লিডারের মত তীক্ষ্ণ-বুদ্ধি লোককে কেউ কুবুদ্ধি দিয়া বিপথগামী করিতে পারে, বিশেষতঃ আফতাব আহমদের মত লোক। এটা আমি বিশ্বাস করিতে পারিলাম না। কিন্তু এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট যেরূপ অনাবশ্যক দৃঢ়তা দেখাইলেন তাতে আমি তাঁর কথা উড়াইয়াও দিতে পারিলাম না। কারণ গত কিছুদিন হইতে বাজারে খুব জোর গুজব রটিতেছিল যে সুহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার পতন আসন্ন। প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান ও মুসলিম লীগ পার্টির মধ্যে আপোস করাইয়া দিয়া সুহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার বদলে মুসলিম লীগ গবর্নমেন্ট গঠন করিবার চেষ্টা করিতেছেন। কথাটা লিডার ফুৎকারে উড়াইয়া দিলেও আমি তা পারিলাম না। মির্যাই মুসলিম লীগ দল ভাংগিয়া রিপাবলিকান দল করিয়াছিলেন। সেটা আবার জোড়া দেওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব নাও হইতে পারে। আমি আফতাব আহমদের কথাটা অতি সাবধানে তুলিলাম। তাঁকে সরাইয়া প্রেসিডেন্টকে খুশী রাখিতে দোষ কি? আফতাব আহমদকে আপাততঃ একটা ভাল পদ দিয়া অন্যত্র পাঠাইলে আফতাবের তাতে আপত্তি হইবে না। কারণ তিনি সত্য সত্যই লিডারের ভক্ত ও হিতৈষী।
লিডার রাযী হইলেন না। তিনি আমাকে বুঝাইলেন : ওটা আসলে আফতাব আহমদকে সরাইবার দাবি নয়। ওটা ছুরির ধারাল দিকঃ থিন এণ্ড অব দি এইজ। এই দিনই লিডার আমাকে ঈশারায় জানাইলেন, আমার হাত হইতে শিল্প-বাণিজ্য দফতর নিয়া কোনও পশ্চিম পাকিস্তানী মন্ত্রীকে দেওয়াই মির্যার পরিণামের দাবি। আমি তখন বলিলাম : মির্যাকে হাতে রাখিবার জন্য প্রয়োজন হইলে আমার দফতর ত দফতর আমাকেই তাঁর সরাইয়া দেওয়া উচিৎ। কারণ যুক্ত-নির্বাচন প্রথায় সাধারণ নির্বাচনের জন্য তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব ‘অপরিহার্য’। লিডার জবাবে বলিলেন : এটা প্রিন্সিপালের কথাও বটে। প্রধানমন্ত্রী কাকে তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি রাখিবেন, প্রেসিডেন্ট তাতে হস্তক্ষেপ করিতে পারেন না। এটা মানিয়া নিলে ইতিহাস তাঁকে মাফ করিবে না। লিডার তাঁর পনে অটল থাকিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই দিককার অনমনীয়তায় মির্যা অন্য দিকে শক্ত হইলেন। তিনি রিপাবলিকান পার্টির অধিকাংশকে দিয়া দাবি উঠাইলেন গবর্নর গুরমানীকে সরাইতে হইবে। পশ্চিম পাকিস্তানের রুলিং পার্টি প্রাদেশিক রিপাবলিকান পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করিলেন যে গুরমানী গবর্নর থাকিলে মন্ত্রিসভার কাজ সুষ্ঠুভাবে চালান অসম্ভব।
