পরিদর্শন শেষে গেটে আসিয়া যা দেখিলাম তাতে আমার ভাল জিভ লাগিয়া গেল। দুইটা ট্রাক কাপড়ের বড় বড় প্যাকেটে আধ-বুঝাই।
আমি বোধ হয় রসিকতার লোভ সরণ করিতে না পারিয়া বলিলাম : বেগম সাহেবা ও সাহেবের কাপড়গুলির জায়গা এক ট্রাকেই হইত। দুইটায় দেওয়াটকি কোন বিশেষকারণআছে?
আমার রসিকতার জবাবে মিল-মালিক বলিলেন : ‘মেহমান ও তাঁর বেগমের কাপড় এক ট্রাকেই দেওয়া হইয়াছে। দ্বিতীয় ট্রাকের কাপড় মেহমানের নয়, আপনার।‘
আমি বিস্মিত হইলাম। রাগ সামলাইতে পারিলাম না। বলিলাম : আমাকে কাপড় কেন? আমি কি মেহমান? আমি এ কাপড় নিব না। ট্রাক হইতে মাল নামাইয়া ফেলুন।
মিল-মালিক অনেক চাপাচাপি করিলেন। বিস্ময়ের কথা এই যে মেহমানও সে অনুরোধে যোগ দিলেন। বলিলেন : আপনি না নিলে আমিও নিতে পারি না।
মনে-মনে বলিলাম : না নিলেই ভাল করিতেন। মুখে বলিলাম : না না আপনার কেস ও আমার কে সম্পূর্ণ আলাদা। আপনি মেহমান আর আমি এদের মন্ত্রী।
শেষ পর্যন্ত আমার যিদ বজায় রাখিলাম। আমাদের সামনেই ট্রাক হইতে ‘আমার কাপড়গুলি’ নামাইয়া রাখা হইল। তারপর আমরা আমাদের গাড়ি ছাড়িবার হুকুম দিলাম। স্পষ্ট দেখিলাম, মেহমানের মুখোনা কালা যহর হইয়া গিয়াছে।
এমনি লোকের সাথে গিয়াছিলাম আমি পূর্ব-পাকিস্তান স্বাধীন করিবার পরামর্শ করিতে। এটা মির্যার নিজস্ব বানান কথা। বরঞ্চ খোদ মির্যার কাছে আলাপে-আলাপে আমি দুই-একবার লাহোর প্রস্তাবের আক্ষরিক ব্যাখ্যা এবং বহুবচনের ‘এস’ হরফটা বাদ দেওয়ার ইতিহাস বর্ণনা করিয়াছি। হয়ত সেটাকেই বুনিয়াদ করিয়া তিনি এই কাহিনী তৈয়ার করিয়াছেন। সন্দেহ আরও দৃঢ় হইল, মির্যা কোনও প্ল্যান করিতেছেন।
এমন সময় কাটি চেম্বার-অব-কমার্সের আমাদের হিতাকাংখী একজন মেম্বর আমাকে জানাইলেন, প্রেসিডেন্ট হাউসে বসিয়া শিল্পী-বণিকরা আমার বিরুদ্ধে জোট পাকাইতেছেন। অতঃপর বন্ধুবর মাঝে-মাঝেই এইরূপ খবর দিতেন। বলিতেন আমার কার্যকলাপে তারা আগে হইতেই আমার উপর ক্ষেপা ছিলেন। মার্কিন সাহায্যের চার কোটি টাকা পূর্ব-পাকিস্তানে নিয়া যাওয়ায় তাঁরা রাগে অন্ধ হইয়া পড়িয়াছেন।
১০. লাইসেন্সের বিনিময়ে পার্টি-ফণ্ড
বন্ধুবরের খবর ক্রমেই সত্য প্রমাণিত হইতে শুরু করিল। ঝট পট কয়েকখানা ইজী সাপ্তাহিক বাহির হইল। তাতেই নানা ঢংগে প্রচার শুরু হইল : চার কোটি বিদেশী মুদ্রা এ্যাবযর্ব করিবার মত মূলধন পূর্ব পাকিস্তানীদের নাই। কাজেই চার কোটি টাকার লাইসেন্স পাইয়া পূর্ব পাকিস্তানীরা সব লাইসেন্সই বিদেশীদের কাছে বেচিয়া ফেলিবে। এই বিক্রয়টা যদি শুধু পশ্চিম পাকিস্তানীদের নিকট হইত, তা হইলে অবশ্য বলিবার বিশেষ কিছু থাকিত না। কিন্তু বিপদ এই যে পূর্ব পাকিস্তানীরা ভারতীয় ও ইউরোপীয়দের নিকট বেশী দামে লাইসেন্স বেচিয়া ফেলিবে।
