দুইজনই পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে থাকিলেন। একটুও নড়িলেন না। আমি তাগিদের সুরে বলিলাম। একজন সংশ্লিষ্ট এমবেসিতে টেলিফোন করুন। আরেকজন টেলিগ্রামের মুসাবিদা করুন এখানেই। ঐ যে সামনেই প্যাড আছে। কাগ কলমহাতে নিন।
অতবড় ঝানু দোর্দণ্ডপ্রতাপ দুইটি আ. সি. এস. সি. এস. পি. নয়) অফিসার অমনোযোগী অপরাধী ছাত্রের মত বসিয়া রহিলেন। আর আমি পাঠশালার কড়া গুরুর মত আদেশ দিতে লাগিলাম। আমার ভাষায় তিরস্কারের উবা নাই। কিন্তু অনমনীয়তার দৃঢ়তা আছে। তাঁদের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তায় রাগ করিলাম না। মৃদু হাসিলাম। বলিলাম : আপনারা দেরি করিতেছেন কেন? কিছু ভাবিতেছেন কি? কিছু বলিতে চান?
ছোটটির দিকে এক নজর চোখ বুলাইয়া বড়টি বলিলেন : বেআদবি মাফ করিবেন সার, একটা কথা আরয করিতে চাই।
আমি যেন কত জ্ঞানী অভিজ্ঞ মুরবি। যেন ভীতিগ্রস্ত নাবালকদের মনে সাহস ভরসা দিতেছি এমনিভাবে হাসি মুখে বলিলাম : বলুন বলুন। তাঁরা উভয়ে পালা করিয়া এ-ওঁরে সমর্থন করিয়া যা বলিলেন, তার মর্ম এই যে বিদেশী সরকারকে টেলিগ্রাম ও এমবেসিতে টেলিফোন করিবার আগে তাঁরা নিশ্চিত হইতে চান, ঐসব কাগ-পত্র সত্য-সত্যই চলিয়া গিয়াছে কিনা। কারণ যদিও বেশ কিছুদিন আগে সহি-সাবুদ হইয়া লিকাটা ও সংগীয় আবশ্যকীয় কাগয়-পত্র তাঁদের দফতর হইতে চলিয়া গিয়াছে, কিন্তু সত্য-সত্যই করাচির বাইরে চলিয়া গিয়াছে কি না তাঁরা তা বলিতে পারেন না। কত যে ফর্মালিটির দেউড়ি পার হইয়া চিঠি-পত্র বাইরে যায় তা আমি আন্দায করিতে পারিনা।
আমি মুচকি হাসিলাম। সে হাসির অর্থ তাঁরা বুঝিলেন। তাঁদের চালাকি ধরা পড়িয়াছে। কিন্তু কি সাংঘাতিক ঝানু-বুরোক্র্যাট! একটু শরমিন্দা হইলেন না। হইলেও বাহিরে সে ভাব দেখাইলেন না। আমি বলিলাম : যাক, এখন আপনাদের তালিকা বদলাইয়া নয় জনের পাঁচ জন পূর্ব-পাকিস্তানী ও চারজন পশ্চিম পাকিস্তানীর একটা নূতন তালিকা করুন। এতদিন পূর্ব-পাকিস্তানীরা বাদ গিয়াছে বলিয়া তাদেরে একটু ওয়েটেজ দেওয়া দরকার। কি বলেন?
