৫. চুন্দ্রিগড়–মন্ত্রিসভার পদত্যাগ
এসব কারণে চুন্দ্রিগড়-মন্ত্রিসভা পূর্ব-পাকিস্তানের মেজরিটি মেম্বারদের সাহায্য হইতে বঞ্চিত হইলেন। প্রেসিডেন্ট মির্যা প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও ডাঃ খান সাহেবের নেতৃত্বে ও প্রভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের রিপাবলিকান দলে ভাংগন ধরাইতে পারিলেন না। ফলে চুন্দ্রিগড়-মন্ত্রিসভার বিলগুলি বিলে পড়িল। তাঁরা কেন্দ্রীয় আইন-সভায় মেজরিটি করিতে পারিলেন না। অনেক টিলামিছি করিয়া শেষ পর্যন্ত ১১ই ডিসেম্বর। আইন পরিষদের বৈঠক দিলেন। কিন্তু নিশ্চিত পরাজয় জানিয়া তার আগেই পদত্যাগ করিলেন।
আমাদের নেতা শহীদ সাহেব একমাত্র যুক্ত নির্বাচন প্রথায় সাধারণ নির্বাচন দেওয়ার শর্তে রিপাবলিকান মন্ত্রিসভা গঠনের অফার দিলেন। আমাদের কয়েকজনকে দিয়া রিপাবলিকান নেতাদের আশ্বাস দেওয়াইলেন। জনাব আতাউর রহমান, মুজিবুর রহমান ও আমি বিনা-মন্ত্রিত্বে শুধু যুক্ত-নির্বাচন-প্রথায় অবিলম্বে সাধারণ নির্বাচন করার শর্তে রিপাবলিকান মন্ত্রিসভা সমর্থন করিতে সম্মত হইলাম। যুক্ত-নির্বাচন বাদী পূর্ব পাকিস্তানী অন্য যে কোনও ব্যক্তি বা দলকে মন্ত্রিসভায় নিতে আমাদের আপত্তি নাই, তাও জানাইয়া দিলাম। শুধু আমরা আওয়ামী লীগের কেউ মন্ত্রিত্ব নিব না এই কথায় আমরা দৃঢ় থাকিলাম।
তাই হইল। ফিরোজ খাঁ-মন্ত্রিসভা গঠিত হইল। তাঁরা তাঁদের ওয়াদা রক্ষাও করিলেন। সর্বদলীয় সম্মিলনীর বৈঠক ডাকিয়া প্রধানমন্ত্রী ফিরোয় খাঁ নুন ১৯৫৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের চুড়ান্ত দিন-তারিখ ঘোষণা করিলেন।
৬. আওয়ামী লীগে গৃহ-বিবাদ
মন্ত্রিত্ব যাওয়ার পর আমার যথারীতি বরাবরের কর্মস্থল ও ওকালতির জায়গা ময়মনসিংহে ফিরিয়া যাওয়ারই কথা। ইতিমধ্যে করাচি ত্যাগ করিয়া ময়মনসিংহে যাওয়ার পথে ভায়রা-ভাই খোন্দকার আবদুল হামিদ এম, এল, এর মধ্যস্থতায় কয়েকদিনের জন্য জনাব কে. জি, আহমদ সাহেবের আতিথেয়তা গ্রহণ করিয়া ঢাকায় থাকিয়া গেলাম। প্রধানমন্ত্রী বন্ধুর আতাউর রহমান খা ও অন্যান্য বন্ধুরা আমাকে ময়মনসিংহের বদলে ঢাকায় থাকিতে এবং হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করিতে অনুরোধ করিলেন। লিডারও ঐ একই পরামর্শ দিলেন। তিনি আরও বলিলেন রাজনৈতিক প্রয়োজনে আমাকে ময়মনসিংহের চেয়ে ঢাকায় থাকিতে হইবে। কিন্তু সবার উপরে কাজ করল নিজের অহমিকা। এর হাত হইতে বোধ হয় কোনও সাধারণ মানুষই রক্ষা পায় না। এই অহমিকা আমাকে বলিল : বড়-বড় সব নেতাই ত রাজধানীতে থাকেন। তুমি কেন রাজধানীতে থাকিবে না? তুমি ত এখন আর একটা জেলার নেতা নও। সুতরাং আর চিন্তা-ভাবনার কিছু নেই। ঢাকাই ঠিক হইল। বাড়ি ভাড়া করিলাম। লাইব্রেরি ময়মনসিংহ হইতে ঢাকায় লইয়া আসিলাম।