এই যুক্তিটাই একটু প্রসারিত করিযা বলা হইল যে আওয়ামী লীগেরই যখন গভর্ণমেন্ট তখন সব লাইসেন্সই আওয়ামী লীগারদের মধ্যে বিতরিত হইবে। কিন্তু আওয়ামী লীগারদের মধ্যে কোনও ধনী লোক নাই। কাজেই লাইসেন্স বিক্রয় করিয়া তারা অনেক টাকা পাইরে। এই টাকা দিয়া তারা আগামী ইলেকশনে লড়িবে। সুতরাং আমদানি লাইসেন্স বিক্রয় করিয়া আওয়ামী লীগাররা পার্টি-ফণ্ড তুলিবে। ‘তুলিবে’টা অল্প দিনেই ‘তুলিতেছে’ ও পরে ‘তুলিয়াছে’ হইয়া গেল লাইসেন্স ইশু হইবার অনেক আগেই। শুধু ঐ সব সাপ্তাহিক কাগযের রিপোর্টার-সম্পাদকরাই এ ধরনের কথা বলিলেন না। পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদেরও কেউ-কেউ এই ধরনের বক্রোক্তি করিতে লাগিলেন।
তখন আমি চাটগাঁ টুওর করিতেছি। কাগযে পড়িলাম রিপাবলিকান দলের কেন্দ্রীয় নেতা ডাঃ খান সাহেব এক জনসভায় বলিয়াছেন : মন্ত্রীরা লাইসেন্স বিক্রয় করিয়া পার্টি-ফণ্ড তুলিতেছেন। করাচি ফিরিয়া প্রথম সাক্ষাতেই ডাঃ খান সাহেবকে ওটা জিগ্গাস করিলাম। তিনি দৃঢ়তার সংগে অস্বীকার করিলেন। ব্যাখ্যা করিয়া বলিলেন : করাচির এক রিপাবলিকান জনসভায় শ্রোতাদের মধ্য হইতে প্রশ্ন হইয়াছিল পার্টি ফণ্ডর কি হইবে? তহবিল ছাড়া ত কাজ করা যায় না। তারই উত্তরে ডাঃ খান সাহেব বলিয়াছেন : যার-তার পার্টি-ফণ্ড নিজেরা করিয়া লউন। আমি ত আর লাইসেন্স বিক্রয় করিয়া পার্টি-ফণ্ড তুলিতে পারি না। এটাকেই খবরের কাগযওয়ালারা ব্যাংগোক্তি মনে করিয়াছেন। তাঁর বক্তৃতা এত স্পষ্ট ছিল যে ওটাকে ভুল বুঝিবার কোনও উপায় ছিল না। মুসলিম-লীগাররা আমাদের বিরুদ্ধে কত কথা বলিবে, তাতে চঞ্চল হইবার কিছুই নাই। ডাঃ সাহেব এই প্রসংগে আফসোস করিলেনঃ পূর্ব পাকিস্তানে তবু তোমাদের নিজের একখানা খবরের কাগয় আছে। পশ্চিম পাকিস্তানে ত সবই মুসলিম লীগের।
ডাঃ খান সাহেবের কথা অবিশ্বাস করিবার কোনও কারণ ছিল না। তিনি সুহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার বা ব্যক্তিগতভাবে আমার অপসারণ চান, এরূপ মনে করিবার কোনও হেতু ছিল না।
কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট মির্যা নতুন ফেঁকড়া বাহির করিলেন। তিনি আমাকে ডাকিয়া বলিলেন : দেখ আবুল মনসুর, শহীদের সাথে আমার গরমিল হওয়ার কোনও কারণ নাই। শুধু তাঁর ঐ প্রিন্সিপাল প্রাইভেট সেক্রেটারি আফতাব আহমদটাই যত অনিষ্টের মূল। সে আসলে গুরমানীর লোক। তাকে প্রধানমন্ত্রীর দফতর হইতে তাড়াও। সব লেঠা চুকিয়া যাইবে। অন্যথায় আমাদের মধ্যেকার অশান্তি দূর হইবে না। কারণ সে প্রধানমন্ত্রীকে সব সময় কুবুদ্ধি দেয়। প্রধানমন্ত্রী তার পরামর্শেই চলেন।
