উভয়ে বলিলেন : নিশ্চয় সার, নিশ্চয়।
আমি এবার সরল হাসি মুখেই বলিলাম : এবারের জন্য আপনাদের সুপারিশ মানিয়া নিলাম। কিন্তু ভবিষ্যতে পূর্ব-পাকিস্তানের ভাগে ভাল ওয়েটেজ দিবেন ত?
এটা তাঁরা আশা করেন নাই। তাঁদের চোখ-মুখে স্বস্তির ভাব ফুটিয়া উঠিল। বলিলেন : তা আর বলিতে সার? বাস্তবিকই পূর্ব-পাকিস্তানীরা এতকাল বঞ্চিত হইয়া আসিয়াছে। সত্য বলিতে কি সার পূর্ব-পাকিস্তানীদের জন্য এমন করিয়া আর কোন মন্ত্রী–
শেষ করিতে দিলাম না। উঠিয়া মোসাফেহার জন্য হাত বাড়াইলাম। মুসাফেহা করিয়া সিঁড়ির মুখ পর্যন্ত তাঁদেরে আগাইয়া দিলাম।
পরদিন সেক্রেটারিয়েটে ছড়াইয়া পড়িল, এমন কড়া বদ-মেযাজী মন্ত্রী আর আসে নাই। বাংগালী অফিসাররা খুশী হইলেন। পশ্চিমারা গম্ভীর হইলেন। কলিগরা পুছ করিলেনঃ কি ঘটিয়াছিল বলুন ত!
২৬. ওযারতির ঠেলা
ওযারতির ঠেলা
ছাব্বিশা অধ্যায়
১. আই. সি. এ.এইড
ওদিকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিঃ ল্যাংলির সহায়তায় ও আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অবিরাম অধ্যবসায়ের ফলে যথাসময়ে ৫ কোটি টাকার ইণ্ডাষ্ট্রিয়াল মেশিনারি এইড মার্কিন সাহায্যের সুসংবাদ আমাদের কাছে আসিয়া পৌঁছিল। আমার আনন্দ দেখে কে? পূর্ব পাকিস্তানকে শিল্পায়িত করার আমার এতদিনের স্বপ্ন সফল হইতে যাইতেছে। পূর্ব পাকিস্তানী মন্ত্রীরা সবাই উল্লসিত হইলেন। পশ্চিম-পাকিস্তানী মন্ত্রীদের অনেকেই আমাকে কংগ্রেচুলেট করিলেন। অর্থ-উজির বন্ধুবর আমজাদ আলী তার মধ্যে একজন। প্রাপ্ত ৫ কোটি বিদেশী মুদ্রা দিয়া কি কি শিল্প প্রতিষ্ঠা করা যাইতে পারে, সে সম্পর্কে পূর্ব-পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান ও শিল্প-বাণিজ্য মন্ত্রী মুজিবুর রহমানের সহিত আলাপ করিয়া দফতরে-দফতরে যোগাযোগ করিতেছি এমন সময় প্রধানমন্ত্রী জনাব শহীদ সাহেব আমাকে ডাকিয়া বলিলেন : এই টাকা হইতে কিছু টাকা পশ্চিম পাকিস্তানে দিতে হইবে। আমি ঘোর প্রতিবাদ করিলাম। বলিলাম : ‘এই টাকা পূর্ব-পাকিস্তানের জন্য আনা হইয়াছে; এর এক কানাকড়িও পশ্চিম-পাকিস্তানের জন্য চান না বলিয়া অর্থমন্ত্রী ও অন্যান্য পশ্চিমা মন্ত্রীরা আমাকে কথা দিয়াছেন; এই টাকা নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠায় ব্যয়িত হইবে।’ ইত্যাদি অনেক যুক্তি দিলাম। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মাথা নাড়তে থাকিলেন। বলিলেন দেখ, এটা অবিচার হইবে। আমি শুধু পূর্ব-পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নই, উভয় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। আগের-আগের প্রধানমন্ত্রীরা পূর্ব-পাকিস্তানের উপর অবিচার করিয়াছে বলিয়া আমি পশ্চিম-পাকিস্তানের উপর অবিচার করিব না। আর তুমি যে নয়া শিল্প প্রতিষ্ঠার যুক্তি দিতেছ সে যুক্তিও আমি খণ্ডন করিতেছি না। পশ্চিম পাকিস্তানের নূতন শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য আমি টাকা চাই না। চতি শিল্পের র্যাশন্যালিযেশনের জন্য তুমি টাকা দিতে পার।
