কিন্তু আমার আশংকাই সত্যে পরিণত হইল সন্ধ্যার দিকে। প্রেসিডেন্টের দফতর হইতে পত্র আসিল তিনি প্রধানমন্ত্রী শহীদ সাহেবের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করিয়াছেন এবং নয়া মন্ত্রিসভা গঠিত না হওয়া পর্যন্ত আগের মতই কাজ চালাইয়া যাইতে বলিয়াছেন। লিডার চিরকালের ‘অসংশোধনীয় আশাবাদী। মির্যা তাঁর সাথে চালাকি করিতেছেন এটা তিনি তখনও বিশ্বাস করিলেন না। করিলেও আমাদেরে জানিতে দিলেন না। বিশেষতঃ চুন্দ্রিগড়-দওলানা সকালে-বিকালে লিডারের সাথে যোগাযোগ করিয়া তাঁর মনের ধারণা আরও দৃঢ় করিতে লাগিলেন। বস্তুতঃ এক সন্ধ্যায় লিডার আমাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। চুন্দ্রিগড় ও দওলতানা আসিবার কথা। বুঝিলাম, লিডার নাহক আশা করিতেছেন না। সন্ধ্যা আসিল, গেল। রাতও আসিল। কিন্তু চুন্দ্রিগড়-দণ্ডলতানা আসিলেন না। অগত্যা লিডারই টেলিফোন করিলেন। কয়েকবার। শেষে যখন তাঁদেরে পাওয়া গেল, তখন তাঁরা বলিলেন, এই আসিতেছেন। আশা করিলাম নিজেদের মধ্যে কথা একদম ফাইনাল করিয়াই আসিতেছেন। ভালই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা আসিলেন না। বোধ হয় পরের দিনের কথা বলিলেন। লিডার আমাকে বলিলেন : ‘আজ যাও, কাল খবর দিব।
লিডার আর খবর দিলেন না। তবু প্রতিদিনই যাইতে থাকিলাম। প্রধানমন্ত্রীর অনেকগুলি দফতর। তাছাড়া প্রায় সব দফতরের কতকগুলি ফাঁইলে প্রধানমন্ত্রীর ‘এপ্রুভাল’ দরকার। সেগুলিও জমিয়াছিল। প্রধানমন্ত্রী সে সব ফাঁইলের গাদা লইয়া বসিলেন। আমি ব্যাপার অনুমান করিলাম। তাছাড়া লিডারও বলিলেন : ফাইল জমা থাকিলে ডিসপোযসব করিয়া ফেল। এসব ইশারা বুঝিতে বেশী আকেলমন্দ লাগে না। কিন্তু আমার ফাইল বড়-একটা জমা হইত না। সাধ্যমত ঠিক সময়ে ফাইল ডিসপোয-অব করা আমার অভ্যাস। একরূপ বাতিকও বলিতে পারেন। মুত্তাকী মাযী মানুষ যেমন মাযের ওয়াক্ত হইলে নমায় না পড়া পর্যন্ত একটা বেচায়নি বোধ করেন, আমার ছিল তেমনি অভ্যাস। ফাইল পড়িয়া থাকিলে আমার গায় যেন সূড় সূড়ি লাগিত। কোনও অফিসার যদি বলিতেন : সার, আমার ফাইলটা আজও আপনার টেবিলে পড়িয়া আছে, তবে তখন আমি লজ্জা পাইতাম। আমার দুইজন প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিলেন, দুই দফতরের জন্য। দুই জনই পুরান অভিজ্ঞ ও অফিসার শ্রেণীর দক্ষ সেক্রেটারি ছিলেন। তাঁরা তৎপরতার সংগে বিভাগীয় প্রতিযোগিতার ভিত্তিতেই যেন যাঁর-তাঁর দফতরের ফাইল ডিসপোষ করাইতেন। ফেলিয়া রাখার উপায় ছিল না। টুওরে থাকিবার সময়ও রাত্রে এবং ট্রেনে-ভ্রমণের সময় সেলুনে এরা ফাইল নিয়া হাযির। কাজেই প্রধানমন্ত্রীর ইশারার উত্তরে আমি বিশেষ ব্যস্ত হইলাম না। তবু কয়দিন নিয়মিত সময়ের বেশী সময় কাজ করিতে লাগিলাম।
২৮. ঘনঘটা
ঘনঘটা
আটাইশা অধ্যায়
১. পার্টি-ফণ্ডের কেম্পেইন শুরু
