ঢাকা হইতে ফিরিয়াই কয়েকদিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্য ইংলন্ড ও আমেরিকা ভ্রমণে প্রায় দুই মাসের জন্য সফরে বাহির হন। বরাবরের মত আমাকেই অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রীত্ব দিয়া যান। এই সময়কার দুই-তিনটি ঘটনা আমার বেশ মনে আছে।
৪. ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট
একটি ঘটে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট লইয়া। এটি ছিল ঢাকায়। পূর্ব-পাকিস্তান সরকারের চিফ ইঞ্জিনিয়ার জনাব আবদুল জব্বার ইহার সেক্রেটারী। কার্যতঃ তিনিই ইহার প্রতিষ্ঠাতা। শিল্পমন্ত্রী হিসাবে আমার এলাকাধীন এটা। আমি মন্ত্রী হওয়ার পর হইতেই জব্বার সাহেব আমার কাছে নালিশ করিতেছিলেন, পাকিস্তান সরকার বহু বছর ধরিয়া নিতান্ত অযৌক্তিকভাবে ইন্সটিটিউটের মযুরি ঠেকাইয়া রাখিয়াছেন। আমাকে এটার প্রতিকার করিতেই হহইবে। আমি ফাইল তলব করিয়া দেখিলাম বিরাট ব্যাপার। সব দফতর হইতেই ইন্সটিটিউটের রিকগনিশনের বিরোধিতা করা হইয়াছে। ইন্সটিটিউটের পরম হিতৈষী পশ্চিম পাকিস্তানী একজন তরুণ ইঞ্জিনিয়ার মিঃ আফর। তিনি এবং ইন্সটিটিউটের তৎকালীন চেয়ারম্যান পাকিস্তানের তৎকালীন শ্রেষ্ঠ ইঞ্জিনিয়ার মিঃ মোহসিন আলী আমাকে ব্যাপারটা বুঝাইলেন। আমি বিস্মিত ও লজ্জিত হইলাম। এই ইন্সটিটিউট ভারত সরকার ও বৃটিশ সরকার কর্তৃক রিকগনাইযড। অপর দিকে দিল্লির ও লন্ডনের এই একই প্রকারের ইন্সটিটিউটও পাকিস্তান সরকার কর্তৃক রিকগনাইযড। কিন্তু বিদেশ কর্তৃক স্বীকৃত নিজের দেশের এই ইন্সটিটিউট পাকিস্তান সরকার স্বীকার করেন না। অদ্ভুত না? জব্বার সাহেব বলিলেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানী উক্ত দুইজন ইঞ্জিনিয়ার সমর্থন করিলেন যে, যদি উহার হেড় অফিস পশ্চিম পাকিস্তানে স্থানান্তরিত করা হয়, তবে উহার মযুরি পাইতে এক মুহূর্ত দেরি হইবে না।
আমি সমস্ত নথি পড়িয়া-শুনিয়া এবং সকল দিক বিবেচনা করিয়া লম্বা নোট লিখিলাম। তাতে ইন্সটিটিউট মনযুরির সুপারিশ করিয়া প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠাইলাম। নিয়ম মোতাবেক এ সম্পর্কে চূড়ান্ত আদেশ দিবার মালিক প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী ফাইল দেখিয়াই ধরিয়া লইলেন এটা আমার পূর্ব-বাংলা-প্রীতির আরেকটা ব্যাপার। তিনি হাসিয়া বলিলেন : এটাও একুশ দফায় ছিল নাকি তাঁর হাসির জবাবে না হাসিয়া উত্তেজিত কণ্ঠে এ ব্যাপারে অবিচার ও আঞ্চলিক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রবল যুক্তি দিতে লাগিলাম। তিনি হাতের ইশারায় আমাকে থামাইয়া বলিলেন : ‘উত্তেজিত হইবার কিছু নাই। ধীরে-সুস্থে ভাবিবার অনেক আছে। আগুন যা জ্বালাইয়াছ, তাই আগে নিভাইতে দাও। আর নতুন করিয়া আগলাগাইও না।
আঞ্চলিক সংকীর্ণতার জন্যই এটা মনযুরি পাইতেছে না প্রধানমন্ত্রীর কথায় সে বিশ্বাস আমার আরও দৃঢ় হইল। আমি আমার যুক্তির পুনরাবৃত্তি করিতে লাগিলাম। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী বলিলেন : ‘দেখিতেছ না, সব দফতর হইতে মনযুরির বিরুদ্ধে সুপারিশ করা হইয়াছে?’ আমি জোর দিয়া বলিলাম : ‘সব দফতরের যুক্তি আমার নোটে খন্ডন করিয়াছি।‘ তিনি আবার তাঁর মুরুব্বিয়ানার হাসি হাসিয়া বলিলেন : ‘তুমি ভাবিতেছ খন্ডন করিয়াছ। আমি মনে করি কিছু হয় নাই। ভাল ইংরাজী লিখিলেই ভাল অর্ডার হয় না।‘
