৩. চেষ্টা ব্যর্থ
প্রাইম মিনিস্টার আসিলেন। হাসিহীন গম্ভীর মুখে বসিলেন। এটা-ওটা দুই-এক কথা বলিলেন। তারপর বস্ত্রপাতের মত ঘোষণা করিলেন যে প্রস্তাবিত কোয়েলিশন আপাততঃ সম্ভব নয়। পাবলিকও এটা চায় না। তিনি নিজেও চিন্তা করিয়া দেখিয়াছেন, এটা উচিৎ হইবে না। প্রাইম মিনিস্টারের কথায় ফাইনালিটি মানে চূড়ান্তের সুর মালুম হইল। আমি বুঝিলাম ইতিমধ্যে প্রাইম মিনিস্টারকে অন্যরূপ বুঝাইতে কেউ সমর্থ হইয়াছেন। প্রাইম মিনিস্টার আমাদের সুপ্রিম নেতা। তাঁর অনিচ্ছায় কিছু হইবেও না। তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কে, এস, পি, র-ও আমাদের দলে আসা উচিৎ নয় তাঁদের মর্যাদার দিক হইতেও না, আমাদের ঐক্য-সংহতির দিক হইতেও না। সুজাং আমাদের এতদিনের চেষ্টা ও পরিশ্রম ব্যর্থ হইল। বুঝিলাম কে, এস. পির সাথে শুধু আপাতত নয়, ভবিষ্যতেও কোনও দিন কোয়েলিশন করার সম্ভাবনা তিব্লোহিত হইল। কিন্তু এসবই আমাদের দিককার কথা। ওঁদের দিককার কথাও ত ভাবিতে হইবে। কে.এস. পি. নেতারা যে নিজেদের দল ভাংগিয়া আমাদের সাথে কোয়েলিশনে তাঁদের মেজরিটি মেম্বরকে রাযী করিয়াছেন, আজ যে তাঁরা ত্রিশ পঁয়ত্রিশ জন মেম্বরকে একত্রে করিয়া আমাদের লিডারের সামনে হাষির করিতে পারিয়াছেন, তার একমাত্র সুস্পষ্ট কারণ এই যে ভীরা নিজেদের সমর্থকদের কাছে প্রাইম মিনিস্টারের-দেওয়া নিশ্চিত পাকা কথাই জানাইয়াছেন। সুহরাওয়ার্দী একবার কথা দিলে তার আর দুল করেন না, এটা সবার স্বীকৃত সত্য। সেই বিশ্বাসেই ঐ মেম্বাররা আজ এখানে উপস্থিত। প্রাইম মিনিস্টার যে-সুরে ও যে-ধরনে কথাটা উড়াইয়া দিলেন, তাতে সকলেই বুঝিলেন তিনি কাকেও কোনও কথা দেন নাই পাকা কথা ত দূরের কথা। আমি কলনা-নেত্রে দেখিলাম, এখান হইতে বাহিরে গিয়াই কে এস পি মেম্বরেরা তাঁদের নেতাদের ধরিবেন। বলিবেনঃ ‘শহীদ সাহেব ত মিথ্যা বলিতে পারেন না। আপনারাই আমাদেরে ব্লাফ দিয়া এতদিন ঘুরাইয়াছেন। আজ এখানে আনিয়া অপমান করিয়াছেন। অনুসারীদের আস্থা হারানো নেতাদের পক্ষে চরম শাস্তি। কে এস পির যে সব নেতা এতদিন আমাদের সাথে বন্ধুত্ব করিবার আন্তরিক চেষ্টা করিলেন, তাঁদেরে বন্ধুত্ব দিতে পারিলাম না বটে, কিন্তু নিজেদের অনুসারীদের দিয়া তাঁদেরে অপমান করাইবার কোনও অধিকার আমাদের নাই। আমার বিবেক চিল্লাইয়া উঠিল : এদেরে অন্যায় অভিযোগ ও অনুচিত, অপমান হইতে বাঁচাও।
আমি আমার লিডারের আস্থা ও মন্ত্রিত্ব হারাইবার একটা রিস্ক নিলাম। প্রধানমন্ত্রীর, ঐ ধরনের কথার প্রতিবাদে কেউ যখন কথা বলিলেন না, কে এস. পি. নেতাদের যে কথা বলিবার সম্পূর্ণ অধিকার থাকা সত্ত্বেও শুধু ভদ্রতার খাতিরে অথবা বিস্ময়ে বলিতে পারিলেন না, তখন সেই কথাটা বলিবার দায়িত্ব নিলাম আমি। আমি প্রধানমন্ত্রীর পাশ ঘেষিয়া বসিয়াছিলাম। সকলে আমার সরু গলা শুনিতে নাও পারেন সেই আশংকায় আমি ঐ বসা মজলিসেই দাঁড়াইলাম এবং বলিলাম : তবে কি