শাসনতন্ত্রের বিধান অনুসারে আইন-পরিষদের আগামী বৈঠক ঢাকায় হইতে বাধ্য। সেই বৈঠকে যুক্ত-নির্বাচন-প্রথাকে বাঁচাইয়া রাখার শেষ চেষ্টা করিব ভাবিতেছিলাম। এমন সময় মন্ত্রিসভা ঠিক করিলেন যে নবেম্বর মাসেই নির্বাচন-প্রথা বদলাইবার জন্য পরিষদের একটা বৈঠক তাঁরা করাচিতেই করিবেন। আমরা বিপদ গণিলাম। কিন্তু চেষ্টা ছাড়িলাম না।
৩. আত্মঘাতী পরনিন্দা
এদিকে ধর্মের ঢোল বাতাসে বাজিয়া উঠিল। আমরা শত্রুদের বিরুদ্ধে কিছু না করিলেও স্বয়ং এইড-দাতারা মাঠে নামিলেন। বাণিজ্য মন্ত্রী মিঃ ফযলুর রহমানের বিবৃতিতে বলা হইয়াছিল : আই.সি.এ.এইড বাবত লাইসেন্স বিতরণে দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করা হইয়াছে। পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মিঃ ল্যাংলি এক বিবৃতিতে বলিলেন : বাণিজ্যমন্ত্রীর এই অভিযোগ গুরুতর। ইহা কার্যতঃ মার্কিন অফিসারদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ। কারণ পূর্ব-পাকিস্তানে নয়া-শিল্প বাবত লাইসেন্স বিতরণের জন্য যেসব শিল্প ও তার দরখাস্তকারী নির্বাচন করা হইয়াছে, তা করিয়াছেন আই.সি.এ.’র প্রেরিত প্রজে লিডারগণ নিজেরা। এ অবস্থায় ঐ নির্বাচনে যদি কোনও দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করা হইয়া থাকে, তবে আই.সি.এ.রঅফিসাররাই করিয়াছেন। অতএব এ বিষয়ে অনুসন্ধান করা মার্কিন সরকারের কর্তব্য। সে অনুসন্ধান হওয়া সাপেক্ষে আই.সি.এ. এইড দেওয়া স্থগিত রাখিবার জন্য আমার সরকারকে সুপারিশ করিয়া আমি তারবার্তা পাঠাইলাম।
চুন্দ্রিগড়-মন্ত্রিসভা ব্যস্ততার সংগে তড়িৎগতিতে এক বিশেষ যরুরী বৈঠকে মিলিত হইলেন। মিঃ ল্যাংলিকে অনেক প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা হইল। প্রস্তাবে বলা হইল আই. সি. এ. অফিসারদের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র অভিযোগ করিবার ইচ্ছা ক্ষুণাক্ষরেও বাণিজ্যমন্ত্রীর ছিল না। তিনি শুধু আওয়ামী লীগ-নেতাদের দোষী করিতে চাহিয়াছিলেন। তবু যদি আই.সি.এ. অফিসাররা ও মিঃ ল্যাংলি মনক্ষুণ্ণ হইয়া থাকেন, তবে মন্ত্রিসভা সেজন্য দুঃখ প্রকাশ করিতেছেন। মিঃ ল্যাংলি যেন তাঁর সুপারিশ প্রত্যাহার করিয়া এইড বজায় রাখেন।
কিন্তু মার্কিন সরকার তাঁদের সিদ্ধান্ত বদলাইলেন না। চুন্দ্রিগড় মন্ত্রিসভা শেষ পর্যন্ত উক্ত ‘ইণ্ডাস্ট্রিয়াল মেশিনারি এইড’কে ‘কমোডিটি এইড’ এ রূপান্তরিত করিতে রাখী হইয়া মার্কিন সরকারের নিকট প্রস্তাব পাঠাইলেন। তবু মার্কিন সরকার সেই পাঁচ কোটি টাকার সাহায্য দিতে রাযী হইলেন না। বরঞ্চ উহা চূড়ান্তরূপে বাতিল ঘোষণা করিলেন। কিন্তু মার্কিন সরকার যদি রাযী হইতেনও তথাপি শিয়োন্নয়নের দিক হইতে উক্ত এইড মূল্যহীন ও অবান্তর হইত। চুন্দ্রিগড় মন্ত্রিসভা অবশ্য ভরশা দিয়াছিলেন যে পাকিস্তানের নিজস্ব অর্জিত বিদেশী-মুদ্রা হইতে পূর্ব-পাকিস্তানের পরিকল্পিত শিল্পগুলি স্থাপন