আগেই বলিয়াছি, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা আমার অমন ভাল উপদেশটাও সন্দেহের চক্ষে দেখিতেন। কাজেই তাঁরা আমার কথা রাখেন নাই। সুখের বিষয় মার্শাল লর আমলে সরকার একরূপ জোর করিয়াই যুক্ত চেম্বার-অব-কমার্স এণ্ড ইণ্ডাষ্ট্রিজ করাইয়াছেন। এতদিনে নিশ্চয় তাঁরা বুঝিয়াছেন এতে তাঁদের ভালই হইয়াছে।
১২. চাকুরিতে পূর্ব-পাকিস্তানী
মন্ত্রী হিসাবে আমার অপর উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চাকুরিতে পূর্ব-পাকিস্তানীদের দাবি যথাসম্ভব পূরণের চেষ্টা করা। চাকুরি-বাকুরিতে প্যারিটির পক্ষে আমি যত বক্তৃতা করিয়াছি, তেমন আর কেউ করেন নাই। কিন্তু কিছুদিন মধ্যেই আমি বুঝিয়াছিলাম স্বাভাবিক অবস্থায় প্যারিটি দাবি করা অবাস্তব, আশা করা পাগলামি। একথা আমাকে সমঝাইয়াছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের উচ্চ পদাধিকারী একজন রাষ্ট্র নেতা। তিনি আমাকে অত্যন্ত সরলভাবে বলিয়াছিলেন : মনে রাখিও মুসলমানেরা ভারতে সরকারী চাকুরিতে অংশ দাবি করায় হিন্দুরা তাদের ভারত মাতাকে দ্বিখণ্ডিত করিতে রাযী হইয়াছে তবু চাকুরিতে অংশ বসাইতে দেয় নাই। অতঃপর প্যারিটি লাভের আশা মনে মনে ত্যাগ করিলেও মুখে-মুখে প্যারিটির কথা পুনঃপুনঃ উচ্চারণ করিতাম। তাই আমার অধীনস্থ দুইটা দফতরে কোনও ভ্যাকেন্সি হইলেই পূর্ব পাকিস্তানী নিবার প্রস্তাব দিতাম। আমার অভিপ্রায় ব্যাহত করিবার জন্য অফিসারেরা কত যে প্রথারীতি আইন-কানুন রুল ও রেগুলেশন দেখাইতেন তাতে আমার মত অনভিজ্ঞ ও অল্পবুদ্ধির লোক ভেবাচেকা খাইতে বাধ্য হইত। রাগ করা ছাড়া কোন উপায় থাকিত না। আমার রাগকে বিষহীন ধোঁড়া সাপের ফনা মনে করিয়া অফিসাররা বোধ হয় আস্তিনের নিচে হাসিতেন। অনেক ঘটনার মধ্যে একটির কথা বলিতেছি।
আমার কথামত একজন ‘পূর্ব-পাকিস্তানীকে’ তাঁরা একবার চাকুরি দিলেন। আমার সন্দেহ হওয়ায় কাগপত্র তলব করিয়া দেখিলাম। একজন লোক মাত্র দুই বছর আগে মাদ্রাজ হইতে পাকিস্তানে আসিয়াছেন। তাঁর কোনও আত্মীয় কোয়েটার চাকরি করেন। সেখানেই তিনি দুই বছর যাবত আছেন। পূর্ব পাকিস্তানীর কোটায় এই চাকুরিটি খালি হওয়ার পর ঐ যুবক পূর্ব-পাকিস্তানী হিসাবে দরখাস্ত করিয়াছেন। দফতর হইতে তাঁর নাম পাবলিক সার্ভিস কমিশনের বিবেচনার জন্য পাঠান হইয়াছে। কমিশন যথারীতি কর্তব্য করার পর তাঁর নিয়োগ সুপারিশ করিয়াছেন। তিনি চাকরিতে বহাল হইয়াছেন। কোয়েটাবাসী মাদ্রাজী যুবক পূর্ব-পাকিস্তানী হইলেন কিরূপে? অতি সহজে। ঢাকা জিলা কর্তৃপক্ষ সার্টিফিকেট দিয়াছেন যে উক্ত যুবক এক বৎসরের অধিককাল পূর্ব-পাকিস্তানের