শিল্পায়নের প্যান, বিদেশী মুদ্রা ও লাইসেন্সিং প্রাদেশিক সরকারের হাতে এইভাবে তুলিয়া দিতে পারিয়া নিশ্চিন্ত হইয়াছিলাম। কাজেই ব্যাপারটা আমি ভূলিয়াই গেলাম। অন্য ব্যাপারে মন দিলাম। দিতে বাধ্য হইলাম।
২. আওয়ামী লীগের অন্তর্বিরোধ
কারণ পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মধ্যে অন্তর্বিরোধ জমাট বাঁধিয়া উঠিল। প্রেসিডেন্ট মওলানা ভাসানীর সাথে বাহ্যতঃ ও প্রধানত বৈদেশিক নীতি লইয়া ভিতরে-ভিতরে বিরোধ ছিলই। কাগমারি আওয়ামী লীগ সম্মেলনে এই বিরোধ উপরে ভাসিয়া উঠে। আতাউর রহমান মন্ত্রিসভার প্রতিও মওলানা সাহেব বিরূপ হইয়া উঠেন। বিভিন্ন সভা-সমিতিতে তিনি প্রকাশ্যভাবে বলিয়া ফেলেন যে আতাউর রহমান মন্ত্রিসভা ২১ দফার খেলাফ কাজ করিতেছেন। কথাটা সত্য ছিল না। কারণ আতাউর রহমান মন্ত্রিসভা সাধ্যমত ২১ দফার কার্যক্রম কার্যে পরিণত করিয়া চলিতেছিলেন। শাসন-সৌকর্যের ব্যাপারে ও অফিসারদের ট্রেন্সফারাদি ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী স্বভাবতঃই এবং ন্যায়তঃই সকল আওয়ামী লীগ কর্মীদের খুশী করিতে পারিতেন না। তাঁরাই মওলানা সাহেবের কানভারি করিতেন বলিয়া আমার বিশ্বাস। মওলানা সাহেব স্বভাবতঃই সরকার-বিরোধী মনোভাবের লোক বলিয়া মাত্রা-ছাড়া তাবে তিনি নিজের দলের সরকারের নিন্দা করিতেন। তাতে আতাউর রহমান সাহেব ত অসন্তুষ্ট হইতেনই শহীদ সাহেবও হইতেন। একদিকে প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও অপর দিকে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পার্লামেন্টারি নেতৃদ্বয়ের মধ্যে এই বিরূপ মনোব আমার কাছে অশুভ ও বিপজ্জনক মনে হইত। আমি জোড়াতালি যুক্তি দিয়া এই বিরোধ মিটাইবার চেষ্টা করিতাম। মওলানা সাহেবকে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের এবং জনপ্রিয় নেতৃত্বের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের অনুরোধ করিতাম। অপরপক্ষে দুই প্রধানমন্ত্রীকে বুঝাইবার চেষ্টা করিতাম যে সরকারের সমালোচনা করিয়া মওলানা সাহেব নিজেকে তথা প্রতিষ্ঠানকে জনপ্রিয় রাখিয়া ভালই করিতেছেন। বরঞ্চ তলে-তলে সহযোগিতার ভাব রাখিয়া বাইরে-বাইরে প্রতিষ্ঠানের প্রধান যদি সরকারী কার্যকলাপের সমালোচনা করেন, তবে তাতে পরিণামে লাভ আমাদেরই। কারণ আমাদের সরকার কোয়েলিশন মন্ত্রিসভা। আমাদের ইচ্ছা ও জনগণের দাবি মত সব কাজ সত্যই ত আমরা করিতে পারিতেছি না। এই ব্যাপারে আমি ভারতের কংগ্রেসের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মিঃ সঞ্জীব রেডিড ও প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরুর মধ্যে গোপন সহযোগিতা ও প্রকাশ্য সমালোচনার দৃষ্টান্ত দিতাম।
