ইতিমধ্যে আমার নীতি ঘোষণার পর চীন রুশ যুগোস্লাভিয়া চেকোস্লোভাকিয়া ইত্যাদি সমাজতন্ত্রী দেশের রাষ্ট্রদূতেরা ঘন-ঘন আমার সাক্ষাৎ চাইতে থাকেন এবং পাকিস্তানের সাথে যাঁর-তাঁর দেশের বাণিজ্য শুরু করিবার এবং বাড়াইবার নানা রূপ লোভনীয় প্রস্তাব দিতে থাকেন। এসব আলোচনার অনেক গুলিতেই মিঃ আযিয় আহমদ শামিল ছিলেন। তিনিও আকৃষ্ট হইলেন বলিয়া মনে হইল।
এসব প্রস্তাবের মধ্যে রুশিয়া ও চেকোস্লোভাকিয়ার প্রস্তাবই আমার সর্বাগ্রে বিবেচনা করিবার ইচ্ছা হইল। কারণ এদের প্রস্তাবের মধ্যে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের প্রশ্ন ছিল না। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার খুব টানাটানি। এই অভাবের কথার জবাবেই উহারা প্রথমে বাটার-সিষ্টেমে বা বিনিময়-পন্থায় বাণিজ্যের কথা বলেন। এই বার্টার সিস্টেমও পাকিস্তানের জন্য সহজসাধ্য করিবার উদ্দেশ্যে তাঁরা প্রস্তাব দেন : (১) তাঁরা পাকিস্তানের আমদানিকৃত জিনিসের দাম পাকিস্তানী মুদ্রায় গ্রহণ করিবেন এবং দামের টাকা দিয়া পাকিস্তানী জিনিস খরিদ করিয়া যার-তাঁর দেশে পাঠাইবেন। (২) ঐ টাকার পরিমাণমত পাকিস্তানী জিনিস কোনও এক বছরে সবটুকু পাওয়া না গেলে বাকী টাকায় পর বছর ঐ জিনিস খরিদ করা হইবে। যতদিন সব টাকা পাকিস্তানী জিনিস খরিদে ব্যয়িত না হইবে, ততদিন ঐ টাকা পাকিস্তান সরকারের পছন্দমত পাকিস্তানী ব্যাংকে জমা থাকিবে।
আমি এই প্রস্তাবে উল্লসিত হইলাম। উভয় দেশের প্রতিনিধিদেবেলিলাম, তাঁদের দেশ হইতে আমরা শুধু যন্ত্রপাতি আমদানি করিব। কোনও বিলাস-দ্রব্য আমদানি করিব না। ঐ যন্ত্রপাতির মধ্যেও আমি জুটলুমের উপর বেশি জোর দিলাম। বিলাতের তৈয়ারী প্রতি জুট-লুমের দাম ছিল এই সময় পঁয়তাল্লিশ হইতে পঞ্চান্ন হাজার টাকা। তাতে ঐ সময় ২৫০ লুমের একটি ক্ষুদ্রতম পাট কল বসাইতেও আমাদিগকে সোওয়া কোটি হইতে দেড়কোটি টাকা বিদেশী মুদ্রা খরচ করিতে হইত। রুশিয়া ও চেকোস্লোভাকিয়া কয়েকটি শর্তে এর প্রায় অর্ধেক দামে লুম তৈয়ার করিয়া দিতে রাযী হইল।
প্রস্তাবগুলি আমার কাছে ত লোভনীয় হইলই, মিঃ আযিয় আহমদ ও মিঃ ইউসুফও পরম উৎসাহিত হইয়া উঠিলেন। আমি খুশী হইয়া প্রধানমন্ত্রীকে সব কথা বলিলাম। তিনি প্রথমে চোখ বড় করিয়া সন্দেহ প্রকাশ করিলেন। খানিক আলাপের পর তিনি বলিলেন : এটা মস্তবড় ফরেন পলিসির কথা তা তুমি বুঝিতেই পারিতেছ। ভাল হয় যদি তুমি প্রেসিডেন্টের সাথে বিষয়টার আলোচনা কর। তবে আমার মনে হয় এ ব্যাপারে আমাদের ‘আস্তে চল’ নীতি অবলম্বন করাই উচিৎ। ওরা আমাদের ভাল করিবার জন্য অত ব্যস্ত হইয়া পড়িল কেন, সেটা চিন্তা করিতে হইবে না? ধর যদি পাকিস্তানের নিকট বিক্রয়-করা সব টাকা ওরা আমাদের ব্যাংকে জমা রাখে। চুক্তির জিনিস পাওয়া যায় না এই অজুহাতে ইচ্ছা করিয়া খরচ যদি না করে, এমনি করিয়া যদি কয়েক বছরের টাকা জমা করে এবং অবশেষে একদিন সুযোগ বুঝিয়া সবটাকা একসংগে চাইয়া বসে তবে আমাদের ব্যাংকে ‘রান’ হইয়া দেশে ইকনমিক ক্রাইসিস দেখা দিবে না?
