রেডিওর পরবর্তী বৈঠকেই প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা প্রচারিত হইয়া গেল। পার্থক্য শুধু এই প্রধানমন্ত্রীরটা তাঁর নিজ গলায়। প্রেসিডেন্টেরটা তাঁর নিজ গলায় নয়। রেডিওর বুলেটিন রিডারের গলায়।
আশংকা সত্যে পরিণত হইতেছে দেখিয়া টুওর প্রোগ্রাম বাতিল করিলাম। করাচি ফিরিয়া গেলাম। প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলিয়া বুঝিলাম, ওয়ান-ইউনিটের ব্যাপারকে তিনি মূলনীতির প্রশ্ন করিয়াছেন। দৃঢ়-সংকল্প হইয়াছেন। সে সংকল্পের সামনে আমার সমস্ত যুক্তি অর্থহীন হইয়া গেল। তিনি এক কথায় বলিলেন: এজন্য তাঁর মন্ত্রিত্ব গেলেও তিনি পরওয়া করেন না। তাঁর মন্ত্রিত যাওয়া শুধু একটা মন্ত্রিসভার পতন নয়, সাধারণ নির্বাচন ভণ্ডুল হইয়া যাওয়া, একথাও তাঁকে স্মরণ করাইয়া দিলাম। তিনি বলিলেন : আমার আশংকা অমূলক ও অতিরঞ্জিত।
লিডার এই পথে আরও অগ্রসর হইলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের তিনটি পার্লামেন্টারি পার্টিই একমত হইয়া এক-ইউনিট ভাংগিয়া পূর্বতন স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশে ফিরিয়া যাইতে রাখী হইয়াছেন, এটা যে পশ্চিম পাকিস্তানের জনমতের বিরুদ্ধে, তা প্রমাণের জন্য তিনি টুওর প্রোগ্রাম করিলেন। পাঞ্জাব ও বাহওয়ালপুরেই প্রথম সফর। আমরা নিশ্চিত পতনের অপেক্ষায় ঘরে বসিয়া থাকিলাম। প্রতিদিন খবরের কাগযে প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ-লক্ষ লোকের বিরাট জনসভায় প্রাণস্পর্শী বক্তৃতার রিপোর্ট পড়িতে লাগিলাম। সে সব বক্তৃতায় তিনি এক ইউনিট বিরোধীদের পাকিস্তানের অনিষ্টকারী বলিয়া বর্ণনা করিতে লাগিলেন। এইসব সভায় প্রায় সবগুলিই রিপাবলিকান পার্টির মন্ত্রীদের দ্বারা আমাোজিত এবং তাঁদের উপস্থিতিতেই সমবেত। পরে দুই-একজন কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রী কাঁদ-কাঁদ ভাষায় আমাকে বলিয়াছিলেন : ‘আমাদের চেষ্টায় ও টাকায় আয়োজিত সভায় আমাদের টাকায় সজ্জিত মঞ্চে বসিয়া আমাদের-কেনা মালা গলায় লইয়া আমাদের সামনে আমাদেরে দেখাইয়া আমাদের ভোটারদেরে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলিয়াছেন : এরা পাকিস্তানেরদুশমন। লজ্জায়-ঘৃণায় আমাদের মাথা হেট হইয়াছে।
৫. রিপাবলিকান দলে প্রতিক্রিয়া
করাচিতে এর ফল ফলিল। প্রেসিডেন্ট আমাকে ডাকিলেন। তিনি কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানী মন্ত্রীর-লেখা পত্র আমাকে পড়িতে দিলেন। সব কয়টাতেই লেখা, প্রধানমন্ত্রী তাঁদেরে এবং তাঁদের পার্টিকে ট্রেটর বলিয়া গাল দিয়াছেন। এ অবস্থায় তাঁরা এই প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কাজ করিতে অনিচ্ছুক। এই সব পত্রে এক-ইউনিট ছাড়াও অন্য ব্যাপারের উল্লেখ বা ইংগিত আছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের প্রতি কবে এমন অভদ্র ব্যবহার করিয়াছিলেন, তারও উল্লেখ আছে। প্রধানমন্ত্রীর রিপাবলিকান দলের বিরুদ্ধে নবাব গুরমানী-পরিচালিত মুসলিম লীগ পার্টির সহিত ষড়যন্ত্রেরও অভিযোগ আছে। প্রেসিডেন্ট ডাঃ খান সাহেব-সহ কতিপয় রিপাবলিকান নেতার টেলিগ্রামও আমাকে দেখাইলেন। তাতে লেখা ছিলঃ তাঁরা সবাই পরের দিন করাচি আসিতেছেন একটা হেস্তনেস্ত করিতে।
সেদিন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে যুগোশ্লাভ ভাইস-প্রেসিডেন্টের একটা স্টেট রিসেপশন ছিল। পূর্বাহ্নেযুগোশ্লাভিয়ার ভাইস-প্রেসিডেন্টের সহিত প্রেসিডেন্ট হাউসের দুতলায় দরবার হলে আমার ইন্টারভিউ। এটা হওয়ার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রীর সাথে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আরেকটা কি গুরুতর কাজে ব্যাপৃত থাকায় আমার উপরই এই মোলাকাতের ভার পড়ে। প্রায় দুই ঘন্টা মোলাতের পর নিচে নামিয়া দেখিলাম ডাঃ খান সাহেব, সৈয়দ আমজাদ আলী, তাঁর সহোদর শাহ ওয়াজেদ আলী ও কতিপয় কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রী প্রেসিডেন্টের সহিত দরবার করিতেছেন। আমাকে গোপন করিবার চেষ্টা করিলেন না। বরঞ্চ ডাকিয়া তাঁদের দরবারে নিলেন। প্রেসিডেন্টের সামনেই এবং স্পষ্টতঃ তাঁর অনুমোদনক্রমে বলিলেন, তাঁরা আমাদের লিডারের প্রধানমন্ত্রিত্ব আর সমর্থন করিবেন না, স্থির সিদ্ধান্ত করিয়াছেন। আমার কর্তব্য তাঁকে পদত্যাগ করিতে পরামর্শ দেওয়া। আমি সাধ্যমত তাঁদের সাথে তর্ক করিলাম। যুক্তি তর্ক দিলাম। সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় বেশ নরম ভাবও দেখাইলেন। কিন্তু অন্যান্যেরা অনমনীয় থাকিলেন। কথা শোনা গেল প্রধানমন্ত্রী আসিতেছেন। কাজেই ইচ্ছাকরিয়াই আমি দেরি করিলাম। প্রধানমন্ত্রী আসিলেন। প্রেসিডেন্টের সহিত গোপন পরামর্শ করিলেন। আমরা বারান্দায় ও সম্মুখস্থ বিশাল সেহানে পায়চারি করিতে-করিতে গ্রুপ ডিসকাশন করিতে লাগিলাম।
প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্টের সহিত আলাপ শেষ করিয়া বাহির হইলেন। সকলের সহিত হাস্য-রসিকতা করিয়া আমার হাত ধরিয়া বাহির হইয়া গাড়ি-বারান্দায় আসিলেন। আমি কোনও প্রশ্ন করিবার আগেই নিতান্ত স্বাভাবিক সহজ গলায় যুগোস্লাভিয়ার ভাইস-প্রেসিডেন্টের সহিত আমার মোলকাতের কথা জিগ্গাসা করিলেন। কি কি বিষয়ে আলাপ হইল, তার খুটিনাটি জানিতে চাহিলেন। আমি নিজের অধৈর্য গোপন করিয়া তাঁর সব কথার সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়া আসল কথা পাড়িলাম। প্রেসিডেন্টের সহিত তাঁর কি কথা হইল? তিনি হাতের ধাক্কায় আমার কথাটা উড়াইয়া দিলেন। বলিলেন : ওটা কিছু না, সব মিটিয়া গিয়াছে।
