কিন্তু সেক্রোফোনে যখন কথা বলেন, তখন তিনি নরম সুরে বলেন : তা ত বটেই, সবদিক দেখিয়া-শুনিয়াই ত তোমার কাজ করিতে হইবে। প্রধানমন্ত্রীর অবর্তমানে যা-তা একটা করাও ত তোমার উচিৎ না। হাঁ, সব দেখিয়া-শুনিয়া তুমি যা ভাল বুঝ তাই কর। সম্ভব হইলে রিপাবলিকান পার্টির দাবিটা বিচার করি। ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমার সন্দেহ আরও দৃঢ় হইল। মির্যা আমার সাথেও সেই ‘চোর-গিরস্তের’ নীতি অবলম্বন করিয়াছেন। তিনি আসলে চান না যে আমি রিপাবলিকান মন্ত্রিসভা গঠনের হুকুম দেই। আমি মোটামুটি ঠিক করিয়া ফেলিলাম, গভর্নর গুরমানী যদি অনুকুল রিপোর্ট দেন, তবে আমি রিপাবলিকান মন্ত্রিসভার হুকুম দিয়া দিব। ভাবিতে-ভাবিতে গবর্নরের রিপোর্ট লইয়া স্পেশাল মেসেঞ্জার আসিয়া পড়িলেন। পড়িয়া দেখিলাম গবর্নর রিপাবলিকান পার্টির মেজরিটি দেখাইয়াছেন এবং ১৯৩ ধারা প্রত্যাহারের সুপারিশ করিয়াছেন। আমি কর্তব্য ঠিক করিয়া ফেলিলাম। কিন্তু যাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব তাঁকে জানান দরকার মনে করিলাম। আমি ওয়াশিংটনে টেলিফোন করিলাম। কোনও দিন ত এসব বড় কাজ করি নাই। একেবারে বিস্মিত হইলাম। আমার কল গেল আমাদের আর্মি হেড কোয়ার্টার পিণ্ডিতে। সেখান হইতে গেল লণ্ডনের আর্মি হেড কোয়ার্টারে। তাঁরা পাঠাইলেন ডিপ্লোমেটিক চ্যানেলে। নিউইয়র্ক বলিল ওয়াশিংটন, ওয়াশিংটন বলিল ফ্লোরিকা, ফ্লোরিডা বলিল সানফ্রানসিসকো। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে পাওয়া গেল কার্যালয়। কারণ আমি ছাড়িলাম না। প্রতিবারই আমি বলিলাম, প্রধানমন্ত্রীকে আমার চাইই। রাষ্ট্রীয় ব্যাপার। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর গলা শুনিয়া ধরে জান আসিল। কিন্তু তাঁর ধমকে গলা শুকাইয়া গেল। আমি রিপাবলিকান মেজরিটি, গবর্নরের রিপোর্ট ও আমার মত সবই বলিলাম। তিনি সব শুনিয়া বলিলেন : ‘আমার ফিরিয়া না আসা পর্যন্ত স্থগিত রাখ। আমি জোরের সংগে বলিলাম : ‘এ অবস্থায় আর স্থগিত রাখিতে পারি না।‘ তিনি বলিলেন : ‘রাখিতেই হইবে।‘ আমি বলিলাম : ‘আমি ন্যায়তঃ ও আইনতঃ এটা করিতে বাধ্য।‘ তিনি বোধ হয় চারবার ‘না’ ‘না’ ‘না’ ‘না’ বলিয়া টেলিফোন ছাড়িয়া দিলেন। আমি খটখটাইলাম। লোহালো করিলাম। লণ্ডনের এক্সচেঞ্জ আমাকে জানাইলেন, প্রধানমন্ত্রী ফোন ছাড়িয়া দিয়াছেন।
বড়ই বিপদে পড়িলাম। জিগ্গাস না করিতাম তবে সেটা ছিল আলাদা কথা। এখন তাঁর মত জিগ্গাস করিয়া তাঁর ‘না’ পাইয়া কেমনে তাঁর কথা লংঘন করি? উভয় সংকটে পড়িলাম। আইনতঃ ও ন্যায়তঃ আমি গবর্নরের রিপোর্ট মোতাবেক কাজ করিতে বাধ্য। রিপাবলিকান বন্ধুরা লিডারের হুকুম ও আমার উপদেশ মতই ‘ফিফিক্যাল ডিমনস্ট্রেশন’ করিয়াছেন। যে গবর্নরের দিকে চাহিয়া লিডার এতদিন রিপাবলিকান পার্টিকে ঠেকাইয়া রাখিয়াছেন বলিয়া