অবশেষে ক্ষুধায় ক্লান্ত পিয়াসে শুকনা-মুখ ও স্ত্রীর রাগে মেযাজ খারাপ করিয়া তিনটার পরে যখন বাসায় ফিরিতাম, তখন দেখিতাম গেট হইতে সিঁড়ি পর্যন্ত মোলাকাতীর ভিড়। দারওয়ান, ডাইভার, বডিগার্ড, প্রাইভেট সেক্রেটারি সকলের তাগাদা এ অনুরোধ সত্ত্বেও তাঁরা পথ ছাড়িতেন না। কাজেই গেটেই গাড়ি হইতে নামিয়া হাঁটিয়া ঘর পর্যন্ত পৌঁছিতে আমার খুব কম করিয়া হইলেও আধঘন্টা লাগিত। আমি ক্ষিধায় মারা গেলাম, রোগী মানুষ, ঔষধ খাইতে হইবে ইত্যাদি কত আবেদন নিবেদন করিতাম হাতজোড় করিয়া। বডিগার্ড ও গেটকিপাররা পুলিশের লোক। তারা বাধ্য হইয়া প্রথম-প্রথম পুলিশী মেযাজ ও কায়দা দেখাইতে চাহিত। আমি ধমক দিয়া বারণ করিতাম। কারণ আমি মোলকাতীদেরই চাকর। কিন্তু আমার মনিব’রা আমার স্বাস্থ্য ও সুবিধার কথা চিন্তা করিয়া আমাকে ছাড়িয়া দিতেন না। তাঁদের পক্ষেও যুক্তি ছিল। বহুদূর হইতে তাঁরা আসিয়াছেন। করাচিতে অত-অত করিয়া আর থাকিতে পারেন না। তুলনায় তাঁদের অসুবিধা কত। আমার ত মাত্র একদিনই খাওয়ার সামান্য বিলম্ব হইবে। এইটুকু অসুবিধা কি আমি তাঁর জন্য মানিয়া নিব না? সকলেরই ঐ এক কথা। সকলেই মনে করেন তাঁর অসুবিধাটাই বড়। সকলেই মনে করেন, তারটা শুনিলেই আমার কর্তব্য শেষ হইবে। সমবেত লোকদের সকলকে পাঁচ মিনিট করিয়া শুনিলেও আমাকে ঐখানেই রাত দশটা পর্যন্ত ঠায় দাঁড়াইয়া থাকিতে হইবে, একথা যেন কারও মনে পড়ে না। প্রত্যেক দিনের এই দর্শনার্থীদের ধারণা শুধু ঐ একটা দিনই আমি তিনটার সময় অভুক্ত ক্লান্ত ও পিপাসার্ত হইয়া বাড়ি ফিরিতেছি। কাজেই একটা দিন না খাইয়া থাকিলেই বা কি? তাঁরা নিজেরা কতদিন অমন সারাদিন অনাহারে থাকিয়া রাত্রে খানা খাইয়াছেন। আমি মন্ত্রী হইয়াছি বলিয়াই কি তা পারিব না? তাঁদের দিক হইতে ঐ অভিযোগ ঠিক। কারণ তাঁরা সকলে জানিতেন না, জানিলেও বুঝিতেন না, যে ঐ এক দিন নয়, দিনের পর দিন মাসের পর মাস এই গরিব বেচারা মন্ত্রীর উপর দিয়া অমনি ধরনের মোলাকাতীর ঝড়-তুফান চলিতেছে।
কাজেই দেওয়ানী কার্যবিধি-আইন চালাইয়া নিজেকে বাঁচাইলাম। কয়েকদিন সময় লাগিল।অফিসে ও বাড়ির সাইনবোর্ডে খবরের কাগযে প্রেসনোট এবং ব্যক্তিগত পত্রের জবাবে এই নব-বিধান প্রচারিত হইতে কয়েক দিন কাটিয়া গেল। আল্লার মর্জিতে তারপর সব পরিষ্কার। বাড়ির বৈঠকখানা ওয়েটিং রুম বারান্দা এবং অফিসের ওয়েটিং রুম একেবারে সাফ। শূন্য ময়দান খা খা করিতেছে। নিজের বুদ্ধির তারিফ করিলাম নিজেই। অফিসাররাও বাহ-বাহ করিতে লাগিলেন। দর্শনাভিলাষীরা গাল দিতে লাগিলেন। সভা-সমিতি ও পথে-ঘাটে প্রতিবাদ করিতে লাগিলেন। আমি নীরবে, নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে অফিসের কাজে ও পলিসি নির্ধারণে প্রচুর সময় পাইলাম ও তার সদ্ব্যবহার করিলাম।
১১. শিল্প-বাণিজ্যের যুক্ত চেম্বার
