তৃতীয় ঘটনা পশ্চিম পাকিস্তানে পার্লামেন্টারি সরকার পুনর্বহাল। ডাঃ খান সাহেবের প্রধানমন্ত্রিত্বে লাহোরে রিপাবলিকানমন্ত্রিসভা চলিতেছিল। ডাঃ সাহেবের মেজরিটি বিপন্ন হওয়ায় সেখানে গবর্নর-শাসন প্রবর্তিত হয় ১৯৫৭ সালের এপ্রিল মাসে। তিন মাস চলিয়া যাইতেছে। রিপাবলিকানরা দাবি করিতেছেন, তাঁদের নিরংকুশ মেজরিটি হইয়াছে। তবু প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভা গঠনের অনুমতি দিতেছেন না। রিপাবলিকান পার্টির জোরে আমরা কেন্দ্রে মন্ত্রিত্ব করি। অথচ প্রদেশে সেই রিপাবলিকান পার্টির মন্ত্রিসভা হইতে দিতেছি না, এটা কত বড় অন্যায়, অপমানকর? দিন-রাত রিপলিকান নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে তাগাদার উপর তাগাদা করিতেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী অনড়। শেষ পর্যন্ত কোনও কোনও রিপলিকান নেতা অভিযোগ করিতে লাগিলেন যে দৌলতানাগুরমানী-নেতৃত্বে মুসলিম লীগের সাথে শহীদ সাহেব একটা গোপন আঁতাত করিয়াছেন যার ফলে তিনি শেষ পর্যন্ত লাহারে মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা কায়েম করিলে। এর পরিণামে শহীদ সাহেব শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রেও রিপালিকানের বদলে মুসলিম লীগের সাথে কোয়েলিশন করিবেন। শুধু রিপালিকান-নেতারা নন, স্বয়ং প্রেসিডেন্ট মির্যাও আমাকে এ ধরনের কথা বলিয়াছেন অবশ্য রিপাবলিকানদের কথা হিসাবে।
আমি ওঁদের অভিযোগ ও সন্দেহে বিশ্বাস করিতাম না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এ কাজ সমর্থনও করিতাম না। কেন তিনি আমাদের কোয়েলিশনী বন্ধুদের সাথে প্রাদেশিক রাজনীতিতে এই দুর্ব্যবহার করিতেছেন, তার কোনও কারণ পাইতাম না। লিডারকে জিগ্গাস করিলে তিনি ধমক দিতেনঃ পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতি তুমি কিছু জান না। এ ব্যাপারে কথা বলিও না।
কিন্তু তবু আমি বলিলাম। প্রেসিডেন্ট মির্যার কথা তুলিলে তিনি হাসিয়া বলিলেন : ‘প্রেসিডেন্ট ইয অল রাইট।‘ এর সমর্থনে তিনি আভাসে-ইংগিতে এমন দুচারটা কথা বলিলেন যা হইতে আমি বুঝিলাম মির্যা একদিকে রিপাবলিকানদেরে মন্ত্রিসভার দাবিতে উস্কানি দিতেছেন, অপরদিকে প্রধানমন্ত্রীকে উপদেশ দিতেছেন। রিপাবলিকানদের দাবি না মানিতে। দস্তুরমত ‘চোরকে চুরি করিতে এবং গিরস্তকে সজাগ থাকিতে বলার দৃষ্টান্ত আর কি! আমার সন্দেহের কথা প্রকাশ করা মাত্র লিডার কথাটাকে মাটিতে পড়িতে দিলেন না। এমন ধমক দিলেন যেন আমি কোন সাধু আউলিয়া-দরবেশের চরিত্রে সন্দেহ করিয়াছি। ফলে প্রধানমন্ত্রী কিছু করিলেন না। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি রিপাবলিকান-অসন্তোষ বাড়িয়াই চলিল।