বলিয়া শিল্প-দফতরের বিঘোষিত গেযেট নটিফিকেশনটি বাহির করিয়া রেড বু পেন্সিলে-দাগ-দেওয়া একটা অংশ আমাকে দেখাইলেন। আমি বুঝিলাম প্রধানমন্ত্রী কাগপত্র দেখিয়া প্রস্তুত হইয়াই আমাকে ডাকিয়াছিলেন। সত্যই আমারই বিঘোষিত শি-নীতি ঘোষণায় বলা হইয়াছে : পশ্চিম-পাকিস্তানে নয়া শিল্প প্রতিষ্ঠিত হইবে না বটে, তবে চতি শিল্প র্যাশন্যালাইয করিবার উদ্দেশ্যে টাকা ব্যয় করা চলিবে।
আমি হার মানিলাম। প্রধানমন্ত্রী মুচকি হাসিয়া বলিলেন : বেশি না, এই তহবিল হইতে মাত্র এক কোটি টাকা পশ্চিম-পাকিস্তানকে দিয়া পশ্চিমা-ভাইদেরে দেখাইয়া দাও, আমরা তাঁদের চেয়ে বেশী বিচারী লোক।
তাই হইল। ঘোষণা করা হইল, পূর্ব-পাকিস্তানের নয়া শিল্প প্রতিষ্ঠার বাবদ চার কোটি ও পশ্চিম-পাকিস্তানের চলতি শিল্প র্যাশন্যালাইয করার জন্য এক কোটি ব্যয় হইবে। উভয় প্রাদেশিক সরকারকে এই মর্মে অবগত করান হইল এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত করিতে তাগিদ দেওয়া হইল। যথাসময়ে পূর্ব-পাকিস্তান সরকারের তরফ হইতে নয়া শিল্পের তালিকা লইয়া শিল্প-বাণিজ্য মন্ত্রী মুজিবুর রহমান সাহেব তাঁর অফিসারদের সহ করাচিতে আসিলেন এবং তথায় প্রস্তাবিত শিল্প স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কেন্দ্রীয় দফতরসমূহকে অবহিত করাইলেন।
কিন্তু এই সময়ে আমরা জানিতে পারিলাম, ঐ সাহায্যের টাকা দ্বারা টেক্সটাইল মিল অর্থাৎ পাট ও কাপড়ের কল করা চলিবে না। অন্য যে সব শিল্প প্রতিষ্ঠা করা হইবে তাও মার্কিন সরকারের পক্ষ হইতে আই. সি. এ. নামক মার্কিনী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত হইতে হইবে। অতএব উক্ত চারকোটি বিদেশী মুদ্রার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তান সরকার পাটকল ও কাপড়ের কল বাদে অন্যসব শিল্পের সংশোধিত স্কিম যথাসম্ভব শীঘ্র প্রস্তুত করিয়া কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন লইবেন এইরূপ নির্দেশ দেওয়া হইল। পূর্ব-পাক সরকার তদনুসারে নতুন করিয়া অনেকগুলি প্রজেক্ট তৈয়ার করিলেন।
অল্পদিনের পরেই আই. সি. এস.এ. প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হইতে চার-পাঁচ জন ‘প্রজেক্ট লিডার’ আসিলেন। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের তৈয়ারী প্রজেক্টসমূহ পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়া দেখাই তাঁদের উদ্দেশ্য। ভাল কথা। আমাদের টাকা দিয়া সাহায্য করিবেন, টাকাগুলি সত্যসত্যই আমাদের শিল্পায়নের কাজে লাগিতেছে কি না দেখিবেন না? আমাদের সরকার যে সব প্রজেক্ট বানাইয়াছেন, তার প্রত্যেকটির কার্যকারিতা তদিক করিয়া দেখিলে আমরা ত নিশ্চিত হই। কারণ আমাদের এক্সপার্টদের চেয়ে মার্কিন মুলুকের মত শিল্পোন্নত দেশের এক্সপার্টরা নিশ্চই অধিকতর জ্ঞানী ও নির্ভরযোগ্য। প্রজেক্ট লিডাররা পূর্ব-পাকিস্তানে আসিলেন। বেশ কিছুদিন থাকিলেন। সবকিছু বিচার-বিবেচনা করিয়া পূর্ব-পাকিস্তান হইতে তাঁরা বিদায় হইলেন। আমরা জানিলাম, পূর্ব-পাক সরকারের প্রস্তুত প্রজেক্টগুলি তাঁরা পুংখানুপুংখরূপে ত্যদিক করিয়া তার মধ্যে ৫৮টি শিল্প অনুমোদন করিয়াছেন এবং প্রস্তাবিত শিল্পপতিদের অর্থনৈতিক ও অন্যান্য যোগ্যতাও তাঁরা পরীক্ষা করিয়া ঝাড়াই-বাছাই করিয়াছেন।
