ্যে এই আত্ম-প্রীতি ছিল খুব প্রবল। এটাকেই তিনি তাঁর পার্টি-প্রীতি বলিয়া চালাইতেন। এই জন্যই আতাউর রহমানের সহিত তাঁর ঘন-ঘন বিরোধ বাধিত। এই বিরোধে উভয়েই আমার বিচার চাহিতেন, অর্থাৎ সমর্থন দাবি করিতেন। সে বিচারে আমি অযোগ্য প্রমাণিত হইয়াছি। নিরপেক্ষ সুবিচারের ‘ভড়ং’ দেখাইতে গিয়া আমি অপরাধ করিয়াছি বলিয়া এতদিনে আমার মনে হইতেছে।