উভয়ে সমস্বরে বলিলেন : তা বটেই সার। তাত বটেই। কথায় জোর দিবার জন্য খুব জোরে মাথা ঝুকাইলেন এবং বলিলেন : পূর্ব-পাকিস্তানী কারে-কারে দিব, নাম বলিয়া দিলে ভাল হয় সার।
টেবিলের উপর হইতে চট করিয়া একশিট কাগ নিয়া একজন কলম উঠাইয়া আমার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন।
আমি আবার একটা মুচকি হাসি-হাসিয়া বলিলাম। আমি নূতন মন্ত্রী হইয়াছি। অফিসারদের সঙ্গে এখনও যথেষ্ট পরিচয় হয় নাই। অফিসারদের কার কি গুণ, কে পূরবী আর কে পশ্চিমা আমি বিশেষ খবর রাখি না। আর অফিসার বাছাই করিতে আপনারাই বা মন্ত্রীর মতামত জিগ্গাসা করেন কেন? আপনারা অভিজ্ঞ সিনিয়র অফিসার। অধীনস্থ অফিসারদেরও ভালরূপ জানেন। কার কি ট্রেনিং দরকার তাও আপনারাই ভাল বুঝেন। কাজেই তালিকাটা আপনারাই করিবেন। শুধু দেখিবেন, পূর্ব পশ্চিমের আমার নির্দেশিত রেশিও যেন ঠিক থাকে।
সেক্রেটারিদ্বয় পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিলেন। স্পষ্ট নৈরাশ্যের এবং বিস্ময়ের ভাব। একটা অফিসার-তালিকা বদলাইবার জন্য মন্ত্রী সাহেব এমন আকাশ-পাতাল তোলপাড় করিলেন, অথচ তাঁর নিজের একটা লোকও নাই? এটা কিরূপে সম্ভব? কিন্তু এঁদেরে দোষ দিয়া লাভ নাই। এতেই এঁরা অভ্যস্ত। আমার
বেলায়ও গোড়া হইতেই এই সন্দেহই তাঁরা করিয়াছিলেন।
আমি গম্ভীরভাবে বলিলাম : আর কিছু বলিবার আছে?
উভয়ে সমস্বরে বলিলেন : না সার।
আমি চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া বিশাল টেবিল পাথালি হাত বাড়াইয়া দিলাম। তার অর্থ : এইবার আপনারা বিদায় হন।
উভয়ে ঝটপট করিয়া উঠিয়া মাথা অতিরিক্ত নোওয়াইয়া মুসাফেহা করিয়া বিদায় হইলেন।
অফিস হইতে ফিরিয়া দুপুরের খানা খাইতে বাজিত আমার তিনটা। খাওয়ার পর বিছানায় লম্বা গইড় দিয়া হুক্কা টানিতে-টানিতে ঘুমাইয়া পড়িতাম। উঠিলাম একেবারে পাঁচটায়। বিকালে অফিস করিতাম বাসাতেই।
সেদিন পাঁচটায় উঠিয়া চা খাইবার সময় প্রাইভেট সেক্রেটারি খবর দিলেন সেই সেক্রেটারিদ্বয় দেড় ঘন্টার বেশি নিচের ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করিতেছেন। তাড়াতাড়ি তাঁদেরে উপরে ডাকিয়া আনিলাম। একেবারে বিনয়-নম্রতার অবতার! ফাইলপত্র সব নিয়াই আসিয়াছেন। কত হাঙ্গামা করিয়া গোটা সেক্রেটারিয়েট তচনচ্ করিয়া ডিচপ্যাঁচ দফতর পর্যন্ত ধাওয়া করিয়া কথিত ফাইলটি উদ্ধার করিয়াছেন। একজন বলেন, অপরজন সমর্থন করেন। আমি চোখ কপালে তুলিয়া মুচকি হাসিলাম। অমানুষিক পরিশ্রমের জন্য ধন্যবাদ দিলাম। তাঁরা বুঝিলেন ওঁদের একটা কথাও আমি বিশ্বাস করিলাম না। কিন্তু তাঁরা বিন্দুমাত্র লজ্জা পাইলেন না। বলিলেন : সার, আপনার আদেশ মতই তালিকা করিয়াছি। শুধু আপনার অনুমোদন-সাপেক্ষে একটা রদ-বদল করিয়াছি। উভয় প্রদেশে চারজন-চারজন করিয়া দিয়া করাচিকে একজন দিয়াছি। তবে যদি সারের আপত্তি থাকে তবে ওটা কাটিয়া আরেকজন পূর্ব-পাকিস্তানী দিতে পারি। সে নামও আমাদের কাছে আছে। এখন সারের যাহুকুম।
বলিয়া ফাইলটা আমাকে দেখাইবার জন্য একজন উঠিয়া আমার দিকে আগ বাড়িলেন। আমি হাতের ইশারায় তাঁকে বিরত করিয়া বলিলাম : যে-যে মিনিস্ট্রির অফিসার তালিকাভুক্ত করিয়াছেন, তাঁদের সুপারিশ মতই করিয়াছেন ত?