এমন সময় তিনি লম্বা সফরে বিদেশে গেলেন। আমি তাঁর স্থলবর্তী হওয়া মাত্র রিপাবলিকানরা আমার উপর ঝাপাইয়া পড়িলেন। ওঁদের সবাই আমার শ্রদ্ধেয় বন্ধু হইলেও সৈয়দ আমজাদ আলীর উপদেশের প্রতিই আমি অধিকতর গুরুত্ব দিতাম। তিনিও আমাকে পীড়াপীড়ি করিতে লাগিলেন। শুধু অনুরোধ-উপরোধ নয়। রিপাবলিকানরা একটা কাজের কাজও করিলেন মুসলিম লীগ যখন কেন্দ্রে মন্ত্রিত্ব করিতেছিল, সেই সময় ১৯৫৫ সালে পূর্ব-পাকিস্তানের মন্ত্রিসভা গঠনে কৃষক-শ্রমিক পার্টি ও আওয়ামী লীগের পরস্পর-বিরোধী দাবির মীমাংসার জন্য গবর্নরের সামনে ফিফিক্যাল ডিমনস্ট্রেশন করার (মেম্বর হাযির করার আদেশ দেওয়া হইয়াছিল। আমার মনে হয় যেন তারই জবাবে শহীদ সাহেব কিছুদিন আগে গবর্নর ওরমানীকে আদেশ দিয়াছিলেন, উভয় দলের শক্তির ফিষিক্যাল ডিমনস্ট্রেশন নিতে। সুহরাওয়ার্দী সাহেব বিদেশ সফরে যাওয়ার কিছুদিন পরে লাহোরে তাই হইল। সে ডিমনস্ট্রেশনে রিপাবলিকান পার্টি জয় লাভ করিল। কিন্তু এই ধরনের প্রক্লেমেশন বা তার রিভোকেশনে গভর্ণরের ‘রিপোর্ট’ দরকারশাসনতন্ত্রের বিধান অনুসারে। গুরমানী সাহেব কি রিপোর্ট দেন, তা দেখিবার জন্য সকলেই উৎকর্ণ হইয়া আছেন। রিপাবলিকান বন্ধুদের তাগাদার জবাবে আমি দুই-একবার বলিয়াছি : ‘আপনারা প্রেসিডেন্টকে দিয়া বলান না কেন?
প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন আমাদের গ্রীবাস নাধিয়াগলিতে। প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান সেনাপতির মধ্যে কথাবার্তার জন্য সেক্রোফোনের ব্যবস্থা থাকে। আমি অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হইলেই এই যন্ত্রটা আমার শোবার ঘরে পাতা হইত। সেক্রোফোনের ব্যবস্থা। গোপনীয় কথা আদান-প্রদানের জন্য। সাধারণ টেলিফোনের মত এটা ট্যাপ করা যায় না অর্থাৎ অন্য কেউ হাযার যন্ত্র লাগাইয়াও এর কথা বুঝিতে পারিবে না। কারণ ট্রান্সমিটিং বাক্সে কথাগুলি বলিলেই এলোমেলো হিজিবিজি হইয়া যায়। ঐ এলোমলো অবস্থাতে গিয়া রিসিভিং বাক্সে পড়ে। সেখানে গিয়া যেমনকার কথা তেমনি হইয়া যায়। বলা বাহুল্য এই পরিবর্তন এমন পলকে হয় যে আলাপের দুই পক্ষ সেটা বুঝিতেই পারেন না।
এবারও এই যন্ত্র আমার শোবার ঘরে পাতা হইয়াছিল। প্রেসিডেন্ট মির্যা কখনও এই সেক্রোফোনের মাধ্যমে, কখনও সাধারণ ট্রাংক কলে, আমার সাথে কথা বলিতেন। প্রায়ই বলিতেন। দিনে তিনবারও বলিতেন কোনও দিন। কোনও সংগত। কারণ নাই। হঠাৎ একদিন আমার মনে হইল প্রেসিডেন্ট সেক্রোফোনে যে সুরে কথা বলেন, সাধারণ ট্রাংক কলের কথায় যেন ঠিক সেই সুর থাকে না। সন্দেহ হওয়ায় আরও একটু মন দিয়া বিচার করিতে লাগিলাম। আমার সন্দেহ বেশ দৃঢ় হইল যে যখন ট্রাংক কলে কথা বলেন, তখন তিনি আমাকে খুব জোর দিয়া ধমকের সুরে বলেন : তুমি অনতিবিলম্বে লাহোরে রিপাবলিকান মন্ত্রিসভার হকুম দিয়া দাও। তাঁরা পরিস্কার মেজরিটি। তাঁদেরে মন্ত্রিসভা না দিলে কেন্দ্রে যদি তাঁরা তোমাদের বিরুদ্ধে যান, তবে আমাকে দোষ দিতে পারিবানা। ইত্যাদি ইত্যাদি। সবকলেই মোটামুটি এই ভাব।