পক্ষান্তরে এই বিরোধে ইন্ধন যোগাইবার লোকেরও অভাব ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানে এই বিরোধে বাতাস করিয়া এক শ একজন এক শ এক উপলক্ষে উহা বাড়াইবার চেষ্টা করি। কিন্তু কেন্দ্রে যিনি এটা করিতেন, তিনি একাই এক শ। ইনি স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্যা। এটা আমি বুঝিলাম যেদিন প্রধানমন্ত্রী আমাকে গোপনে বলিলেন : প্রেসিডেন্ট মির্যা মওলানা ভাসানীকে অবিলম্বে গেরেফতার করিবার জন্য তাঁর উপর খুবই চাপ দিতেছেন। আমি স্তঙ্কিত হইলাম। আমরা মন্ত্রিত্ব করিব, আর আমাদের সভাপতিকে গেরেফতার করিব আমরাই? লিডার আমার ভাব দেখিয়া বলিলেন : বিস্ময়ের কিছু নাই। সিক্রেট ফাইল দেখিলে তুমিও প্রেসিডেন্টের সাথে একমত হইবে। অনেক কথা কাটাকাটি হইল। অবশেষে তিনি আমাকে একটা বিশালফাইল গছাইলেন। বলিলেন : পড়িয়া দেখ।
পড়িয়া দেখিলাম। খুব মনোযোগ দিয়া। কয়েকদিন লাগিল। সিক্রেট ফাইল তা নিজ হাতে আয়রন সেফে রাখিতাম। রাত্রে-রাত্রে পড়িতাম। অন্য কেউ দেখিয়া না ফেলে। প্রধানমন্ত্রী টুওরে বাহিরে গিয়াছিলেন। তিনি ফিরিয়া আসিয়াই জিগ্গাসা করিবেন। পড়িলামও উকিল যেমন করিয়া নথি-পত্ৰ পড়ে প্রতি লাইনে-লাইনে। সবগুলি ফটোস্টেট কপি। হুবহু অরিজিনাল। পাকিস্তান ভারতীয় দূতাবাস হইতে যে সব চিঠি-পত্র দিল্লিতে ভারত সরকারের বৈদেশিক দফতরে লেখা হইয়াছে, তাতে মওলানা ভাসানীর নাম আছে। লেখকের সাথে ভাসানী সাহেবের কোনও এক লোকের মারফত কোনও একটি কথা হইয়াছে। এই বিশাল ফাঁইলের তিন-চারটি পত্রে তিন চার বারের বেশি মওলানা সাহেবের নাম নাই। তবু ঐ বিরাট ফাইলকেই মওলানার বিরুদ্ধে সিক্রেট ফাইল কেন বলা হইল, আমি তা বুঝিতে পরিলাম না। এই না বুঝার দরুন আরও বেশি করিয়া পড়িলাম। ভাবিলাম নিশ্চয়ই কিছু আছে, আমিই বোধ হয় বুঝিতে পারিনাই।
লিডার আসিয়াই জিগ্গাস করিলেন : ‘পড়িয়াছ ত?’ আমি ‘জি হাঁ’ বলিতেই আগ্রহভরে বলিলেন : ‘কি পাইলে?’ বলিলাম : ‘কেন মওলানাকে গেরেফতার করিতে হইবে, তার কোনও কারণ পাইলাম না।‘ প্রধানমন্ত্রী আশ্চর্য হইলেন। বল কি? তবে কি ঐ বিশাল ফাইলটায় কিছু নাই? যা যা আছে, খুঁটিয়া-খুঁটিয়া সব বলিলাম। তাঁর পর মন্তব্য করিলাম : ‘আমারে দিবার আগে আপনে নিজে কি তবে ওটা পড়েন নাই? আপনি পাইলেন, আমি পাইলাম না। তবে কি সার আমারে ভুল ফাইল দিয়া গেলেন?’ প্রধানমন্ত্রী হাসিলেন। ভূল ফাইল দেওয়া হয় নাই। তবে যে প্রেসিডেন্ট বলিলেন, ওটা পড়িলেই সাংঘাতিক সব কথা পাওয়া যাইবে। মওলানাকে আর এক মুহূর্ত জেলের বাইরে রাখা যয় না। প্রধানমন্ত্রী ও আমি একমত হইলাম : ওতে কিছু নাই। শুধু ফাইলের সাইয দিয়াই আমাদেরে কাবু করিবার উদ্দেশ্য ছিল।
