করাচির কাগযগুলির বেশির ভাগই এ ব্যাপারটা লইয়া রোজ আওয়ামী লীগ পার্টির ও ব্যক্তিগতভাবে আমার বিরুদ্ধে প্রচার-প্রপাগাণ্ড চালাইয়া যাইতে লাগিল। ফযলুর রহমান সাহেব ‘পযিশন ক্লিয়ার’ করিয়া কোনও বিবৃতি দিলেন না। আমি অগত্যা লিডারের অনুমতি চাহিলাম মর্নিং নিউযের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করিতে। আমার বিরুদ্ধে ‘মর্নিং নিউযের আক্রোশ আছে, একথাও তাঁকে বলিলাম। ঘটনাটা এই: নিউয প্রিন্ট কনটোলার শিল্প দফতরের অধীন। পূর্ব-পাকিস্তানের প্রায় সব কয়টা দৈনিকের এবং পশ্চিম পাকিস্তানের কোনও কোনও দৈনিকের পক্ষে আমার কাছে নালিশ করা হইল যে নিউয প্রিন্টের ব্যাপারে তাঁরা সুবিচার পান না। অডিট বুরোর রিপোর্ট মোতাবেক প্রচার সংখ্যা অনুসারে সবাই কাগ পান, এটাই ছিল আমার বিশ্বাস। এঁদের অভিযোগে কাজেই নিউ প্রিন্ট কনট্রোলারের রিপোর্ট তলব করিলাম। তাঁর রিপোর্টের সমর্থনে কনট্রোলার মিঃ আবদুল আযিয আমার নিকট কাগ-পত্র দাখিল করিলেন। আমি ঐসব কাগ-পত্র দেখিয়া প্রয়োজন মত প্রতিকার করিলাম। কিন্তু ঐসব কাগয-পত্র দেখিতে-দেখিতে একটা ‘কেঁচু খুঁড়িতে সাপ’ দেখার ব্যাপার ঘটিয়া গেল। দেখিলাম, কত পৃষ্ঠার কাগয, শুধু তাই দেখিয়া নিউযপ্রিন্টের কোটা ঠিক করা হয়। ‘ডন’, ‘পাকিস্তান টাইমস’, ‘পাকিস্তান অবযারভার’, ‘আজাদ’, ‘ইত্তেফাক’, ‘মর্নিং নিউয’ সবারই এক হিসাব। আমি কনট্রোলারকে বলিলাম : এটা কি আপনার বিবেচনায় আসে নাই যে অন্য সব কাগযই ডবল-ডিমাই; একমাত্র ‘মনিং-নিউযই’ ডবল ক্রাউন? ডবল-ডিমাই ও ডবল ক্রাউনে কত তফাৎ আপনি জানেন? কনট্রোলার ভুল স্বীকার করিলেন। হিসাবে মর্নিং নিউযের কোটা অনেক কমিয়া গেল। এতদিন যে মর্নিং নিউয’ অতিরিক্ত নিউয প্রিন্ট নিয়াছে, তার ব্যবহার কিভাবে হইয়াছে, এর মধ্যে বজ্জাতি আছে কি না, থাকিলে বজ্জাতিটা কার, এসব কথা স্বভাবতঃই আসিল। শেষ পর্যন্ত ‘মনিং নিউযে’র কিছু হইল না উপরের তলার ধরাধরিতে। কিন্তু কোটার বাড়তিটা তার আর থাকিল না। এই বাড়তি কাগ দিয়া তারা এতদিন কি করিত, তা আল্লাই জানেন। কিন্তু এটা কমিয়া যাওয়ায় আমি যেন তাদের জানী দুশমন হইয়া গেলাম। মালিকদের দুশমন হইবার কারণ বুঝা যায়। কিন্তু জার্নালিস্টদের দুশমন কেন হইলাম, তা বুঝিতে আমার অনেক দিন লাগিয়াছিল।
