৬. সিকান্দরের জয়
সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী-ভবনে স্টেট-রিসেপশন। অভিজাত জন-সমাবেশ। আলোক মালায় সজ্জিত বিশাল আংগিনা লোকে লোকারণ্য। সবাই আসিয়াছেন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী মন্ত্রীরা একজনও আসেন নাই। টোটাল বয়কট। কেউ সেটা লক্ষ্য করিবার এবং কানাঘুষা আরম্ভ হইবার আগেই প্রধানমন্ত্রী ফাংশন শুরু করিলেন। উভয় রাষ্ট্র নেই.পরস্পরের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করিয়া বক্তৃতা করিলেন এবং টোস্ট প্রস্তাব ও স্বাস্থ্য পান করিলেন। খাওয়ার ধুম লাগিল।
কিন্তু সাংবাদিকরা খাওয়ায় ভুলিবার পাত্র নন। তাঁরা তাঁদের কাজ শুরু করিলেন। এ-ওর কাছে, মন্ত্রীদের কাছে এবং বিশেষ করিয়া আমার নিকট, নানারূপ প্রশ্ন করিতে লাগিলেন। বিদেশী সম্মানিত অতিথির সহিত আলোচনায় রত বলিয়া প্রধানমন্ত্রী তাঁদের নাগালের বাইরে। সুতরাং আমাদের উপরই শিলাবৃষ্টি হইতে লাগিল। কি হইল? কেন পশ্চিম পাকিস্তানী মন্ত্রীরা পার্টিতে আসিলেন না। তাঁরা নাকি একযোগে পদত্যাগ করিয়াছেন। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং পদত্যাগ করিয়াছেন কিংবা করিবেন কি না? তিনি নয়া মন্ত্রিসভা গঠন করিবেন কি না? ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্ন। আসন্ন অবশ্যম্ভাবী বিপদের আশংকায় আমারও বুক কাঁপিতে ও গলা শুকাইয়া আসিতে লাগিল। কিন্তু অতি কষ্টে সব গোপন করিয়া হাস্য-রসিকতা করিয়া সাংবাদিকদের বুঝাইতে চাহিলাম তাঁরা যা শুনিয়াছেন সব ভূল। তাঁরাও ছাড়িবার পাত্র নন। আমিও হারিবাঃ পাত্র নই।
এমনি করিয়া অনেক রাত হইয়া গেল। আস্তে-আস্তে মেহমানরা এবং ফলে সাংবাদিকরাও চলিয়া গেলেন। থাকিলাম আমরা মাত্র পূর্ব-পাকিস্তানী দুইজন মন্ত্রী মিঃ দেলদার আহমদ ও আমি এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল প্রাইভেট সেক্রেটারি মিঃ আফতাব আহমদ খান। আমাদের সাথে পরামর্শ করিবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর চেম্বারে নিয়া গেলেন। দরজা বন্ধ করিয়া তিনি আমাদেরে প্রেসিডেন্ট মির্যার একটি পত্র দেখাইলেন। তাতে প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান পার্টির অনাস্থার কথা জানাইয়া প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগের উপদেশ দিয়াছেন। কিছুক্ষণ পরামর্শ করিবার পর প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্টের পত্রের জবাব মুসাবিদা করিলেন। আমরা সকলে তাঁর সাথে একমত হইলাম। চিঠি টাইপ হইল। তাতে বলা হইল, প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্ট ডাকুন। পার্লামেন্টের মোকাবিলা না করিয়া প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিতে পারিবেন না। প্রেসিডেন্টের কাছে এই পত্র পাঠান হইল। সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্যও দেওয়া হইল।