কিন্তু ওকালতি শুরু করা সম্ভব হইল না। প্রথম কয়দিন হাইকোর্টে যাতায়াত করিয়াই কয়েকটা ব্রিফ পাইলাম। আলীপুরে প্র্যাকটিস করিবার সময় যাঁরা আমার জুনিয়র ছিলেন তাঁরা অনেকেই ইতিমধ্যে এ্যাকটিসের দিক দিয়া আমার সিনিয়র হইয়া গিয়াছেন। তবু বয়সে আমি তাঁদের অনেক বড় বলিয়া, একটা এক্স-মিনিস্টার বলিয়া এবং সম্ভবতঃ বিচারপতিদের অনেকেই আমারে ‘সম্মান করেন বলিয়া ওঁদের দুই একজন আমাকে সিনিয়র এনগেজ করিলেন। কিন্তু অল্পদিন মধ্যেই আমাদের পার্টি রাজনীতিতে, কাজেই মন্ত্রিসভায়, এমন ঝামেলা বাঁধিয়া গেল যে আমি দিন-রাত তাতে ব্যস্ত হইয়া পড়িলাম। আমার বাসা চর্বিশ ঘন্টার রাজনীতিক আখড়ায় পরিণত হইল। মণ্ডকেলও জুনিয়ররা ঢুকিতেই পারেন না। বেশ কয়টা এডজোর্নমেন্ট নিয়া অবশেষে ব্রিফ ও বায়নার টাকা ফেরত দিলাম। লিডার বলিলেন, আগামী নির্বাচনের আগে ওকালতির আশা ছাড়িয়া দেওয়াই ভাল। শুধু কথায় নয়, কাজেও তিনি নিজে তাই করিলেন। ঢাকাকেই তিনি তাঁর প্রধান বাসস্থান বানাইলেন। কাজেই আমিও ওকালতির আশা আপাততঃ ত্যাগ করিলাম। কয়েকটা বাই-ইলেকশন ছিল। আমরা তাই লইয়া ব্যস্ত হইলাম। সবকয়টা বাই-ইলেকশনেই আমরা জিতিলাম।
কিন্তু ইতিমধ্যে গৃহ-বিবাদের অশান্তি আমাদের পাইয়া বসিয়াছিল। আতাউর রহমান সাহেব ও মুজিবুর রহমান সাহেবের মধ্যে ব্যাপারটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে নামিয়া পড়িয়াছিল। দুইজনই আদর্শবাদী দেশপ্রেমিক। দুই-এর দক্ষ পরিচালনায় আওয়ামী লীগ-মন্ত্রিসভা এক বছরে অনেক ভাল কাজ করিয়াছে। ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা, ওয়াপদা, আইডবলিউ-টি-এ, ফিল্ম কর্পোরেশন, জুট মার্কেটিং কর্পোরেশন ইত্যাদি নয়া-নয়া শিল্প ও সংস্থা স্থাপন এবং খুলনা ও নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড, কাপতাই পানি-বিদ্যুৎ এই ধরনের আরদ্ধ স্কিমগুলি ত্বরান্বিত করণ, বর্ধমান হাউসে আইন মাফিক বাংলা একাডেমি স্থাপন ইত্যাদি গঠনমূলক কাজ তাঁরা করিয়াছেন। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা ইহাদের পার্লামেন্টারি সদাচার। নির্বিচারে সমস্ত রাজ-বীর মুক্তিদান, নিরাপত্তা আইনসমূহ বাতিলণ, নিয়মিতভাবে উপনির্বাচন অনুষ্ঠান, নির্বাচনকে নিরপেক্ষ করার উদ্দেশ্যে অফিসারদিগকে কঠোরভাবে রাজনীতিমুক্ত রাখা, নির্ধারিত সময়ে আইন-পরিষদের বৈঠক ডাকা, বিনা-বাজেট-মনযুরিতে খরচ না করা, ইত্যাদি সকল ব্যাপারে আদর্শ গণতান্ত্রিক সরকারের উপযোগী কাজ করিয়াছেন।