করিবেন। কিন্তু কেউ তাতে বিশ্বাস করে নাই। মুখ ও মন্ত্রিত্ব রক্ষার জন্য ওটাকে তাঁদের ভাওতা মনে করিয়াছে। শেষ পর্যন্ত ওটা ভাওতাই প্রমাণিত হইল। পূর্ব-পাকিস্তানে ৫৮টি নয়া-শিল্প প্রতিষ্ঠার যে পরিকল্পনা পূর্ব-পাক সরকার করিয়াছিলেন, তা আর কার্যকরী করা হইল না। প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের বিশেষ সাহস ও উদ্যোগে পূর্ব-পাকিস্তানের নিজস্ব কোটা হইতে বিদেশী মুদ্রা দিয়া উক্ত ৫৮টি শিল্পের মধ্যে মাত্র ৩/৪টি স্থাপন করা সম্ভব হইয়াছিল। প্রতিপক্ষীয় রাজনীতিক নেতাদের ও পার্টির বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করিতে গিয়া দায়িত্বশীল ব্যক্তির অসাবধান উক্তির ফলে দেশের কি অনিষ্ট হইতে পারে, এই ঘটনাটি তার প্রমাণ স্বরূপ ইতিহাসের পৃষ্ঠায় দুরপনেয় হইয়া থাকিবে।
৪. নির্বাচনে বাধা
পূর্ব-পাকিস্তানের এই সর্বনাশ করিবার পর চুন্দ্রিগড়-সরকার গোটা পাকিস্তানের সর্বনাশ করার কাজে হাত দিলেন। প্রধানতঃ যুক্ত-নির্বাচন-প্রথা বাতিল করিয়া পুনরায় পৃথক নির্বাচন-প্রথার প্রবর্তনের যিকির তুলিয়াই মুসলিম লীগ-নেতারা মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন। মন্ত্রিসভা গঠন করিয়াই তাঁরা নির্বাচন-প্রথা সংশোধনী বিল ও নির্বাচনী আইন সংশোধনী বিল রচনা করিয়া ফেলিলেন। বিস্ময়কর অসাধারণ অদূরদর্শিতার (অথবা দূরদর্শিতার?) দরুনই এটা তাঁরা করতে পারিলেন। তাঁরা ভুলিয়া গেলেন?
(১) ভোটের লিস্ট সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে নূতন করিয়া রচনা করিতে হইবে।
(২) হিন্দু-মুসলিম আসনের হার ও সংখ্যা নির্ধারণ করিতে হইবে।
(৩) হিন্দু-মুসলিম জনসংখ্যার জন্য ১৯৫১ সালের আদমশুমারির উপর নির্ভর করিলে পূর্ব-পাকিস্তানের মুসলমানদের উপর সাংঘাতিক অবিচার করা হইবে। কারণ ঐ আদমশুমারির পরে এই সাত বছরে বহু হিন্দু পাকিস্তান ছাড়িয়া গিয়াছে।
(৪) অতএব নূতন করিয়া আদমশুমারির দরকার হইবে; অথবা ১৯৬১ সালের আদমশুমারি-তক অপেক্ষা করিতে হইবে।
(৫) সাধারণ নির্বাচন পাঁচ বছরের জন্য পিছাইয়া দিতে হইবে।
আমরা বলিলাম বটে এটা মুসলিম লীগ-নেতাদের অদূরদর্শিতা; কিন্তু অনেক বুদ্ধিমান লোক বলিলেন এটা তাঁদের দূরদর্শিতা। কারণ সাধারণ নির্বাচন পিছাইয়া দেওয়াই বুদ্ধিমান লোকদের উদ্দেশ্য। তাঁদের কথা সত্য হইতে পারে। মুসলিম লীগ নেতারা নির্বাচনকে ভয় পান, সেটা তারা অতীতে বহুবার প্রমাণ করিয়াছেন। পূর্ব পাকিস্তানে ৩৫টি উপ-নির্বাচন আটকাইয়া রাখিয়াছিলেন। নয় বছর তাঁরা শাসনতন্ত্র রচনা আটুকাইয়া রাখিয়াছিলেন। ৫৪ সালের পূর্ব-বাংলার সাধারণ নির্বাচনের ঘা তখনও শুকায় নাই। এটা ত মুসলিম লীগ নেতাদের নিজেদের ভাব-গতিক। তার সংগে যোগ দিয়াছিলেন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্যা। সাধারণ নির্বাচনের সাথে সাথেই তাঁর আয়ু শেষ হইবে, এ আশংকা তাঁকে ভীষণরূপে পাইয়া বসিয়াছিল।
