কিছু দিনের মধ্যেই কারণ বুঝিলাম। প্রধানমন্ত্রী ঠিকই করিয়াছিলেন। তিনি প্রেসিডেন্টের সম্মতি চাহিয়াছিলেন প্রেসিডেন্টের সম্মতির জন্য নয়, রিপাবলিকান সহকর্মীদের সম্মতি লইতে। কয়েক দিনের মধ্যেই রিপাবলিকান মন্ত্রীদের এক একজন করিয়া অনেকেই আমাকে জিগ্গাস করিতে লাগিলেন, আমি নাকি রুশিয়ার কাছে পাকিস্তান মর্গেজ দিবার প্রস্তাব করিয়াছি? সুবিধাজনক বার্টার বাণিজ্যের কি কদর্থ?
রিপাবলিকান ভাইদের মধ্যে সব চেয়ে বাস্তববাদী ছিলেন অর্থ-ওযির সৈয়দ আমজাদ আলী। তাঁর কাছে আগে না বলিয়া প্রেসিডেন্টের কাছে যাওয়াটাই ভুল হইয়াছে। অতএব এর পর আমি আমজাদ আলীর পিছনে লাগিলাম। তিনি শেষ পর্যন্ত কমিউনিস্ট দেশসমূহে একটি বাণিজ্য মিশন পাঠাইতে রাযী হইলেন। তবে বলিলেন তাতেও প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর অগ্রিম সম্মতি লওয়া দরকার।
আমি অতঃপর মিঃ আযিয আহমদের সাথে ব্যাপারটা আগাগোড়া ঢালিয়া বিচার করিলাম। বাণিজ্য-মিশনের আইডিয়াটা তিনি খুব পসন্দ করিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই মিশনের নেতৃত্ব করিতেও তিনি সম্মত হইলেন। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ-সফর কালে তাঁর এ্যাকটিনি করিবার সময় কেবিনেট মিটিং ডাকিয়া দিলাম। প্রেসিডেন্টও তখন নাধিয়াগলিতে বিশ্রাম করিতেছেন। আমজাদ আলী ও আযিয আহমদ আমার পক্ষে। কাজেই কোনও চিন্তা নাই। আযিয আহমদের সহিত পরামর্শ করিয়া পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান হইতে চারজন করিয়া আট জন প্রতিনিধির দল করা হইল। মিঃ আযিয আহমদ প্রতিনিধি দলের নেতা হইলেন। শেষ দিনে আমি মিঃ আযিয আহমদের উপরও একটা সারপ্রাই নিক্ষেপ করিলাম। সাপ্লাই এন্ড ডিভেলপমেন্টের ডিরেক্টর জেনারেল মিঃ বি. এ. কোরায়শীকে টেকনিক্যাল এডভাইযার হিসাবে ডেলিগেশনের সাথে জুড়িয়া দিলাম। তিনি ডেলিগেশনের মেম্বরের সমমর্যাদাসম্পন্ন হইবেন বলিয়া লিখিত আদেশ দিলাম।
এটা ছিল মিঃ কোরায়শীর সাথে আমার গোপন ষড়যন্ত্র। কোরায়শীকে আমি নিজ পুত্রের মত স্নেহ ও বিশ্বাস করিতাম। তিনিও আমাকে আপন পিতার মতই ভক্তি করিতেন এবং লোকের কাছে আমার তারিফ করিয়া বেড়াইতেন। পক্ষান্তরে মিঃ আযিয আহমদের যোগ্যতা ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে আমার বিশেষ আস্থা ছিল বটে কিন্তু কমিউনিস্ট দেশ সমূহের ব্যাপারে তাঁর বিচার-বিবেচনার নিরপেক্ষতার প্রতি আমার ততটা আস্থা ছিল না। ওদের বিরুদ্ধে মিঃ আযিয আহমদ বায়াড় বলিয়াই তখনও আমার বিশ্বাস। সেজন্য কয়েকদিন আগেই আমি মিঃ কোরায়েশীকে গোপনে ডাকিয়া মনের কথটা বলিয়াছিলাম। বলিলাম : তৌলগেশনের নেতা হিসাবে মিঃ আযিয আহমদ যে রিপোর্ট দিবেন কোরায়শী সে রিপোর্ট-নির্বিশেষে একটি বিশেষ ও সিক্রেট রিপোর্ট আমার কাছে কনফিডেনশিয়ালি দাখিল করিবেন। কোরায়শীকে প্রকারান্তরে বুঝাইয়া আযিয আহমদের রিপোর্ট নিরপেক্ষ হইবে না বলিয়া আমি সন্দেহ করি। সেজন্য এবিষয়ে নীতি নির্ধাণের ভিত্তিরূপে কোরায়শীর রিপোর্টের উপর নির্ভর করিতে চাই। কাজেই কোরায়শীর দায়িত্ব অতিশয় গুরুতর।
