কিন্তু কারখানায় বিরাটত্বে ও প্রডাকশনের বিপুলতায় আমি এমনি মুগ্ধ হইয়াছিলাম যে তাঁদের অভিযোগের দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারিলাম না। অফিসারদের সাথে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ আলাপ শুরু করিলাম। তাঁদের কৃতিত্বে আমার অফুরন্ত আনন্দ ও বুক-রা গৌরবের কথা উপযুক্ত ভাষায় প্রকাশ করিয়া অবশেষে বলিলাম : বলুন ত আমাদের কোন বস্তুর দৈনিক বা মাসিক বা বাৎসরিক তৈয়ারির পরিমাণ কত? আমার ভাবখানা এই যে তাঁরা বলিবেন আমি আমার নোটবই এ লিখিয়া নিব। পকেটে হাত দিলাম নোটবুকের তালাশে।
অফিসাররা খানিক এ-ওঁর দিকে চাহিলেন। তারপর ডিরেক্টর সাহেব বলিলেন : ‘মাফ করিবেন সার, আমরা বলিতে পারিব না। আমি বিস্মিত হইলাম। বলিলাম : তার অর্থ বলিতে পারিবেন না? না বলিবেন না?
সরলভাবে তিনি বলিলেন : ‘বলিতে মানা আছে এসব টপ-সিক্রেট।‘ আমি আরও তাজ্জব হইলাম। বলিলাম : ‘বলেন কি আপনেরা? আপনাদের প্রধানমন্ত্রী ও দেশরক্ষা মন্ত্রী হিসাবেও আমি জানিতে পারিব না আমাদের কত তৈয়ার হয়? তবে আমরা কি করিয়া জানিব আমাদের দরকার কত? কতই বা আমাদের আমদানি করিতে হইবে?’
আমার সব কথাই সত্য। তবে এসব ব্যাপার জানিতে হইলে প্রপার চ্যানেলে আসিতে হয়। আমি ডিফেন্স সেক্রেটারি, প্রধান সেনাপতি, এমন কি প্রেসিডেন্টের মারফত সবই জানিতে পারিব। ওঁরা জানিতে না চাওয়া পর্যন্ত প্রপার চ্যানেল হইবে না। ঐ চ্যানেলে অর্ডার না আসা পর্যন্ত কারখানার অফিসারগণ কারও কাছে কিছু বলিতে পারেন না।
আমি শুধু খুশী হইলাম না। গর্ব বোধও করিলাম। কি চমৎকার ডিসিপ্লিন। এ না হইলে আর দেশরক্ষা দফতরের কাজ হয়? সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিয়া বিদায় হইলাম।
৬. প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা
করাচি ফিরিয়াই ডিফেন্স-সেক্রেটারি মিঃ আখতার হুসেনকে ধরিলাম। তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করিলেন। আমি বলিলাম আমার উদ্দেশ্যের কথা। তিনি বলিলেন : ‘বরঞ্চ প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞাসা করুন।‘ করিলাম প্রেসিডেন্টকে জিগগাস। তিনি প্রথমে তর্ক করিলেন, এসব খবরে প্রেসিডেন্ট বা মন্ত্রীদের দরকার কি? প্রধান সেনাপতিই যথেষ্ট। আমি তর্ক করিলাম। প্রেসিডেন্ট সুপ্রিম কমাণ্ডার। তাঁর সব ব্যাপার জানা দরকার। প্রধানমন্ত্রী ও দেশরক্ষা মন্ত্রীরও অবশ্যই জানিতে হইবে। নইলে প্রস্তুতি হইবে। কিরূপে? আমি বিলাতের নযির দিলাম। প্রেসিডেন্ট শেষ পর্যন্ত স্বীকার করিলেন, তিনি কিচ্ছু জানেন না। প্রধান সেনাপতির সহিত যোগাযোগ করিতে তিনি আমাকে উপদেশ দিলেন। প্রধান সেনাপতি এই সময় হয় বিলাতে বা আমেরিকায় ছিলেন। আমি ডিফেন্স সেক্রেটারিকে নির্দেশ দিলাম, প্রধান সেনাপতি ফিরিয়া আসা মাত্র বিহিত ব্যবস্থা যেন তিনি করেন।
কোনো ‘বিহিত ব্যবস্থা’ হইল না। অথবা বিহিত ব্যবস্থাই বোধ হয় হইল। আমাকে কিছু জানান হইল না। প্রধানমন্ত্রী ফিরিয়া আসা মাত্র আমি তাঁর কাছে নালিশ। করিব, স্থির করিয়া রাখিলাম।
নালিশ আর আমার করিতে হইল না। প্রধানমন্ত্রী ফিরিয়া আসার পর আমার সহিত প্রথম একক সাক্ষাতেই তিনি বলিলেন : এ সব কি শুনিলাম? তুমি দেশরক্ষার গোপন-তথ্য সম্বন্ধে অত কৌতূহলী কেন?