ডমিসাইল। আমার তালু-জিহ্বা লাগিয়া গেল। আমি এ বিষয় লইয়া ভোলপাড় শুরু করিলাম। কমিশন ঠিকই জানাইলেন সরকারী ডমিসিল সার্টিফিকেট পাইবার পর ও বিষয়ে আর তাঁদের করণীয় কিছু ছিল না। আমাকে শান্ত করিবার জন্য বিভিন্ন দিক হইতে এবং অফিস ফাঁইলে এমনও ‘নোট’ আসিল যে একজন পাকিস্তানীর চাকুরি যেভাবেই হউক যখন হইয়া গিয়াছে, তখন এটা নিয়া এখন হৈ চৈ করা ঠিক হইবে না। আমাদের স্মরণ রাখিতে হইবে ত যে ভারত হইতে আগত মোহাজেরদেরও আমাদের চাকুরি-বাকুরিতে একটা দাবি আছে। সব নোটর শেষে আমি লিখিতে বাধ্য হইলাম। কিন্তু একথাও আমাদের স্মরণ রাখিতে হইবে যে পাকিস্তানের দুইটি মাত্র উইং। ভারতে ইহার কোনও তৃতীয় উইংনাই।
আরেকটি ঘটনা আরও মর্যাদার। বিভিন্ন দফতরের অফিসারদেরে বিদেশে ট্রেনিং দেওয়ার জন্য ১ জন অফিসার পাঠাইতে হইবে। আমার কাছে অভিযোগ আসিল সিলেকশনে একজন পূর্ব-পাকিস্তানীও নেওয়া হয় নাই। আমি তখন অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী। কাজেই সংশ্লিষ্ট দফতরের সেক্রেটারিকে ডাকিয়া পাঠাইলাম। তিনি একা আসিলেন না। সঙ্গে আনিলেন জয়েন্ট সেক্রেটারিকে। আমি তাঁদের কাছে আমার উদ্দেশ্য বলিলাম। তাঁরা পূর্ব-পাকিস্তানী একাধজন পাঠান নিতান্ত উচিত ছিল স্বীকার করিয়াও পরিতাপের সাথে বলিলেন : বড় দেরি হইয়া গিয়াছে সার। নামগুলি বিদেশে পাঠান হইয়া গিয়াছে। তাঁরা সেজন্য বড়ই দুঃখিত। আয়েন্দাতে তাঁরা এর ক্ষতিপূরণ করিয়া দিবেন। আমি তাঁদের আশ্বাসে আশস্ত হইলাম না। বলিলাম : ওটা ফিরান যায় না? তাঁরা বলিলেন : অসম্ভব। কারণ ওটা এতদিনে গন্তব্য স্থানে যদি পৌঁছিয়া নাও থাকে তবে পথিমধ্যে আছে। পাকিস্তানের বাহিরে চলিয়া গিয়াছে নিশ্চয়। ততক্ষণে আমার যিদ বাড়িয়া গিয়াছে। কিন্তু ভিতরের গরম গোপন করিয়া শান্তভাবে বলিলাম : এক্ষুণি এই মর্মে উক্ত সরকারের কাছে ক্যাবল করিয়া দেন যে ঐ নামগুলি বাতিল করা হইল, নূতন নামের তালিকা অনতিবিলম্বেই পাঠান হইতেছে।
একটু দম ধরিয়া বলিলাম আর হ, এক্ষুণি টেলিফোনে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে বলিয়া দেন যে ঐ মর্মে আমরা তাঁদের সরকারকে ক্যাবল করিয়াছি। তাঁরাও তাঁদের সূত্রে তাঁদের সরকারকে পাকিস্তান সরকারেরমত জানাইয়া দেন।
দুইজন অফিসারই পুরান অভিজ্ঞ আই. সি. এস, দোর্দণ্ডপ্রতাপ বলিয়া সারা সেক্রেটারিয়েটে সুনাম আছে। অতিশয় দক্ষ অফিসার তাঁরা। কিন্তু আমার এই সব কথার পিঠে কোনও কথাও বলিলেন না। আমার হুকুম তামিলের কোনও লক্ষণও দেখাইলেন না।
আমি আমার টেবিলের একাধিক টেলিফোন গুলি দেখাইয়া বলিলাম : কই বিলম্ব করিতেছেন কেন? টেলিফোন করুন।