আমরা সকলেই বুঝিলাম, মির্যাই এই দাবির গোড়ায় আছেন। আফতাব আহমদকে সরাইতে না পারিয়া তিনি একেবারে মূলোচ্ছেদ করিবার ব্যবস্থাকরিয়াছেন। কিন্তু জানিয়া-বুঝিয়াও কিছু করিবার উপায় ছিল না। প্রধানমন্ত্রী নিজের দায়িত্বে কিছু করিতে রাযী না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা কেবিনেটে দিলেন। রিপাবলিকানদের তয় ছিল আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা কেহ তাঁদেরে সমর্থন করিবেন না। কিন্তু কেবিনেট মিটিং-এ আমিই এ বিষয়ে প্রথম কথা বলিলাম এবং গুরমানীকে অপসারণের প্রস্তাব সমর্থন করিলাম। আমার যুক্তি ছিল শাসনতান্ত্রিক। পার্লামেন্টারি শাসন-ব্যবস্থায় প্রাদেশিক গবর্নরকে অবশ্যই মন্ত্রিসভার আস্থাভাজন হইতে হইবে। এর পরে এ বিষয়ে একমাত্র সর্দার আমিরে আযম ছাড়া আর কেউ বিরুদ্ধতা করিলেন না। তিনি শেষ পর্যন্ত এই ইশুতে পদত্যাগই করিলেন। কারণ তিনি গুরমানীর একজন খাঁটি অনুরক্ত লোক ছিলেন। যা হোক মানী সাহেবকে অপসারণের প্রস্তাব প্রায় সর্বসম্মতরূপে গৃহীত হইল। আমার সমর্থনের অর্থ রিপাবলিকান বন্ধুরা এই করিলেন যে প্রধানমন্ত্রীর গোপন ইংগিতেই আমি এটা করিয়াছি। তাতে লাভই হইল। রিপাবলিকান বন্ধুরা লিডারের উপর আস্থাবান হইয়া উঠিলেন।
শান্তিতেই দিন কাটিতে লাগিল। গুজব শান্ত হইল।
২৭. ওযারতি লস্ট
ওযারতি লস্ট
সাতাইশা অধ্যায়
১. সুহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার বিপদ
১৯৫৭ সালের জুলাই মাসের শেষদিকে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠিত হয়। আওয়ামী লীগ পার্টির দলত্যাগী কতিপয় সদস্য, গণতন্ত্রী দলের কর্মকর্তা এবং বামপন্থী হিন্দু সদস্যদের কতিপয় লইয়া আইন-পরিষদের মধ্যেও জন-ত্রিশেক সদস্যের ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠিত হইল। এঁদের সকলেই আতাউর রহমান মন্ত্রিসভার সমর্থক ছিলেন। আওয়ামী লীগের সহিত ঝগড়া করিয়া মওলানা ভাসানী এই নূতন দল করায় এই দল সরকার-বিরোধী হইবে, স্বভাবতঃই লোকের মনে এই আশংকা হইল। ন্যাশনাল এসেন্নির একজন আওয়ামী সদস্য এই নতুন দলে যোগ দেওয়ায় কেন্দ্রেও আওয়ামী লীগ অন্ততঃ এক ভোটে দূর্বল হইল, এটাও লোজনের চোখ এড়াইল না। জুন মাসের শেষ দিক হইতেই কেন্দ্রে শহীদ মন্ত্রিসভার পনের গুজব কোথা হইতে যেন রটান হইতেছিল। আওয়ামী লীগের এই ভাংগনে এবং আইন-সভায় আওয়ামী লীগের শক্তি হ্রাসের ফলে এই গুজবে আরও ইন যোগান হইল। অনেকগুলি উপ-নির্বাচন সামনে লইয়াই মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগকে এই আঘাত করিয়াছিলেন। তার কয়েকটিতে মওলানা নিজস্ব প্রার্থী খাড়া করিয়া আওয়ামী লীগের মোকাবিলাও করিলেন। কিন্তু সব কয়টিতে আওয়ামী লীগ জিতিল। কাজেই আইন সভার বাহিরে আপাততঃ কোনও বিপদ নাই, আমাদের এবং লোকজনেরও এই আশা হইল। কিন্তু মন্ত্রিসভার বিপদ ঘটে নাই। বিশেষতঃ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বিপদ।
