আমার মনে পড়িল প্রধানমন্ত্রীর প্রতি প্রেসিডেন্টের রাগের কারণটা। প্রধানমন্ত্রী যথাসম্ভব শীঘ সাধারণ নির্বাচন দিতে চান। প্রেসিডেন্ট নানা যুক্তিতে তাড়াহুড়া না করার উপদেশ দেন। আর তাঁর হাতের পুতুল চিফ ইলেকশন কমিশনার মিঃ এফ. এম, খাঁকে দিয়া প্রধানমন্ত্রীর সব নির্দেশ ভণ্ডুল করিয়া দেন। ভোটার তালিকা ছাপা ও ব্যালট বাক্স তৈয়ারির অসুবিধার সব যুক্তি আমরা কাজের দ্বারা খণ্ডন করিয়াছি। তবু যখন চিফ ইলেকশন কমিশনার কেবিনেটের সব সিদ্ধান্তে আপত্তি করিতে থাকিলেন, তখন তাঁকে একদিন কেবিনেট সভার মধ্যেই ডাকা হইল। দুই-এক কথার পরেই তিনি স্পষ্ট বলিয়া বসিলেন : ‘আমি প্রেসিডেন্ট ছাড়া আর কারো এলাকাধীন নই।‘ কথাটা আংশিক সত্য। তিনি প্রেসিডেন্টের নিজস্ব নিয়োজিত ব্যক্তি ঠিকই। কিন্তু সেই জোরে সাধারণ নির্বাচন ঠেকাইয়া রাখিবেন এমন অধিকার তাঁর নাই। কিন্তু আমরা জানিতাম, তাঁর এই দুঃসাহসিক আচরণের হেতু কি? কাজেই প্রেসিডেন্টের অভিপ্রায় মত প্রথমে আমি ওয়াদা করিলাম, আগামী নির্বাচনে মির্যাকেই আমরা প্রেসিডেন্ট করিব। আতাউর রহমান ও মুজিবুর রহমানকে দিয়াও এমনি ওয়াদা করাইলাম। পূর্ব পাকিস্তানী সব কয়জন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে দিয়াও এই একই আশ্বাস দেওয়াইলাম। সকলের ওয়াদা পাইবার পর তিনি যিদ ধরিলেন শহীদ সাহেবকে দিয়া এই ওয়াদা করাইতে হইবে। শহীদ সাহেব স্বভাবত এই ধরনের ওয়াদা করার বিরোধী। প্রথম প্রথম কিছুতেই তিনি এতে রাযী হইলেন না। অবশেষে আমাদের সকলের পীড়াপীড়ি অনুনয়-বিনয়ের ফলে তিনি একদিন গোপনে প্রেসিডেন্টের সাথে আলাপ করিলেন। উভয়েই সে আলাপে সন্তুষ্ট বলিয়া মনে হইল। ঐ ঘটনার কয়েকদিন মধ্যেই মির্যা সাহেব পরিষ্কাররূপে ‘নিউইয়র্ক টাইমসের’ প্রতিনিধিকে বলিয়াছিলেন : ‘প্রধানমন্ত্রী ও আমি কদাচ পরস্পরকে ছাড়িব না। শহীদ সাহেবের মত যোগ্য লোক পাকিস্তানে আর হয় নাই।‘
এরপর প্রধানমন্ত্রী শেষোক্ত লম্বা টুওরে বিদেশ গেলেন। লণ্ডন বিমানবন্দরে রিপোর্টারদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলিয়াছিলেন : ‘আগামী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য আমি দুইজন লোকের কথা ভাবিতেছি। এই সংবাদটি পড়িয়াই প্রেসিডেন্ট সকাল ব্রেলা আমাকে ডাকিলেন। আমি যাইতেই কাগটি আমার হাতে দিয়া বলিলেন : এই দেখ তোমার নেতার কাণ্ড।’ আমি অবশ্য ঐ সংবাদের নানারূপ ব্যাখ্যার চেষ্টা করিলাম। কিন্তু কোনটাই তাঁর পছন্দ হইল না। তিনি বলিলেন : ‘দুই জনের কথা বলিয়াছেন আমাকে ধাপ্লা দিবার জন্য। আসলে তিনি গুরমানীকেই প্রেসিডেন্ট করা স্থির করিয়াছেন।‘ এই প্রমানী ফোবিয়ায় তাঁকে বহু আগেই পাইয়াছে। আগেও আমরা যে আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি দিয়াছি, তা সবই এই গুরমানীর বিরুদ্ধেই। তবু প্রধানমন্ত্রীর লওনের এই উক্তিটা আমাদের আগের সব প্রতিশ্রুতি নস্যাৎ করিয়া দিল। আমি এই বলিয়া বিদায় হইলাম যে, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরার পর তাঁর সাথে এক মিনিট আলাপ করিয়াই তিনি সন্তুষ্ট হইবেন এ বিশ্বাস আমার আছে।