শেষ পর্যন্ত ১৮ই অক্টোবর (১৯৫৭) ১৪ জন মন্ত্রীর চুন্দ্রিগড়-মন্ত্রিসভা গঠিত হইল। আমরা বিদায় নিলাম। বিদায়ের আগে লিডার একটা প্রেস-কনফারেন্স করিলেন। আমাদের যাওয়ার কথা নয়। তবু আমরা দুই-একজন গেলাম। কনফারেন্সের কাজ আগেই শুরু হইয়া গিয়াছিল। দেখিলাম, রিপোর্টাররা শহীদ সাহেবকে নানারূপ প্রশ্ন করিতেছেন। শহীদ সাহেব কষিয়া জবাব দিতেছেন। তিনি মন্ত্রিত্বের তোয়াক্কা করেন না; বড় একটা আদর্শের জন্যই তাঁর মন্ত্রিত্ব স্যাক্রিফাইস করিতে হইয়াছে। এসব কথা তিনি খুব জোরের সংগেই যুক্তিতর্ক দিয়া বুঝাইলেন। আমি খুশী হইলাম।
কোনও কোনও সংবাদিক বন্ধু আমাকে জানাইলেন : মর্নিং নিউযে’র রিপোর্টার আমার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করিয়াছেন। ঐ রিপোর্টার বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করিয়াছেন। তাঁর বাণিজ্য মন্ত্রী লাইসেন্স পারমিট বিতরণ করিয়া চার কোটি টাকা পার্টি-ফণ্ড তুলিয়াছেন একথা তিনি অবগত আছেন কি না? আমি স্বাভাবিক কৌতূহলে বন্ধুদেরে জিগাসা করিলাম : শহীদ সাহেব কি জবাব দিলেন? বন্ধুরা বলিলেন : বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ধীর কণ্ঠে জবাব দিয়াছেন : আপনার কাছেই আজ সর্বপ্রথম এই কথা শুনিলাম।
পরদিন ‘মনিং নিউযে’ ঐ প্রশ্নোত্তর ছাপা হইল। শুধু তাই নয়। বাণিজ্য দফতরে আমার উত্তরাধিকারী মন্ত্রী মিঃ ফযলুর রহমান মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিয়াই একটি প্রেস কনফারেন্স করিলেন। অন্যান্য কথার মধ্যে তিনিও ঐ চার কোটি-ফও ভোলার অভিযোগের পুনরুল্লেখ করিলেন। তবে তিনি সোজাসুজি কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রী না বলিয়া আওয়ামী লীগ মন্ত্রীরা বলিলেন। আমি তখনও সরকারী মন্ত্রি-ভবনেই আছি। ফযলুর রহমান সাহেব তখনও নিজের বাড়িতেই আছেন। আমি কাগটা পড়িয়াই তাঁকে ফোন করিলাম। লাইসেন্স বিতরণে আমার প্রবর্তিত নয়া কানুনে, এবং আই, সি, এর সাহায্যের, সব লাইসেন্স বিতরণের ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের, এসব কথা শুনিয়া তিনি বলিলেন : ভাই, আমি সব কথা জানি। আপনে মনে কিছু করিবেন না। আমি বাণিজ্য দফতরে আগেও মন্ত্রিত্ব করিয়াছি। আপনার বিরুদ্ধে আমি কিছু বলিতে পারি না। বলিও নাই। শুধু প্রাদেশিক মন্ত্রীরে একটু খোঁচা দিয়া রাখিলাম।
আমি বন্ধুবরের রসিকতার জবাবে রসিকতা করিয়াই বলিলাম : খোঁচার টার্গেট আপনার যেই থাকুক, ওটা কিন্তু লাগিয়াছে সাহায্য দাতাদের গায়। কারণ লাইসেন্স প্রাপকরা তাঁদেরই বাছাই-করা লোক। জবাবে ফযলুর রহমান সাহেব শুধু বলিলেন : তাই নাকি? এটাত জানিতাম না। আমি গম্ভীরভাবে বলিলাম : ফাইলপত্র দেখুন। এবং পযিশন ক্লিয়ার করিয়া একটা বিবৃতি দিন। টেলিফোন রাখিয়া দিলাম।