পরদিন রিপাবলিকান বন্ধুরা বলিলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর জবাবটা খবরের কাগযে দিয়া সর্বনাশ করিয়া ফেলিয়াছেন; নইলে একটা আপোস-রফা হইতে পারিত। এখন আর তার সম্ভাবনা নাই। কিন্তু আমরা বুঝিলাম ওটা বাজে কথা। পশ্চিমারা জোট বাঁধিয়াছেন। কিছুতেই সুহরাওয়ার্দী সাহেবের প্রাধান্য মানিবেন না। আমরা আভাস পাইয়াছিলাম আগের রাত্রেই। লিডার সত্য-সত্যই গুরমানী-দণ্ডলতানা গ্রুপের উপর রসা করিতেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপে বুঝিলাম, তিনি গতরাত্রের ঐ চিঠির পরে সত্যসত্যই প্রেসিডেন্টের কাছে পদত্যাগপত্র দিয়াছেন। এ সম্বন্ধে বেশী ঘাটাঘাটি করিতে আমাদের মানা করিলেন। আমাকে গোপনে বলিলেন, ঐ পদত্যাগপত্রে কিছু ক্ষতি হয় নাই। কুদ্ধ রিপাবলিকানদের মোকাবিলায় প্রেসিডেন্টের হাত শক্ত করিবার। জন্যই তিনি তা করিয়াছেন। তাঁর কথায় বুঝিলাম, প্রেসিডেন্ট তাঁকে বুঝাইয়াছেন, ঐ পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা মানেই মুসলিম লীগর্কে মন্ত্রিসভা গঠন করিতে আহ্বান করা। মুসলিম লীগ মানেই গুরমানী দওলতানা। ‘তোমরা যদি তাই চাও, আমি তাই করিব। প্রেসিডেন্টের এই কথা শুনামাত্র রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্টকে এবং প্রয়োজন হইলে শহীদ সাহেবকে খোশামূদ করিয়া শহীদ সাহেবের মন্ত্রিসভা বজায় রাখবেন।
লিডারের যুক্তি ও পন্থাটা আমার খুব না পসন্দ না হইলেও আমি ওটা বিশ্বাস করিতে পারিলাম না। কিন্তু দেখিলাম লিডার মির্যার এই আশ্বাসে খুবই বিশ্বাস করিয়াছেন। এতটা বিশ্বাস করিয়াছেন যে তিনি ইতিমধ্যে পোর্ট ফলিও রদ-বদল করিবার চিন্তা, হয়ত বা, আলোচনাও শুরু করিয়াছেন। এমনকি আমাকে শিল্প বাণিজ্যের বদলে ফাইন্যান্স দিলে কেমন হয়, তাও জিগাসা করিলেন। লিডারের শিশুসুলভ সরলতায় দুঃখিত হইলাম। কিন্তু তাঁর আত্মবিশ্বাস দেখিয়া সাহসও পাইলাম। আমি জানিতাম পশ্চিমা সওদাগর-শিল্পপতিদের ঘা কোথায়। বলিলাম : আপনার মন্ত্রিসভার স্থায়িত্বের জন্য পোর্টফলিও কেন আমি মন্ত্রিত্বও ত্যাগ করিতে পারি। সেজন্য আপনি কোনও ভাবনা করিবেন না। কিন্তু কথা এই যে আমি ফাইন্যান্সের জানি কি? লিডাব্রে তাঁর স্বাভাবিক শ্রুতিকটু কিন্তু ধারাল রসিকতায় বলিলেন : ওহহ, যেন মন্ত্রিত্ব নিবার আগে তুমি শিল্প-বাণিজ্যের একটা এক্সপার্ট ছিলে। মাথায় পড়িলে সবই তুমি পারিবে। তাছাড়া আমি আছি তা ধরিয়া নিলাম পোর্টফলিও রদ-বদলের শর্তে লিডার ইতিমধ্যেই প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকানদের সাথে রফা করিয়াই ফেলিয়াছেন। খুশীই হইলাম। যে কোনও মূল্যে আগামী ইলেকশন পর্যন্ত শহীদ মন্ত্রিসভার টিকিয়া থাকা দরকার। সেই দরকার মন্ত্রিসভায় থাকিয়া ইলেকশনে সুবিধা করিবার উদ্দেশ্যে নয়। কারণ সে রকম সুবিধায় আমি কোনও দিনই বিশ্বাসী ছিলাম না। ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগের অবস্থা দেখিয়া আরও অনেকের সে বিশ্বাস বদলাইয়াছে। তবু যে আমি সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত শহীদ মন্ত্রিসভার স্থায়িত্ব সারা অন্তর দিয়া কামনা করিতাম, তা শুধু নির্বাচন-প্রথার জন্য। অনেক কষ্টে আমরা যুক্ত নির্বাচন প্রথার আইনটি পাস করিয়াছি। শহীদ মন্ত্রিসভার পতনের সাথে-সাথে যুক্ত নির্বাচন-প্রথা বাতিল হইবে, এ সম্পর্কে আমার আশংকার মধ্যে কোনও ফাঁক ছিল না।