কিন্তু এবার শহীদ সাহেব সফর হইতে ফিরিয়া এই ব্যাপারে মিয়াকে সন্তুষ্ট করিতে পারেন নাই। আমার বিশ্বাস এই কারণেই প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এই নিন্দা-কুৎসা প্রচার শুরু করিয়াছেন। এই সব কথা লিডারের কানে তুলিব-তুলিব ভাবিতেছি, এমন সময় একদিন প্রথমে ফিযে খা নুন এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে শুনিলাম, প্রেসিডেন্ট আমার বিরুদ্ধে সাংঘাতিক কুৎসা করিয়া বেড়াইতেছেন। শুনিলাম তাঁদের উভয়ের কাছে পৃথক-পৃথক ভাবে বলিয়াছেন : কোনও এক বিদেশী প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি বলিয়াছি : পূর্ব-পাকিস্তানকে আমি স্বাধীন রাষ্ট্র করিতে চাই। যে বিদেশী প্রধানমন্ত্রীর কথা তিনি বলিলেন, মাত্র মাসখানেক আগে তিনি পাকিস্তান সফর করিতে আসিয়াছিলেন। এ্যাকটিং প্রাইম-মিনিস্টার হিসাবে স্বভাবতঃই আমাকেই তাঁর অভ্যর্থনা-অভিনন্দন দিতে হইয়াছে। তাঁকে করাচির পার্শ্ববর্তী শিল্প এলাকা-বন্দরাদি দর্শনীয় জিনিস আমাকেই দেখাইতে হইয়াছে। প্রথম-প্রথম আমার সহিত তাঁর খুবই বনিয়াছিল। আলাপ করিয়াছি অনেক ধরনের। কিন্তু ঐ বিশেষ ধরনের কথা বলিবার কোনও কারণ বা সুযোগ ঘটে নাই। সব আলাপ হইয়াছে দেশের অফিসারদের সামনে তাঁদের উপস্থিতিতে। দুইজনে একা আলাপ করিবার প্রথম সূযোগেই ভদ্রলোকের প্রতি আমার ধারণা এমন খারাপ হইয়া যায় যে পরবর্তী সময়টা তাঁর সাথে কোনও সিরিয়াস আলাপ করিতে আমার মন চায় নাই। ঘটনাটা এই একটা বড় কাপড়ের মিল পরিদর্শন করিতে গিয়াছি। এক-এক রকমের বিভিন্ন ডিযাইন ও রং-এর কাপড়ের স্টলে যাই, আর আমাদের মাননীয় মেহমান বলেন : এর কাপড়টা আমার খুব পসন্দ হইয়াছে, ঐ কাপড়টা আমার বেগম সাহেবা খুব পসন্দ করিবেন। আর মিল-মালিক মেহমানের কথায় সংগে সংগে প্রত্যেক শ্রেণীর রং ও ডিযাইনের কাপড় দুই প্রস্থ করিয়া প্যাক করিতে বলেন। মিলমালিক ফ বলেন : প্যাক কর, মাননীয় মেহমান তত বলেন : এটা আমার খুব পছন্দের। ওটা আমার বেগমের পসন্দের। বেগম সাহেবা কিন্তু তাঁর সংগে আসেন নাই। নিজের দেশেই আছেন। তবু মাননীয় মেহমান নিজের ও বেগমের নামে বিদেশে অ-অত কাপড় পসন্দ করিতে লাগিলেন। আমি বুঝিলাম পসন্দ সাহেবেরই হউক, বেগম সাহেবেরই হউক, উভয় পসন্দেরই দুই দুই প্রস্ত কাপড়ের দুইটা বিশাল বিশাল প্যাকেট করা হইতেছে সাহেব ও বেগমের জন্যই। আমি লজ্জায় মরিতে লাগিলাম। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীরা বিদেশে গিয়া এমন স্থূপাকার জিনিস পসন্দ করিয়া আনেন, এমন কথা কখনো শুনি নাই। আর কোনও বিদেশী প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা করিবার সৌভাগ্য আমার হয় নাই। এই অনভিজ্ঞতার দরুনই বোধ হয় আমি মেহমান সাহেবের এই ধুছিয়া পসন্দ করিবার কাজটা পসন্দ করিতেছিলাম না। ভদ্রলোকের চরিত্র সংইে আমার ধারণা ছোট হইয়া গেল। মনের ভাব মুখে লুকাইবার ব্যাপারে আমি কোনও দিনই বিশেষ দক্ষ ছিলাম না। এবারেও বোধ হয় তাই হইল। ভদ্রলোক বোধ হয় আমার বিরক্তি বুঝিতে পারিয়াছিলেন। তাই এর পর দুই এক বার মালিকের ‘প্যাকেট কর’ আদেশের জবাবে তিনি বলেন : ‘থাক, আর প্রকার নাই।’ মিল-মালিক বোধ হয় নিজেই ইতিমধ্যে মেহমানের অসাধারণ লোভ দেখিয়া উত্যক্ত হইয়াউঠিয়াছিলেন। তিনি ঐ ‘থাক থাক, আর দরকার নাই’ এর জবাবে যেন যিদ করিয়াই বলিলেন : আপনার দরকার না থাকিলেও আমার দরকার আছে। আপনে আমাদের সম্মানিত মেহমান ত।
