৯. দেওয়ানী কার্যবিধির প্রবর্তন
লাইসেন্সিং ব্যাপারে আমার আরেকটি সংস্কার একেবারে ছিল অভিনব ধরনের। এটি ছিল দেওয়ানী কার্যবিধি আইনের ব্যবস্থা প্রবর্তন। দেওয়ানী কার্যবিধিতে মামলার পক্ষগণের প্রতিকারের উপায় তিনটি : রিভিউ, আপিল ও রিভিশন। আমি লাইসেন্সিং ব্যাপারে এই তিনটি স্তরের প্রবর্তন করিলাম। লাইসেন্স ইশুর ব্যাপারে কারও আপত্তি থাকিলে প্রার্থীকে সর্বপ্রথম ইশুইং অফিসারের কাছে রিভিউ পিটিশন দিতে হইবে। তাঁর বিচারে যে পক্ষ আপত্তি করিবেন তিনি বাণিজ-সেক্রেটারির কাছে আপিল দায়ের করিবেন। সেক্রেটারির উভয় পক্ষকে যথাযোগ্য শুনানি দিবার পর রায় দিবেন। সেই রায়ে যে পক্ষের আপত্তি থাকিবে, তিনি সর্বশেষ পন্থা হিসাবে মন্ত্রীর কাছে রিভিশন পিটিশন দায়ের করিবেন। এই তিন প্রকারের দরখাস্তে দেওয়ানী মোকদ্দমার মতই নির্ধারিত হারে কোট-ফি দেওয়ার আইন করিলাম।
এই ব্যবস্থা করিয়াছিলাম, প্রধানতঃ মন্ত্রীর সাথে মোলাকাতীর ভিড় কমাইবার উদ্দেশ্যে। তাছাড়া এই ব্যবস্থায় প্রকৃত অবিচারিত লোকদের উপকার হইয়াছিল। কিভাবে, এখানে তার উল্লেখ প্রয়োজন। মন্ত্রীদের দরবারে স্বভাবতঃই সমর্থক ও উপকার-প্রত্যাশীদের ভিড় হয়। হওয়া স্বাভাবিক। মন্ত্রীরা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। নিয়ম-কানুনের সাত দরজা প্য হইয়া মন্ত্রীদের সাক্ষাৎ পাওয়া এবং নিজেদের দুঃখের কথা বলার সুযোগ অ লোকের ভাগ্যেই ঘটিয়া থাকে। কাজেই মন্ত্রীরা মফস্বলে সফর করিতে বাহির হইলে অভিনন্দন-সম্বর্ধনার নামে এবং ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ-মোলাকাত করিয়া তাঁরা নিজেদের অভাব-অভিযোগের কথা বলেন। রাজধানীতে আসিয়া তাঁরা অফিসে দেখা-সাক্ষাতের আশা ত্যাগ করিয়া মন্ত্রীদের বাড়িতে ভিড় করেন। রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে এটা আমার জানা ছিল। জন প্রতিনিধি হিসাবে এ ব্যাপারে আমি খুবই সচেতনও ছিলাম। কাজেই ফাইলপত্র ডিসপোয় করা বিলম্বিত হওয়া সত্ত্বেও সাক্ষাৎ-প্রার্থীদের সহিত অল্পক্ষণের জন্য হইলেও মোলকাত দিতাম। এই ধারণা ও পণ লইয়াই আমি মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিয়াছিলাম। প্রথম-প্রথম চালাইলামও ঐভাবে। কিন্তু নয়া রাষ্ট্র পাকিস্তানের শিল্প দফর ও বাণিজ্য দফতর যে কত বড় মহা সমুদ্র এবং তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট