সুহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার পতনে আর কোনও ক্ষতি না হউক যুক্ত নির্বাচন-প্রথার ভিত্তিতে আসন্ন সাধারণ নির্বাচন বানচাল হইবে এবং তাতে প্যারিটি-শৃংখলিত পূর্ব পাকিস্তানের সমূহ ক্ষতি হইবে, একথা চিন্তা করিয়া পূর্ব-বাংলার জনসাধারণ, বিশেষ করিয়া কৃষক-শ্রমিক পার্টির অধিকসংখ্যক মেম্বর, বিচলিত হইলেন। হক সাহেব তখন পূর্ব-পাকিস্তানের গবর্নর। সুহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার শক্তিহ্রাস ও পতনের সম্ভাবনায় তিনিও বিচলিত হইলেন। শহীদ সাহেবের সহিত তাঁর বহুদিনের ব্যক্তিগত শত্রুতার কথা ভুলিয়া তিনি তাঁর কৃষক-শ্রমিক পার্টির মেম্বারদের শহীদ সাহেবের সহিত আপোস করিবার উপদেশ দিলেন। তাঁদের একদল প্রতিনিধি করাচি গিয়া প্রধানমন্ত্রীর সহিত আলোচনা করিলেন। সুহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার ও আওয়ামী লীগের আসন্ন বিপদের অতিরিক্ত সুযোগ লইয়া তাঁরা একটু বেশী দাম হাকিলেন। সাবেক যুক্তফ্রন্টের পযিশনে ফিরিয়া যাইবার দাবি করিলেন। প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মুজিবুর রহমান ও আমি এই আলোচনায় শরিক ছিলাম। শহীদ সাহেব আশাতিরিক্ত কুটনৈতিক ভাষায় তাঁদেরে বিদায় করিলেন। তাঁর উপর মুজিবুর রহমান তাঁদের সাথে ভাল ব্যবহার না করায় তাঁরা স্বভাবতঃই রাগ করিয়া ফিরিয়া আসিতেছিলেন। আমি নিতান্ত বন্ধভাবে তাঁদেরে তাঁদের চড়া দাবি ত্যাগ করিয়া বাস্তববাদী হইতে উপদেশ দিলাম। প্রতিনিধি দলের মধ্যে অ-মেম্বর আমার বিশেষ বন্ধু মিঃ রেযায়ে-করিমও ছিলেন। তিনি আমার কথার মর্ম বুঝিলেন। ঢাকায় ফিরিয়া আসিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এই আপোস-ফরমূলার অনুমোদন চাহিলেন। কৃষক-শ্রমিক পার্টির মধ্যে ভাংগন আসিল। জনাব আবু হোসেন সরকারকে অপসারিত করিয়া তাঁর স্থলে মিঃ সৈয়দ আযিযুল হককে (নান্না মিয়া)। পার্টির নয়া লিডার করা হইল। আওয়ামী লীগের সহিত আপোস বিরোধীরা সরকার সাহেবের নেতৃত্বে আলাদা পার্টি করিলেন।
২. আত্মরক্ষার চেষ্টা
এরপর আওয়ামী লীগ পক্ষ হইতে আনুষ্ঠানিকভাবে আলাপ-আলোচনা চালান হইল। লিডারের অনুমতিক্রমে আমি ঢাকা আসিলাম। আতাউর রহমান, মুজিবুর রহমান, মানিক মিয়া ও আমি সকলেই আলোচনায় অংশ গ্রহণ করিলাম। মানিক মিয়া ও আমি চৰ্বিশ ঘন্টা ব্যস্ত থাকিলাম। বন্ধু রেযায়ে-করিমের বাড়িতে রোজ রাত্রে আলাপ-আলোচনা চলিতে লাগিল। কৃষক-শ্রমিক পার্টির নেতারা বিশেষতঃ নান্না মিয়া ও মোহন মিয়া প্রশংসনীয় বাস্তব-বুদ্ধির পরিচয় দিলেন। এরূপ বিনাশর্তে তাঁরা আওয়ামী লীগ কোয়েলিশনে যোগ দিতে রাযী হইলেন। কথা হইল লিডারের পছন্দমত কে, এস, পি.