এই কথা.বলিয়া ফাইলটা এমনভাবে সরাইয়া রাখিলেন যে আমি বুঝিলাম এ ব্যাপারে আজ আর কথা বলা চলিবে না। এমনি ভাবে তিনি যে ফাইলটা নিজের দফতরে চাপা দিলেন, আমার শত তাগাদায়ও তিনি ঐ ব্যাপারে কিছু করিলেন না। এদিকে ঢাকা হইতে রিমাইন্ডার ও করাচি হইতে মিঃ যাফরের তাগাদা আমাকে অস্থির করিয়া ফেলিল। আমি একটা রিস্ক নিলাম। এর পরে এ্যাকটিং প্রধানমন্ত্রী হইয়াই আমি ঐ ফাইল তলব করিলাম এবং শিল্প-মন্ত্রী হিসাবে আমার নোটটার নিচে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে আমি অনুমোদিত লিখিয়া দিলাম। পরে করাচিতেই ইন্সটিটিউটের উদ্বোধনী উৎসব হইয়াছিল প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর হইতে ফিরিয়া আসিবার পর। ওঁরা আমাকেই উৎসবের প্রধান অতিথি করিতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু আমি বহুৎ অনুরোধ-উপরোধ করিয়া প্রধানন্ত্রীকে প্রধান অতিথি হইতে রাযী করিয়াছিলাম। তাঁর অমতে এ কাজ করিয়াছিলাম বলিয়া প্রধানমন্ত্রী আমাকে কোনদিন তিরস্কার করেন নাই।
৫. ওয়াহ কারখানা পরিদর্শন
আরেকটি ঘটনা আমার ওয়াহ অস্ত্রকারখানা পরিদর্শন। এটিই পাকিস্তানের প্রধান। অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি। আমার শখ হইল আমাদের জাতীয় অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিটি দেখিব। তদনুসারে টুণ্ডর প্রোগ্রাম প্রচারিত হইল। তৎকালীন ডিরেক্টর (বোধ হয় জেনারেল আযম খাঁ) আমাকে পিন্ডি হইতে আগাইয়া নিয়া যান। আমার অভ্যর্থনার বিপুল আয়োজন হইয়াছিল। হরেক বিভাগে আমার অভ্যর্থনার পৃথক-পৃথক ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। অভ্যর্থনা মানে অভিনন্দন-পত্র পাঠ ও বক্তৃতা নয়। সব মিলিটারি ব্যবস্থা। বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহারের নুমায়েশ। ফুলদল দিয়া কামান-বন্দুক সাজাইয়া রাখা হইয়াছে। আমি ট্রিগার টিপলাম। আওয়ায হইল। টার্গেট সই অর্থাৎ চানমারি হইল। আমার কোনও কৃতিত্ব ছিল না। ঠিকমত সই করিয়া বসাইয়া রাখা ইয়াছিল। এসব উৎসব শেষ করিয়া আমি বিভিন্ন গোলা-বারুদ, মানে এমিউনিশন, তৈয়ার দেখিলাম। এলাহি কারখানা। উৎসাহিত, আশান্বিত ও গৌরবান্বিত হইলাম। দেশ রক্ষার সব অস্ত্র-শস্ত্রই আমাদের নিজস্ব কারখানায় তৈয়ার হয়। তবে আর চিন্তা কি? ভয় কিসের? চার ঘন্টার মত পরিদর্শন করিলাম। মাঝখানে মধ্যাহ্ন ভোজনের আয়োজন করা হইয়াছিল ফ্যাক্টরির মধ্যেই। আমি যখন ফ্যাক্টরিতে বিভিন্ন জিনিস গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করি, সেই সময় দুই-একজন শ্রমিক আমার নিতান্ত কাছ ঘেষিয়া বাংলায় কথা বলিতে শুরু করেন। আমার কৌতূহল হয়। তাঁদের দিকে ফিরি। আমার চোখে বোধ হয় তাঁরা সহানুভূতি দেখিতে পান। নিজেদের অভাব-অভিযোগের কথা বলিতে শুরু করেন। এটা বোধ হয় ডিসিপ্লিন অথবা, মন্ত্রীর মর্যাদার খেলাফ। তাই উপরস্থ অফিসাররা তাঁদেরে ধমক দিয়া সরাইয়া দেন। কিন্তু পিছে পিছে তাঁরা ঘুরিতেই থাকেন। সুযোগ পাইলেই চুপে-চুপে দুই একটি কথা বলিয়াও ফেলেন।
