৩. সেকান্দরী ফন্দি
লিডার যাই বুঝিয়া থাকুন আমি বুঝিয়াছিলাম, মওলানা ও শহীদ সাহেবের মধ্যে বিরোধ বাধাইবার এটা একটা সেকান্দরী কৌশল। আওয়ামী লীগে ভাংগন আনাই তাঁর উদ্দেশ্য। মির্যা শহীদ সাহেবকে দিয়া মওলানাকে আক্রমণ ক্লাইতে পারিলেন না। কাজেই তিনি মওলানাকে দিয়া শহীদ সাহেবকে আক্রমণ করাইবার আয়োজন করিলেন। কোথা দিয়া কি হইল বোঝা গেল না। হঠাৎ মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সভাপতির পদে ইস্তফা দিলেন। মওলানা সাহেবের ঘনিষ্ঠ বলিয়া পরিচিত দুই জন আওয়ামী নেতা একজন পূর্ব পাকিস্তানী শিল্পপতি সহ ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করিয়া গিয়াছেন। এইটুকমাত্র শুনিয়াছিলাম। তার সাথে মওলানার পদত্যাগে কোনও সম্পর্ক থাকে কেমন করিয়া? মওলানার পদত্যাগ যে আওয়ামী লীগের জন্য একটা ক্রাইসিস, আগামী নির্বাচনে যে এর ফল আমাদের জন্য বিষময় হইবে, একা আমি যেমন বুঝিলাম প্রধানমন্ত্রীকেও তেমনি বুঝাইবার চেষ্টা করিলাম। প্রধানমন্ত্রী যেমন বুঝিলেন, মওলানা সাহেবও তেমনি বুঝিলেন অবশ্য বিভিন্ন অর্থে। অন্ততঃ তাঁকে তেমনি বুঝান হইল। তাই তিনি আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধিবেশনের প্রাক্কালে পদত্যাগ করিলেন। মওলানা সাহেব নিশ্চয়ই আশা করিয়াছিলেন, কাউন্সিল মিটিং–এ তিনি জিতিবেন। কারণ এই সময়ে ছাত্র-তরুণদের বিপুল মেজরিটি মার্কিন-বিরোধী হইয়া উঠিয়াছে। আওয়ামী লীগের কাউন্সিলারদেরও অনেকেই সেই মত পোষণ করেন। কাগমারি সম্মিলনীতে শহীদ সাহেব ও ভাসানী সাহেবের মতের মধ্যে আমরা যে আপোস ফমূলা বাহির করিয়া দিয়াছিলাম, সেটার আর দরকার নাই, মওলানার মনে নিশ্চয় এই ধারণা হইয়াছিল। যে কোনও কারণেই হোক মওলানা সাহেব মনে-মনে এইরূপ সিদ্ধান্ত করিয়াই ফেলিয়াছিলেন যে, হয় তিনি সুহরাওয়ার্দী-হীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব করিবেন, নয় ত তিনি আলাদা পার্টি করিবেন। এটা আমি বুঝিতে পারি হাসপাতালে তাঁর সাথে আলাপ করিয়া। প্রথমতঃ তিনি পদত্যাগের ঘোষণাটি করিয়াছিলেন অস্বাভাবিক নযিরবিহীন গোপনীয়তার সাথে। সহ-কর্মীদের সাথে রাগ করিয়া পদত্যাগ করিলে মানুষ স্বভাবতঃ তাঁদেরে জানাইয়া পদত্যাগ করেন। এ ক্ষেত্রে মওলানা সাহেব প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান ও জেনারেল সেক্রেটারি মুজিবুর রহমানের সাথে এবং কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ সাহেবের সাথে বিরোধের জন্য পদত্যাগ করিয়াছেন, এটা ধরিয়া নেওয়া যাইতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থায় তিনি তাঁর পদত্যাগপত্র সেক্রেটারি মুজিবুর রহমানের কাছে পাঠাইয়া দিতেন। মুজিবুর রহমান আতাউর রহমানকে এবং শেষ পর্যন্ত শহীদ সাহেবকে জানাইতেন। আওয়ামী লীগ মহলে হৈ চৈ পড়িয়া যাইত। আমরা সকলে ধরাধরি করিয়া তাঁকে পদত্যাগে বিরত করিতাম। এইটাই মওলানা এড়াইতে চাহিয়াছিলেন। সেইজন্য তিনি বিশ্বস্ত অনুগত মিঃ অলি আহাদকে নির্বাচন করেন। পদত্যাগপত্রটি আতাউর রহমান-মুজিবুর রহমান কাউকে না দেখাইয়া বামপন্থী খবরের কাগযে পৌঁছাইয়া দিবার ওয়াদা করাইয়া তিনি উহা মিঃ অলি আহাদের হাতে দেন। মিঃ অলি আহাদ সরল বিশ্বস্ততার সাথে অক্ষরে-অক্ষরে তা পালন করেন। এ কাজে তিনি মওলানা সাহেবের প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য দেখাইয়া থাকিলেও প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্য ভংগ করিয়াছেন, এই অপরাধে মিঃ অলি আহাদকে সাসপেন্ড করা হয়। প্রতিবাদে ৯ জন ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বার পদত্যাগ করেন।