আমি স্তম্ভিত হইলাম। কি গুরুতর অন্যায় করিয়া ফেলিয়াছি। প্রধানমন্ত্রীকে সব খুলিয়া বলিলাম। দেখিলাম, অনেক কথাই তিনি জানেন। সব শুনিয়া এবং আমার উদ্দেশ্য ও যুক্তির বিবরণ শুনিয়া অবশেষে বলিলেন : তোমাকে এরা কত সন্দেহের চোখে দেখেন তা কি তুমি জান না? তুমি একুশ দফার রচয়িতা। তুমি সাবেক কংগ্রেসী। ভারতের অনেক নেতার তুমি বন্ধু।
আমি প্রতিবাদ করিয়াও অবশেষে তাঁর যুক্তি মানিয়া নিলাম। বলিলাম : ‘বেশ, আমার বেলা তাঁদের সন্দেহ আছে। কিন্তু আপনে? আপনে কি এসব ব্যাপার জানেন? আপনে শাসন-সৌকর্য হইতে শুরু করিয়া অর্থনীতির পোকা-মাকড় পর্যন্ত মারিতে দক্ষ। প্রধানমন্ত্রী ও দেশরক্ষা মন্ত্রী হিসাবে প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থার আপনে কতটুকু জানিয়াছেন?’ আমার কথাগুলি ফেলিয়া দিবার মত নয়। তিনি স্বীকার করিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মির্যার মতই তিনি যুক্তি দিতে লাগিলেন, দেশরক্ষাব্যবস্থা ছাড়াও মন্ত্রীদের অতসব কর্তব্য পড়িয়া রহিয়াছে যে ঐ সব কাজ করিয়া মন্ত্রীদের অবসর থাকা সম্ভবও নয়, উচিৎও নয়। বোঝা গেল, তিনি এ ব্যাপারে কিছু জানেন না। মানে, আসল কথা জানেন। অর্থাৎ এ ব্যাপারে যে কিছু জানা উচিৎ নয়, এটা জানেন। তাই জিগ্গাসা করাও তিনি বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেন না।
আমার বাঘা প্রধানমন্ত্রী ও দেশরক্ষা মন্ত্রী সুহরাওয়ার্দীরই এই অবস্থা। আর-আর প্রধানমন্ত্রীদের কি ক্ষমতা ছিল, তা অনুমান করিলাম। বুঝিলাম, নামে-মাত্র পার্লামেন্টারি সরকার চলিতেছে দেশে। কিন্তু দেশরক্ষা দফতরে মন্ত্রীদের বা মন্ত্রিসভার বা আইন-পরিষদের কোনও ক্ষমতা নাই। সেখানে সামরিক কর্তৃত্ব চলিতেছে। লিডার যা বলিলেন, তার চেয়েও তিনি বেশি জানেন। আমরা যে কত অক্ষম, অসহায়, বোধ হয় তিনি আমার চেয়েও বেশি উপলব্ধি করেন। তিনি যে দুই-একবার প্রকাশ্যভাবে এবং অনেকবার আমদের কাছে বৈঠকে মার্শাল লর ডর দেখাইয়াছেন, তার কারণ নিশ্চয়ই আছে।
৭. পশ্চিম পাকিস্তানের মন্ত্রিসভা