মোলাকাতীর সংখ্যা যে কি পরিমাণ হইতে পারে, মন্ত্রিত্ব জীবনের ছয় মাস যাওয়ার আগে তা সঠিকভাবে অনুভব করিতে পারিলাম না। যখন পারিলাম, তখন আমার অনাহারে মরিবার দশা। সকালে ছয়টার সময় হইতেই দর্শনপ্রার্থীর ভিড়। একাধিক ড্রয়িং রুম, অফিস ঘর, ওয়েটিং রুম ও বারান্দাসমূহ লোকারণ্য। গোসল নাশতা সারিয়া সাতটার আগে নিচে নামা সম্ভব হইত না। সাতটা হইতে নয়টা পর্যন্ত বাড়িতে মোলাকাতীদের চার ভাগের একভাগ লোককেও দেখা দিয়া সারিতে পারিতাম না। এদের সকলেই বিনা-এপয়েন্টমেন্টে আসিয়াছেন। সুতরাং প্রাইভেট সেক্রেটারিরাই এদের ক্রম নির্ধারণ করিয়া এক জনের পর আরেক জনকে আমার সামনে আনিতেন। এ ব্যাপারে প্রাইভেট সেক্রেটারিদের বিবেচনাকেই চূড়ান্ত বলিয়া না মানিয়া উপায় ছিল না। কিন্তু দর্শনপ্রার্থী যাঁরা পিছে পড়িতেন এবং তার ফলে বাদ পড়তেন, তাঁদের অনেকের অভিযোগ ছিল যে প্রাইভেট সেক্রেটারিরা পক্ষপাতিত্ব করিয়া তাঁদের পিছে ফেলিয়াছেন এবং ঐ কৌশলে মন্ত্রীর সাথে তাঁদের মোলাকাত হইতে দেন নাই। এই শ্রেণীর অভিযোগের কোনও সীমা ছিল না। প্রতিকারের কোনও উপায় ছিল না। _ তারপর ঘড়ির কাঁটায়-কাঁটায় নয়টার সময় উঠিয়া পড়িতাম। মোলাকাতীদের এড়াইয়া পিছনের গেট দিয়া বাহির হইয়া পড়িতাম। এই উদ্দেশ্যে ড্রাইভার গাড়ি লইয়াঅফিস ঘরের ঠিক পিছনেই অপেক্ষা করিতে থাকিত।
১০. মন্ত্রীর দুদর্শা
আফিসে কিন্তু মোলাকাতীর ভিড় ঠেলিতে হইত না। মোলাকাতী থাকিতেন ঢের। কিন্তু তাঁদের জন্য ওয়েটিং রুম ছিল। বান্দায় দাঁড়াইয়া থাকিতে দেওয়া হইত না। লম্বা বারান্দার আগা-গোড়াই সেক্রেটারি, জয়েন্ট-সেক্রেটারি ও ডিপুটি সেক্রেটারিদের অফিস-ঘর। কাজেই আমি যখন এক প্রান্তের সিঁড়ি দিয়া দূতালায় উঠিয়া আগাগোড়া বারান্দাটা হাঁটিয়া অপর প্রান্তে আমার অফিসে ঢুকিতাম, তখন সবগুলি অফিস-ঘরের সামনে দিয়া আমার যাওয়া, প্রকারান্তরে পরিদর্শন, হইয়া যাইত। অথচ মোলাকাতীরা আমার পথ আটকাইয়া দাঁড়াইতে পারিতেন না। আমি অসুস্থ বলিয়া ডাক্তারদের এবং বিশেষ করিয়া আমার স্ত্রীর তাগিদ ছিল ঠিক একটার সময় বাসায় ফিরিয়া খানা খাইতে হইবে। দুইটার মধ্যে খানা শেষ করিয়া পান খাইয়া ও হার নল মুখে লইয়া বিছানা লইতে হইবে। দুই ঘন্টা ঘুমাইয়া চারটা সাড়ে চারটায় উঠিতে হইবে। আধ ঘন্টায় হাত-মুখ ধুইয়া বিকালের চা খাইয়া তারপর বাসার অফিস ঘরে বসিতে পারা যাইবে।