বন্ধুদের অভিযোগ সেই গবর্নরই যখন নিজ হাতে সুপারিশ করিয়াছেন, তখন লিডারের আর কি করণীয় রহিল? আমি নিজের রাজনৈতিক সহকর্মী আতাউর রহমান ও মুজিবুর রহমানের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করিলাম। লিডারের আপনজন ও হিতৈষী মেয়ে ও জামাই মিসেস আখতার সোলেমান ও মিঃ সোলেমানের মত সামনা সামনি জিগ্গাস করিলাম। সকলে মত দিলেন। বিশেষতঃ মিসেস ও মিস্টার সোলেমানকে প্রেসিডেন্টের ভাবগতিকটার কথাও বলিলাম। তাঁরা আমার সন্দেহে সম্পূর্ণ একমত হইলেন।
আমি অসুস্থতার দরুন নিজের বাসায় কেবিনেট মিটিং ডাকিয়া সিদ্ধান্ত নিলাম। রিপাবলিকান বন্ধুরা স্পষ্টতঃই উল্লসিত হইলেন। কারণ প্রধানমন্ত্রীর নিষেধের কথা তাঁরা কেমনে যেন জানিয়া ফেলিয়াছিলেন।
লিডারের নিষেধের মুখে আমার এই সাহস হইবে, এটা তাঁদের বিশ্বাস হয় নাই। মিটিং শেষে তাঁরা আমাকে জড়াজড়ি করিতে এমনকি পশ্চিমী কায়দায় আমাকে চুমা দিতে লাগিলেন। সৈয়দ আমজাদ আলী উল্লাসে বলিয়া ফেলিলেনঃ “ইউ আর টুডে দি টলেস্ট ম্যান ইন পাকিস্তান।
আমাকে আগেই জানান হইয়াছিল যে ডাক্তার খান সাহেবের বদলে সর্দার আবদুর রশিদকে পার্টি-লিডার করা হইয়াছে। কাজেই যথাসময়ে লাহোরে সর্দার আবদুর রশিদের প্রধানমন্ত্রিত্বে রিপাবলিকান মন্ত্রিসভা গঠিত হইয়া গেল।
আমি ধরিয়াই নিয়াছিলাম, লিডার আমার উপর রাগ করিয়াছেন। দেশে ফিরিয়া তিনি আমাকে ধমকাইবেন। কিন্তু কিছুই তিনি বলিলেন না। বিমানবন্দরে তিনি আমাকে তাঁর গাড়িতে তুলিয়া নিলেন। ধরিয়া নিলাম, গাড়িতেই বকা দিবেন। কিন্তু কিছু না। স্বাভাবিকভাবেই সব হালহকিকত পুছ করিতে লাগিলেন। যেটা ভয় করিতেছিলাম, আভাসে-ইংগিতেও আর সেদিকে গেলেন না। আমার বুকের বোঝা নামিয়া গেল। পরে মিঃ সোলেমান একদিন বলিয়াছিলেন, লণ্ডনেই তিনি শশুরকে সব ব্যাপার বলিয়াছিলেন : সব শুনিয়া প্রধানমন্ত্রী বলিয়াছিলেন : আমি জানিতাম আবুল মনসুর ঠিক কাজই করিবে। লিডারের প্রতি শ্রদ্ধায় আমার মাথা আরো নুইয়া পড়িল।
৮. সমাজতন্ত্রী দেশে বাণিজ্য মিশন
বাণিজ্যমন্ত্রী হইবার কয়েকদিন পরেই আমি ঘোষণা করিয়াছিলাম। আমাদের বাণিজ্য-নীতি রাজনৈতিক সীমা ডিংগাইয়া যাইবে। ‘আওয়ার ট্রেড-পলিসি উইল ট্রানস্যাণ্ড পলিটিক্যাল বাউণ্ডারিয’ কথাটা বলিয়াছিলাম পাক-ভারত-বাণিজ্য চুক্তির আসন্ন আলোচনার প্রেক্ষিতে। কয়দিন পরেই এই চুক্তির মেয়াদ বাড়াইবার আলোচনা শুরু করিবার কথা। কিন্তু কথাটা আসলে শুধু পাক-ভারত বাণিজ্য চুক্তির বেলায় বলি নাই। সাধারণবাণিজ্য-নীতি হিসাবেইতালিয়াছিলাম। আমারনয়াবাণিজ্য সেক্রেটারি মিঃ আযিয় আহমদই শুধু আমার এই ঘোষণার খোলাখুলি সমালোচনা করিলেন আমারই নিকট। কিন্তু পাক-ভারত বাণিজ্য-চুক্তির আলোচনায় আমার ঐ বিঘোষিত নীতির প্রয়োগ দেখিয়া তিনি খুশী হন। ক্রমে বাণিজ্য-নীতি সম্পর্কে আমাদের মধ্যেকার আলোচনা ঘনিষ্ঠ হয়।