র দুই-একজনকে মন্ত্রী নিবেন। আগামী নির্বাচনে কৃষক-শ্রমিক পার্টি তাঁদের মনোনীত প্রার্থীর তালিকা লিডারের নিকট পেশ করিবেন। লিডারের সিলেকশনই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হইবে। এই কোয়েলিশনের ফলে এই মুহূর্তে অন্ততঃ ত্রিশ পঁয়ত্রিশ জন (চল্লিশও হইতে পারে) মেম্বর আওয়ামী কোয়েলিশনে যোগ দিবেন। তাতে আতাউর রহমান সরকারের স্থায়িত্ব নিরাপদ হইবো ন্যাপ দলের অনিশ্চিত সমর্থনের কোনও দরকারই থাকিবে না। অধিকন্তু আওয়ামী লীগ কোয়েলিশন নিরংকুশ মুসলিম মেজরিটির দল হইবে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় এরও প্রয়োজন দেখা দিয়াছিল। এই ভাবে সব ঠিক হইয়া যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় আসিলেন। গবর্নমেন্ট হাউসে উঠিলেন। তাঁর কাছে আমরা বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করিলাম। কিন্তু বলিলেন : কৃষক-শ্রমিক পার্টিকে কোয়েলিশনে আনিয়া এটাকে নিরংকুশ মুসলিম মেজরিটির দল করিতেছি দেখিয়া হিন্দু মেম্বররা তুল না বুঝেন, সে জন্য তাঁদের মত লওয়া আমি উচিৎ মনে করি। আমরা সোল্লাসে তাতে সায় দিলাম। কারণ আমরা ইতিমধ্যেই আলোচনার গতিধারা সম্বন্ধে হিন্দু মন্ত্রীদের অবহিত করিয়া রাখিয়াছি। তাঁরা জানিতেন কৃষক শ্রমিক পার্টি আওয়ামী লীগের মতই সেকিউলারি দল। কাজেই তাঁদের কোন আপত্তি ছিল না। লিডার হিন্দুদের মধ্যে ধীরেন বাবু ও মনোরঞ্জন বাবুর সাথে আমাদের সামনেই আলোচনা করিলেন। তাঁরা সাগ্রহে এ ব্যবস্থায় সম্মতি দিলেন। তফসিলী হিন্দু মন্ত্রীদ্বয়ের মত আছে, তাও লিডারকে জানান হইল। তিনি প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমানকে বলিয়া দিলেনঃ ‘সবঠিক হইয়া গেল। এখন ব্যবস্থার ব্যবস্থা কার’ মানে কবে-তক কাকে কাকে মন্ত্রীর শপথ দেওয়া হইবে তার ব্যবস্থা কর, আমি এই কথাই বুঝিলাম। কৃষক-শ্রমিক পার্টির নেতাদেরেও তাই বলিয়া দেওয়া হইল। নান্না মিয়ারা গবর্নমেন্ট হাউসের হক সাহেবের দখলে হাযিরই ছিলেন। তাঁরাও সুখবরটা গবর্নরকে দিতে গেলেন। প্রাইম মিনিস্টার সিলেট ও যশোহর ভ্রমণে গেলেন। আমরাও যার-তার কাজে গেলাম।
নির্ধারিত দিনে চিফ মিনিস্টারের পলিটিক্যাল সেক্রেটারি মিঃ যমিরুদ্দিন আহমদের বাসায় বৈঠক বসিল। কৃষক-শ্রমিক পার্টির নেতারা তাঁদের সংখ্যা শক্তির প্রমাণ স্বরূপ প্রায় ত্রিশজন মেম্বর লইয়া বৈঠকে উপস্থিত থাকিলেন। আমাদের পার্টির কারো মনে যদি কোনও দ্বিধা-সন্দেহ থাকিয়াও থাকে, তবে তাঁদের এই সংখ্যা শক্তি প্রদর্শনের পরে তাঁদের দ্বিধা নিশ্চয় দূর হইবে এবং আজই কোয়েলিশন ঘোষণা ও ওঁদের মধ্য হইতে দুই-এক জন মন্ত্রী শপথ গ্রহণ করা হইবে, এ সম্পর্কে আমার নিজের এবং উপস্থিত অনেকের আর কোনও সন্দেহ থাকিল না। আমাদেরই মনের অবস্থা যখন এই, তখন কে, এস. পি. নেতাদের মনোভাব সহজেই অনুমেয়। আমরা সকলে গলা লম্বা ও কান খাড়া করিয়া প্রাইম মিনিস্টারের অপেক্ষা করিতে লাগিলাম।