‘দোওয়া করিবেন যেন আপনার আস্থার মর্যাদা রক্ষা করিতে পারি।’ এই বলিয়া কোরায়শী সালাম করিয়া বিদায় লইলেন। যথাসময়ে বাণিজ্য মিশন বাহির হইয়া গেল।
মোট পাঁচ ছয়টি দেশ সফর করিবার কথা। দুইটি বাকী থাকিতেই বাণিজ্য মিশন পিছনে ফেলিয়া কোরায়শী একাই দেশে ফিরিয়া আসিলেন। আসিয়াই আমার সাথে দেখা করিলেন। বলিলেন : মিঃ আযিয আহমদ তাঁর গোয়ন্দাগিরি ধরিয়া ফেলিয়াছেন। তিন চার দেশের সফর শেষ করিয়াই তিনি কোরায়শীকে একদিন গোপনে বলেন : অনারেবল মিনিস্টার তোমাকে যে উদ্দেশ্যে পাঠাইয়াছেন, তার আর দরকার নাই। তোমাকে আর কোনও সিক্রেট রিপোর্ট দাখিল করিতে হইবে না। আমার রিপোর্টই তাঁর মনোমত হইবে। দেশে দরকারী কাজ থাকিলে তুমি এখনই দেশে ফিরিয়া যাইতে পার। গিয়া অনারেবল মিনিস্টারকে বলিও, তোমার রিপোর্টটা আমিই লিখিতেছি।
কিরূপে মিঃ আযিয আহমদ অমন গোপনীয় বিষয়টা ধরিয়া ফেলিয়াছিলেন, কোরায়শী ও আমি অনেকক্ষণ মাথা খাটাইয়াও তা আবিষ্কার করিতে পারি নাই। ফলে উভয়েই একমত হইলাম : ধন্য মিঃ আযিয আহমেদের তীক্ষ্ণ অন্তদৃষ্টি।
সত্যই মিঃ আযিয আহমদ আমার মনের মত রিপোর্টই দিয়াছিলেন। কিন্তু মিশন দেশে ফিরিবার আগেই আমাদের মন্ত্রিত্ব গিয়াছিল। কাজেই রিপোর্টটা আমার হাতে আসে নাই। আসিয়াছিল আমার পরবর্তীর কাছে। তিনি অমন কমিউনিস্ট ধরনের রিপোর্টটা হজম করিতে পারেন নাই। সেজন্য সেটা পেশ করেন প্রেসিডেন্টের কাছে। প্রেসিডেন্ট অগ্নিশর্মা হন এবং রিপোর্ট বদলাইয়া দিতে মিঃ আযিয আহমদকে অনুরোধ করেন। তিনি প্রেসিডেন্টের অনুরোধ রক্ষা করিতে অসম্মত হন। এই লইয়া করাচির রাজনৈতিক মহলে এবং খবরের কাগযের সার্কেলে খুব হৈ চৈ পড়িয়া যায়। কিন্তু আযিয আহমদ স্বমতে অটল থাকেন। বাধ্য হইয়া তকালিন মন্ত্রিসভা ঐ রিপোর্ট চাপা দিয়াছিলেন। কিন্তু পরবর্তী কালে মার্শাল লর আমলে এবং তারও পরে মিঃ আযিয আহমদের রিপোর্টের ভিত্তিতে আমাদের বাণিজ্য-নীতির যথেষ্ট পরিবর্তন হইয়াছে।
৯. সেকান্দরী খেল
কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝিলাম, প্রেসিডেন্ট মির্যা যেন কোনও নতুন খেলা শুরু করিয়াছেন। তিনি কথায়-কথায় আমার কাছে প্রধানমন্ত্রীর নিন্দা করেন। তিনি ইতিমধ্যে ইরান লেবানন তুরস্ক গিয়াছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর ‘কেলেংকারি’র জন্য আর কান পাতা যায় না। আমেরিকা হইতে তিনি অনুরূপ রিপোর্ট পাইয়াছেন। প্রধানমন্ত্রীকে হুশিয়ার করা আমাদের উচিৎ। যেন কত সাধু, মহৎ হিতৈষী ব্যক্তি শহীদ সাহেব ও ঐ সংগে আমাদের কল্যাণ-চিন্তায় ঘুমাইতে পারিতেছেন না। ভাবখানা এই। আমি প্রেসিডেন্টের এই মতি পরিবর্তনের কারণ খুঁজিতে লাগিলাম। তিনি আমার ব্যক্তিগত কল্যাণের জন্যই যেন সবচেয়ে অধীর। আমাকে তিনি বুদ্ধিমান হইবার উপদেশ দিলেন। পাগলামি ছাড়। শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের সাথে ঝগড়া করা আহাম্মকি। ওযারতি স্থায়ী জিনিস নয়। আজ আছে কাল নাই। যে কয়দিন আছ আপনা কাম বানা লো। সবকুই বানায়া। আয়েন্দা ভি সবকুই বানায়েগা। আমার মনে পড়িত বিভিন্ন লোকের জন্য তাঁর স্লিপগুলির কথা। আমি হাসিয়া বলিতাম : ‘হামকো মাফ কিজিয়ে স্যার’ আমার স্ত্রীকে তিনি আমার সামনেই বলিতেন : ‘বেগম সাব, এ পাগলগো আপ সামালিয়ে।‘