আমরা বুঝিব, প্রাইম মিনিস্টার তাঁর গত কয়দিনের ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি হইতে সরিয়া গিয়াছেন? তিনি ইচ্ছা না করিলে কিছু হইবে না ঠিক, কিন্তু এটা সকলের জানা দরকার যে প্রাইম মিনিস্টার কেএসপির সাথে আপোস করিতে চাহিয়াছিলেন এবং তাঁর কথামতই আজ এরা এই বৈঠকে হাযির হইয়াছেন। প্রধানমন্ত্রী আমার কথার প্রতিবাদ করিলেন না? ’হ্যাঁ’ ‘না’ কিছু বলিলেনও না। কিন্তু তাতেই আমার কাজ হইয়া গেল। কৃষক-শ্রমিক নেতাদেরে তাঁদের সমর্থকদের হামলা হইতে বানোই আমার উদ্দেশ্য ছিল। সে উদ্দেশ্য সফল হইল। অতঃপর প্রধানমন্ত্রী করাচি যাওয়ার জন্য বিমান বন্দরেরওয়ানা হইলেন। আমি বুঝিলাম, বিপদ আসন্ন।
৪. ইউনিট সম্পর্কে ভ্রান্ত নীতি
কয়েক মাসের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্টের আরেক খপ্পরে পড়িলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশগুলির জনমত যাচাই না করিয়াই উহাদিগকে ভাংগিয়া এক প্রদেশ করা হইয়াছিল। কাজেই সেখানকার অসন্তোষ ছাই-চাপা আগুনের মত ধিকিধিকি জ্বলিতেছিল। সুহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার আমলে যথেষ্ট দেওয়ানী আযাদির আবহাওয়া বিদ্যমান থাকায় ঐ ব্যাপারে প্রবল জনমত ফাটিয়া পড়িল। জনগণের চাপে আইন-পরিষদের মেম্বাররাও এক ইউনিট ভাংগিয়া প্রদেশগুলির পূনঃ প্রবর্তনের পক্ষে মত দিলেন। এই সময় রিপাবলিকান পার্টিই পশ্চিম পাকিস্তানের রুলিং পার্টি। এই পার্টির এক সভায় জাবেদা ভাবে এক-ইউনিট ভাংগিয়া স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশগুলি পুনঃ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গৃহীত হইল। এই দেখিয়া অপযিশন পার্টি মুসলিম লীগ দলও ঐ একই রকম প্রস্তাব গ্রহণ করিলেন। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের তিনটি পার্লামেন্টারি দল যথা মুসলিম লীগ, রিপাবলিকান ও ন্যাপ সকলেই একমত হইয়া পরিষদে এক-ইউনিট ভাংগার পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করিলেন। এক-ইউনিট করার সময় আওয়ামী লীগ উহার বিরোধিতা করিয়াছিল। তাদের যুক্তি ছিল অগণতান্ত্রিক পন্থায় ঐ ব্যবস্থা মাইনরিটি প্রদেশসমূহের উপর চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছে। আওয়ামী লীগ বরাবর বলিয়াছে, ব্যাপারটা সম্পূর্ণরূপে পশ্চিম পাকিস্তানীদের ব্যাপার। পূর্ব পাকিস্তানীরা উহাতে সম্পর্কিত শুধু এই কারণে যে যদিও পূর্ব-পাকিস্তানীদের মোকাবিলা পশ্চিম-পাকিস্তানের সকল প্রদেশকে সংঘবদ্ধ করিবার সংকীর্ণ উদ্দেশ্য হইতেই পাঞ্জাবী নেতারা ও অফিসাররা এই ফন্দি আবিষ্কার করিয়াছিলেন, তথাপি পশ্চিম পাকিস্তানের একটি যোনাল ফেডারেশন-গোছের ঐক্যবদ্ধতা লাহোর প্রস্তাব ভিত্তিক পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের সহিত অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।