এমনি ক্রাইসিস মুখে লইয়া আওয়ামী লীগের কাউন্সিল বৈঠক হয় প্রধানতঃ মওলানা সাহেবের ইচ্ছামত। তার আগে-আগে প্রসারিত ওয়ার্কিং কমিটি ও পার্লামেন্টারি পার্টির যুক্ত বৈঠক দেওয়া হয়। মওলানা সাহেব তখন হাসপাতালে। আমিও। উভয়ে প্রায় সামনা-সামনি কেবিনে থাকি। প্রধানতঃ আমারই প্রস্তাবে মওলানা সাহেবকে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের অনুরোধ করিয়া সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। কখনো আমি ও মুজিবুর রহমান একত্রে কখনও আমি একা মওলানা সহেবকে ইস্তফা প্রত্যাহারের অনুরোধ-উপরোধ করি। পদত্যাগী ওয়ার্কিং কমিটি মেম্বরদের এবং মিঃ অলি আহাদ সম্পর্কে মওলানার ইচ্ছামত কাজ হইবে, এ আশ্বাসও আমরা দেই। কিন্তু মওলানা অটল। যা হয় কাউন্সিল মিটিং-এ হইবে, এই তাঁর শেষ কথা। কাউন্সিল মিটিং-এ তিনি জয়লাভ করিবেন, এটা তিনি আশা করিলেও নিশ্চিত ছিলেন না। সেই জন্য আগেই তিনি মিয়া ইফতিখারুদ্দিন ও জি. এম. সৈয়দ প্রভৃতি পশ্চিম পাকিস্তানী বামপন্থী নেতৃবৃন্দ ও শহিদ সাহেব কর্তৃক বিতাড়িত সাবেক আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি মিঃ মাহমুদুল হক ওসমানীর সাথে গোপন পরামর্শ করিতে থাকেন। এটা আমি জানিতে পারি হাসপাতালের লোকজনের কাছে। ডাক্তারের পরামর্শে আমি রোজ বিকালে কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টের দিকে বেড়াইতে যাইতাম। সেখানে ঘন্টাখানেক ভোলা ময়দানে হাওয়া খাইতাম। একদিন হাসপাতালে ফিরিয়া আসিয়া শুনিলাম, ইতিমধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা বদ্ধ দরজায় মওলানা সাহেবের সাথে পরামর্শ করিয়া গিয়াছেন। এটা চলে পর-পর কয়দিন। কাউন্সিল মিটিং-এ ভাসানী সাহেব হারিয়া যান। তবু কাউন্সিল মওলানাকে ইস্তাফা প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন। মওলানা তদুত্তরে ন্যাপ গঠন করেন। ন্যাপ গঠনে প্রেসিডেন্ট মির্যার হাত ছিল এতে আমার কোনও সন্দেহ নাই। প্রধানতঃ তাঁরই চেষ্টায় করাচির শিল্পপতি এ কাজে অর্থ-সাহায্য করিয়াছিলেন। অথচ এই সময়েই প্রেসিডেন্ট মির্যা নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার প্রতিনিধিকে বলেন : প্রধানমন্ত্রী সুহরাওয়ার্দী ও আমি এক সংগে থাকিব। তাঁরমত যোগ্য লোক পাকিস্তানে আর হয় নাই। মির্যার ঐ উত্তির মধ্যে সবটুকু ভন্ডামি ছিল না। কিছুটা আন্তরিকতা ছিল। তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের বিশেষতঃ ভাসানীর প্রভাবমুক্ত সুহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রী রাখিতে সত্য-সত্যই উদগ্রীব ছিলেন বলিয়া আমার ধারণা হইয়াছিল। শেষ পর্যন্ত ওটা সম্ভব না হওয়ায় তিনি সুহরাওয়ার্দী-বিরোধী হইয়া পড়েন। সে কথা যথাস্থানে বলিব।