শিল্প-বাণিজ্য দফতরের সংস্কার প্রবর্তন ছাড়াও আমি স্বয়ং শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের চেষ্টাও করিয়াছিলাম। এই উদ্দেশ্যে আমি চেম্বার অব-কমার্স ও চেম্বার-অব-ইণ্ডাস্ট্রিসকে একত্রে করিয়া চেম্বার-অব-কমার্স এও ইণ্ডাস্ট্রিজ করিবার পরামর্শ দেই। উভয় চেম্বারের নেতাদের সভা ডাকিয়া বক্তৃতা করি। মন্ত্রী হিসাবে যেখানেই এঁরা আমাকে অভ্যর্থনা-অভিনন্দন দিয়াছেন সেখানেই আমি এই উপদেশ বর্ষণ করিয়াছি। শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা, প্রতিযোগিতা হইতে রেষারেষি, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে শত্রুতার ভাব, বিদ্যমান ছিল। কাজেই তাঁরা আমার উপদেশ মানেন নাই। বরঞ্চ তাঁদের স্বার্থবিরোধী কথা বলিতেছি মনে করিয়া অনেকেই আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হইয়াছেন। আমার কার্যকলাপে শিল্পপতি ও সওদাগরদের অনেকেই আমাকে তাঁদের দুশমন মনে করিতেন। কাজেই আমার দ্বারা তাঁদের স্বার্থের অনুকূল কোনও সদুপদেশ সম্ভব, এটা তাঁরা বিশ্বাস করিতেন না। আমি কিন্তু সত্য-সত্যই তাঁদের ঐক্যে বিশ্বাস করিতাম। আমি মনে করিতাম তাঁদের ঐক্যে সরকার ও তাঁরা নিজেরা উভয় পক্ষই লাভবান হইবেন। দেখিয়া শুনিয়া আমার এই অভিজ্ঞতা হইয়াছিল যে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে যতদিন সমাজবাদের প্রতিষ্ঠা না হইতেছে, ততদিন সংঘবদ্ধ শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের যুক্ত উপদেশ পাওয়া সরকারের সুষ্ঠু নীতির জন্য অপরিহার্য। ব্যক্তিগতভাবে কোনও শিল্পপতির বা ব্যবসায়ীর কিছু না করার একমাত্র রক্ষাকবচ এঁদের চেম্বার। ওঁদের যা বলার চেম্বার হইতে বলা হউক, এই কথা বলিতে পারিলেই আপনি ব্যক্তি সন্তুষ্টির চাপ হইতে রক্ষা পান। ঠিক তেমনি পৃথক-পৃথকভাবে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের সন্তুষ্টির চাপ হইতে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র প্রতিষেধক তাঁদের যুক্ত প্রতিষ্ঠান। আমি অল্পদিনের অভিজ্ঞতা হইতেই বুঝিতে পারিয়াছিলাম বাণিজ্যনীতি নির্ধারণ ও ঘোষণার সময় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা শুধু যার-তার সম্প্রদায়ের স্বার্থ বিবেচনা করিয়া তদবির ও চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেন। তাঁদের অনুরোধ বা সুপারিশ শুধু পরস্পরের বিরোধী হয় না, সরকার ও দেশের স্বার্থবিরোধীও হইয়া থাকে। সেজন্য আমি তাদের মধ্যে বক্তৃতা করিয়া সরলভাবে আমার মনের কথা যেমন বলিলাম, তেমনি তাঁদের শক্তিবৃদ্ধির নিশ্চিত সম্ভাবনাও দেখাইলাম। আমি বলিলাম : শিল্প ও বাণিজ্য-নীতি নির্ধারণে সরকার কোনও ভুল না করেন, সেজন্য শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী উভয় সম্প্রদায়ের সুচিন্তিত ও সংঘবদ্ধ উপদেশ পাওয়া দরকার। সরকার ভুল করিলে দেশবাসীর সাথে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদেরও ক্ষতিগ্রস্ত হইতে হয়। সেজন্য সরকারকে উপদেশ দেওয়ার অধিকার ও দায়িত্ব তাঁদের। আর সংঘবদ্ধভাবে উপদেশ দিলে সরকার সে উপদেশ মানিতে বাধ্য হইবেন।