যা হোক, লিডারকে এসব কথা বলিবার পরে তিনি হাসিয়া বলিলেন : আইনের দিক হইতে বলিতে গেলে তোমার মামলা খুবই ভাল। কিন্তু তুমি রাজনীতিক। রাজনীতিককে এমন পাতলা-চামড়া হইলে চলে না। দুর্নীতির অভিযোগ কোন নেতার বিরুদ্ধে না হইয়াছে? বিদেশে জর্জ ওয়াশিংটন, লিংকনের কথা বাদ দিলেও এ দেশেরও গান্ধীজিন্না-সি.আর.দা-সুভাষচন্দ্র-ফযলুল হক এমনকি তোমার নেতা এই সুহরাওয়ার্দী পর্যন্ত কে রেহাই পাইয়াছেন? কে কবে গিয়াছেন মানহানির মামলা করিতে? কেউ যান নাই। একটু থামিয়া একটা অট্টহাসি দিয়া বলিলেন : হ, পূর্ব বাংলার এক নেতা মানহানির মামলা করিয়াছেন। জিতিয়াছেনও। তুমি যদি আমাদের সবাইকে ছাড়িয়া তাঁর অনুরণ করিতে চাও, যাও তবে মামলা কর গিয়া।
মামলা করার উৎসাহ পানি হইয়া গেল, তার বদলে একটা লম্বা বিবৃতি দিলাম। যে ‘মর্নিং নিউযে’র অভিযোগের জবাবে ঐ বিবৃতি, সেই কাগযটি ছাড়া আর সব কাগযই মোটামুটি আমার বিবৃতি ছাপাইলেন। করাচির ‘ডন’ ও ঢাকার ইত্তেফাক আমার পূরা বিবৃতি ছাপিয়া আমাকে কৃতজ্ঞতা-পাশে বাঁধিলেন।
২. আসল মতলব ফাঁস
এদিকে নয়া প্রধানমন্ত্রী মিঃ চুন্দ্রিগড় তাঁর প্রথম বেতার ভাষণেই যুক্ত-নির্বাচনের বদলে পৃথক-নির্বাচন পুনঃপ্রবর্তনের সংকর ঘোষণা করিলেন। এই বেতার ভাষণে তিনি দুইটি দাবি করিলেন। এক, মুহতারেমা মিস ফাতেমা জিন্না চুন্দ্রিগড় মন্ত্রিসভাকে সমর্থন দিয়াছেন। দুই, রিপাবলিকান পার্টি পৃথক-নির্বাচনে সম্মত হইয়াছে।
মুহতারেমা মিস ফাতেমা জিন্না পরের দিনই এক বিবৃতি দিয়া মিঃ চুন্দ্রিগড়ের দাবি অস্বীকার করিলেন। ফলে মিঃ চুল্লিগরে দুইটা লোকসান হইল। প্রথমতঃ তিনি ব্যক্তিগতভাবে অসত্যবাদী প্রমাণিত হইলেন। দ্বিতীয়তঃ তাঁর মন্ত্রিসভার নৈতিক শক্তি অনেকখানি কমিয়া গেল।
রিপাবলিকানদের অনেকেই আসলে মুসলিম লীগার। সুতরাং তাঁরা পৃথক নির্বাচনে সম্মত হইয়াছেন শুনিয়া বিস্মিত হইলাম না। কিন্তু ডাঃ খান সাহেব প্রভৃতি কতিপয় নেতাকে আমি নীতিগতভাবেই যুক্ত নির্বাচনের সমর্থক করিয়া জানিতাম। তিনিও পৃথক নির্বাচনে সম্মত হইয়াছেন এটা বিশ্বাস করিলাম না। ঢাকা হইতে মিঃ হামিদুল হক চৌধুরী খবরের কাগয়ে বিবৃতি দিয়া চুন্দ্রিগড়-মন্তিসভাকে সমর্থন করিলেন। কিন্তু সংগে-সংগেই যুক্ত-নির্বাচন প্রথা বজায় রাখিবার অনুরোধও তিনি করিলেন। নয়া মন্ত্রীদের মধ্যে আমি বাছিয়া-বাছিয়া সৈয়দ আমজাদ আলী, মিয়া যাফর শাহ, আবদুল লতিফ বিশ্বাস প্রভৃতিকে এ ব্যাপারে জিগাসাবাদও করিলাম। আকার ইংগিতে ক্যানভাসও করিলাম। ভরসাও তাঁরা মোটামুটি দিলেন। চুন্দ্রিগড়-মন্ত্রিসভার প্রথম কেবিনেট বৈঠকে যুক্ত-নির্বাচন-প্রথার বদলে পৃথক নির্বাচন চালু করিবার প্রস্তাব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হইতে পারে নাই, এ সংবাদ পড়িয়া কতকটা আস্তও হইলাম।
