সুতরাং পশ্চিম পাকিস্তানের সব প্রদেশের সকল দলের নেতারা সেই এক ইউনিট ভাংগিয়া দিবার প্রস্তাব কায় আওয়ামী লীগের এবং পূর্ব-পাকিস্তানীদের স্কুল দৃষ্টিতে খুশী হওয়ার কথা। খুশী হইলামও। কিন্তু আমাদের নেতা প্রধানমন্ত্রী সহরাওয়াদী আমাদের বিবেচনায় বিস্ময়কর রূপে উন্টা বুঝিলেন। এ সম্পর্কে কথাবার্তা ও আলাপ-আলোচনা আগে হইতে চলিতে থাকিলেও সরকারী দল, রিপাবলিকান পার্টি ও অপযিশন দল মুসলিম লীগ পার্টি একমত হইয়া যখন ফরম্যালি এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন, তখন প্রধানমন্ত্রী ও আমরা কতিপয় পূর্ব-পাকিস্তানী মন্ত্রী পূর্ব-বাংলা সফর করিতেছি। এই সংবাদ খবরের কাগযে প্রকাশ হওয়ার দুই একদিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী করাচি ফিরিয়া গেলেন। পূর্ব-পাকিস্তান হইতে প্রধানমন্ত্রীর বিদায়-উপলক্ষে আমিও মফস্সল হইতে ঢাকায় ফিরিয়া আসিলাম। পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান সাহেবও প্রধানমন্ত্রীর বিদায়-প্রাক্কালে গবর্নমেন্ট হাউসে উপস্থিত থাকিলেন। আমাদের কথাবার্তায় স্বভাবতঃই পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের ঐ প্রস্তাবের কথা উঠিল। প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ করিলেন যে প্রেসিডেন্টের সহিত তাঁর এ ব্যাপারে চূড়ান্ত আলাপ-আলোচনা হইয়া গিয়াছে। করাচি ফিরিবার পরই প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী একই সময়ে এ বিষয়ে রেডিও ব্রডকাস্ট করিবেন।
এমন রাজনৈতিক ব্যাপারে মির্যার নাম শুনিয়া আমি ঘাবড়াইয়া গেলাম। কারণ এ ব্যাপারে মির্যা ষড়যন্ত্র করিতেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে ভূল বুঝাইবার সাধ্যমত চেষ্টা করিতেছেন, এসব কথা আমি অনেকের মুখে, এমনকি কোনও-কোনও সহকর্মী মন্ত্রীর মুখেই শুনিয়াছিলাম। কাজেই আমি স্বভাবতঃই কৌতূহলী হইয়া প্রশ্ন করিলাম : প্রস্তাবিত ব্রডকাস্টে তাঁরা কি বলিবেন? প্রধানমন্ত্রী জানাইলেনঃ প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই ইউনিট ভাংগিবার বিরোধিতা করিবেন। আমার আশংকা সত্য হইল। গবর্নমেন্ট হাউসে উপস্থিত আমরা সকলে সমবেতভাবে প্রধানমন্ত্রীকে এই ধরনের রেডিও-বক্তৃতা হইতে বিরত থাকিতে অনুরোধ করিলাম। অনেক যুক্তি-তর্ক দিলাম! প্রধানমন্ত্রী অটল রহিলেন। প্রেসিডেন্টের সহিত তাঁর কথা হইয়া গিয়াছে। তাঁর সাথে ত তিনি ওয়াদা খেলাফ করিতে পারেন না। অতঃপর আমরা মির্যার ষড়যন্ত্রের কথা বলিলাম। প্রমাণাদি পেশ করিলাম। তাঁকে খানিকটা নরম লাগিলেও আমার আশংকা দূর হইল না। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে চড়িয়া আমি এয়ারপোর্টতক তাঁর সাথে গেলাম। তাঁর হাত চাপিয়া ধরিয়া কাকুতি-মিনতি করিয়া দুইটা অনুরোধ করিলাম। প্রথম, তিনি কেবিনেটে আলোচনা না করিয়া রেডিও-ব্রডকাস্ট করিবেন না। দুই, করাচি এয়ারপোর্টে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলিবেন? এ ব্যাপারে পশ্চিম পাকিস্তানী জনগণের রায়-মতই কাজ হইবে। প্রধানমন্ত্রী আমাকে ধমক দিলেন : ‘তুমি আমাকে রাজনীতি শিখাইতে আসিয়াছ? কি ভাবে সাংবাদিকদেরে ফেস্ করিতে হয়, তাও তুমি আমাকে শিখাইবে? লিডারকে আমি চিনি। তিনি আমার উপর এমন রাগও করেন, আবার কথাও মানেন। আমি তাঁর ধমকে রাগ বা গোস্বা না করিয়া হাসিয়া বলিলাম : আপনেরে আমি কি শিখাইব? আপনার কাছে আমি যা শিখিয়াছি, তাই আপনেরে স্মরণ করাইয়া দিতেছি মাত্র। তিনি তাঁর স্বাভাবিক আকর্ণ-বিস্তৃত নিঃশব্দ হাসি হাসিয়া বলিলেন : আগের কথা ভুলিয়া যাও আবুল মনসুর, এখন আমি মনে করি, এক-ইউনিট ভাংগিবার অর্থ পাকিস্তান ভাংগিয়া যাওয়া। আমি স্তষ্ঠিত হইলাম। এই ভাষা আমার কাছে চিনা লাগিল। মনে পড়িল প্রেসিডেন্ট-হাউসে প্রেসিডেন্ট মির্যা ও ডাঃ খান সাহেবের মুখে এই ভাষাই শুনিয়াছিলাম। লিডার তবে সত্য-সত্যই মির্যার খপ্পরে পড়িয়াছেন! আমি মির্যার বিরুদ্ধে অনেক কথা বলিলাম। তার মধ্যে এও বলিলাম যে মির্যা শুধু প্রধানমন্ত্রীকে দিয়াই বক্তৃতা করাইবেন; অসুখ বিসুক বা অন্য কোনও অজুহাতে তিনি গা ঢাকা দিবেন। কথাটা আমি নিতান্ত যিদের বশে বলিলাম। নিজেও ওতে বিশ্বাস করি নাই। কাজেই প্রধানমন্ত্রী আমাকে বধ্যৎবলিয়া উড়াইয়া দিলেন। তবু আমি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অর্থাৎ বিমানের সিঁড়িতে খানিকদূর আগাইয়া মুসাফের সময় খুব জোরে হাত চাপিয়া বলিলাম : স্যার, আমার অনুরোধ দুইটা রক্ষা করিবেন। তিনি যেন হাতের ধাক্কায় আমার শেষ কথাটা মাটিতে ফেলিয়া দিয়া সেই হাতই আরও উঁচা করিয়া সালাম দিতে-দিতে জাহাজে ঢুকিয়া পড়িলেন। আমি মনে-মনে অস্বস্তি বোধ করিতে লাগিলাম। নিশ্চয় লিডার মির্যার খপ্পরে পড়িয়া একটা কাণ্ড করিয়া বসিবেন। এই সময় আমরা পূর্ব-পাকিস্তানী মন্ত্রীরা প্রায় সবাই টুওরেছিলাম। বন্ধুবর যহিরুদ্দিনকে ব্যাপার বুঝাইয়া করাচি পাঠাইলাম পরদিনই। তিনি মুহূর্তকাল বিলম্ব না করিয়া চলিয়া গেলেন। প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি হইতে টেলিফোনযোগে আমাকে জানাইলেন : আশংকিত বিপদের সম্ভাবনা কতকটা দূর হইয়াছে। কারণ প্রধানমন্ত্রী জ্বরে শয্যাগত। রেডিও-বক্তৃতা করা সম্ভব নয়।
কতকটা আশ্বস্ত হইলাম। লিডারের কাছছাড়া না হইতে বন্ধুকে উপদেশ দিলাম। পরবর্তী টেলিফোনেই আবার চিন্তিত হইলাম। যহিরুদ্দিন জানাইলেন, রেডিও পাকিস্তানের যন্ত্রপাতি ও কর্মচারিরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে হাযির।