আমি ভাবনায় পড়িলাম। আমি ফাইনান্সের কিছুই জানি না। পাবলিক ফাইনান্স ত নয়ই। পক্ষান্তরে আমার নেতা প্রধানমন্ত্রী একজন নামকরা ইকনমিক এক্সপার্ট। তিনি যা আশংকা করিয়াছেন, সব সত্য হইতে পারে। আমি ত ও-সব দিক ভাবিয়া দেখি নাই। কয়েকদিন পরে প্রেসিডেন্টের সাথে আলাপ করিব বলিয়া প্রধানমন্ত্রীর নিকট হইতে বিদায় হইলাম। পরদিনই রুশ-রাষ্ট্রদূতকে তলব করিলাম। আমাদের সন্দেহের কথা তাঁকে বলিলাম। সব শুনিয়া রাষ্ট্রদূত নিজের সরকারের সাথে আলোচনা করিবার সময় নিলেন। কয়েকদিন পরে আসিয়া বলিলেন : ‘বেশ, তবে আমরা পাকিস্তানে অর্জিত সব টাকাই বছর-বছর খরচ করিয়া ফেলিব কোনও টাকা জমা রাখিতে পারিব না। বছর-শেষে যদি কোনও টাকা অব্যয়িত থাকে, তবে তা পাকিস্তান সরকার বাযেয়াত করিতে পারিবেন।’
এবার আমার সরল মনও সন্দিগ্ধ হইল। এঁরা আমাদের এত ভাল করিতে চান কেন? কিন্তু অনেক চিন্তা করিয়াও সন্দেহের কিছু পাইলাম না। প্রধানমন্ত্রীর সহিত দেখা করিয়া সর্বশেষ প্রস্তাবটা তাঁকে শুনাইলাম। তিনি উচ্চ হাসিতে ছাত ফাটাইয়া বলিলেন : ‘সন্দেহ আরও গাঢ় হইয়াছে। তবে চল প্রেসিডেন্টের মতটাও জানা দরকার।‘ যা সন্দেহ করিয়াছিলাম, তাই হইল। প্রধান মন্ত্রী যা-যা আশংকা করিয়াছিলেন, প্রেসিডেন্টও ঠিক সেই সব সন্দেহই করিলেন। আমি যত তর্ক করিলাম, যত বলিলাম, এমন সোজা খরিদ-বিক্রির দ্বারা কমিউনিস্টরা আমাদের কি কি অনিষ্ট করিতে পারে, একটা অন্ততঃ দেখাইয়া দেন। একটাও তিনি দেখাইতে পারিলেন না। অথচ একটু নরমও হইলেন না। বরঞ্চ পাল্টা প্রশ্ন করিলেন : ‘তুমিই বা কমিউনিস্ট দেশসমূহের সংগে বাণিজ্য করিবার জন্য এত ব্যস্ত হইয়াছ কেন?’
প্রধানমন্ত্রীর চোখ-ইশারায় আমি বিরত হইলাম। আর তর্ক করিলাম না। তবু প্রেসিডেন্ট আমাকে সাবধান করিয়া দিলেন ওদিকে যেন আমি পা না বাড়াই।
আমার মনটা খারাপ হইল। এসব ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের কাছে জিগ্গাস করিতে গেলাম কেন? তাঁর কি এলাকা আছে এ ব্যাপারে? প্রধানমন্ত্রী না বলিলে আমি যাইতামও না তাঁর কাছে। প্রধানমন্ত্রীই বা গেলেন কেন গলা বাড়াইয়া প্রেসিডেন্টের সম্মতি লইতে?