কিন্তু কার্যতঃ তা হইতে পারি না। কারণ অফিসের চার ঘন্টা সময়ের মধ্যে সেক্রেটারি-প্রাইভেট সেক্রেটারিরা পরামর্শ করিয়া মাত্র এক ঘন্টা মোলাকাতের জন্য রাখিতেন। বাকী তিন ঘন্টা মিনিট-সেকেণ্ড হিসাব করিয়া অফিসের কাজ ও বিদেশী ডেলিগেশন ইত্যাদির জন্য মোরর করিতেন এবং সময় ঠিক রাখিবার কড়াকড়ি চেষ্টা করিতেন। বিদেশী ডেলিগেশন ইত্যাদি ঠিক টাইম মত আসিতেন। আফিসের ফাইল-পত্র দেখা ও অফিসারদের সাথে আলোচনা নির্ধারিত সময়-মতই হইয়া। যাইত। কিন্তু মুশকিল হইত মোলাকাতীদেরে লইয়া। প্রাইভেট সেক্রেটারি হয়ত প্রতিজনের জন্য পাঁচ-ছয় মিনিট করিয়া এক ঘন্টায় দশজন মোলাকাতী রাখিলেন। তাঁদের একাজে অসুবিধা হইত না। কারণ চিঠিপত্র-যোগে এপয়েন্টমেন্ট না করিয়া এখানে কেউ মন্ত্রীর সাক্ষাৎ পাইতেন না। কিন্তু মুশকিল হইত আমার। বোধ হয় সব মন্ত্রীরই। কারণ পাঁচ মিনিটের জন্য প্রবেশাধিকার দেওয়া হইলেও আধঘন্টা অন্ততঃ দশ-পনর মিনিটের কমে কেউ বাহির হইতেন না। আফিসের কাজ শুরু করিবার আগে মোলাকাতী শেষ করার নিয়ম ছিল। কিন্তু আমি এই নিয়ম পাল্টাইয়া দিয়াছিলাম। আফিসের কাজ শেষ করিয়াই মোলাকাত শুরু করিতাম। তদনুসারে মোলকাতীরা আগের মত সকালে না আসিয়া বিকালে আসিতেন। তাঁদের পাওয়া পত্রে অবশ্যই মোলাকাতের সময় ঘন্টা-মিনিটিসহ লেখা থাকিত। কিন্তু প্রথম মোলাকাতী ছাড়া আর কেউ সেই নির্ধারিত সময়ে সাক্ষাৎ পাইতেন না। কারণ প্রথম মোলাকাতীই বেশি সময় নিয়া পরবর্তীদের আনুপাতিক হারে পিছাইয়া দিতেন। যেহেতু আফিসের কাজ আগেই শেষ হইয়া যাইত, সেইজন্য নির্দিষ্ট সব মোলাকাতী শেষ না করিয়া আমি উঠিলাম না। মনে করিতাম, বেচারা আগে হইতে এপয়েন্টমেন্ট করিয়া আসিয়াছেন। তাঁকে মোলাকাত দেওয়া আমার অবশ্য কর্তব্য। অপরাপর মোলাকাতীরা তাঁদের প্রাপ্য সময়ের বেশি সময় নিয়াছেন বলিয়া কাউকে ত বঞ্চিত করা যায় না। সময় কন্ট্রোল না করার জন্য কাউকে যদি শাস্তি পাইতে হয়, তবে আমাকেই। কাজেই শাস্তি আমিই বহন করিতাম। মোলাকাত শেষ করিতে-করিতে প্রায়ই আমার তিনটা বাজিয়া যাইত। বাড়ি হইতে স্ত্রীর কম-সে-কম দশটা টেলিফোন পাইতাম। প্রথম প্রথম অনুরোধ, তারপর তাগাদা, তারপর ধমক ও রাগ। আসি-আসি করিয়াও আসিতে পারিতাম না। প্রাইভেট সেক্রেটারিরাও তাগিদ করিতেন। শুকনা হাসি-হাসিয়া বলিতাম : আর কতজন আছেন?
