ওদের কথা সত্য হইতে পারে। কিন্তু আমার কোনও উপায় ছিল না। প্রাপ্ত দুইটি রিপোর্টের ভিত্তিতে আমাকে কাজ করিতে হইবে। যে কিছু সংশোধন আমি করিতে রাযী হইয়াছিলাম, তাও আমি এখন পারি না। কাজেই প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি লইয়া আমি ব্যাপারটা কেবিনেটে পাঠাইলাম এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন করিলাম। কিন্তু ইতিমধ্যে আমার শত্রুর সংখ্যা ও শক্তি উভয়টাই বাড়িয়া গেল।
৭. তঞ্চকী লাইসেন্স
বোগাস লাইসেন্সিং-এর প্রকারান্তর ছিল তঞ্চকী লাইসেন্স। এমনি একটা ব্যাপারের দৃষ্টান্ত দেই। খুব বড় এক শিল্পপতি। বর্তমানে আরও বড় হইয়াছেন। হরেক রকমের শিল্প করেন। তৎকালে এরা পাইপ ম্যানুফেকচারিং করিতেন। খুব নিচের তলা হইতে একটি মোটা ফাইল আপিলের আকারে আমার সামনে পেশ হইল। আমি কি কারণে মনে নাই, ফাইলটির আগাগোড়া পড়িলাম। হঠাৎ খুব নিচের তলার একজন কোনির একটি নোট আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। তাতে লেখা আছে যে অমুক ব্যাপারটা সম্বন্ধে উক্ত অফিসার একাধিক বার উপরস্থ অফিসারের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছেন। কিন্তু কোনও ফল হয় নাই। উক্ত বড় শিল্পপতির কারখানার তৈয়ারী পাইপ সরকারের বিভিন্ন দফতরের পক্ষে ডি. জি. এস, এণ্ড ডি. খরিদ করিয়াছেন। কয়েক লক্ষ টাকার বিল বাকী পড়িয়া আছে। অনেকবার তাগাদায়ও কোম্পানি টাকাটা পাইতেছে না। এই জন্যই মন্ত্রী পর্যায়ে এই নালিশ আসিয়াছে। বিভিন্ন দফতর বিভিন্ন অজুহাতে নিজেদের বিলম্বের হেতু দেখাইয়াছে। বিল চেক হয় নাই, মাল শট সাপ্লাই আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এরই মধ্যে এক দফতরের নিম্নস্তরের উক্ত কর্মচারি এক্সেসিভ বিলিং এর হেতু খাড়া করিয়াছেন। ভদ্রলোকের নোটে বলা হইয়াছে, তিনি এর আগেও এই হেতু দিয়াছিলেন। কিন্তু উপরস্থ কর্তৃপক্ষ তাঁর কথায় কান দেন নাই। আমার কান খাড়া হইল। সুতরাং কান দিতে বাধ্য হইলাম। ফাইলটা আরও পিছন দিক হইতে পড়িলাম। বুঝিলাম পাইপ-নির্মাতা কোম্পানি আমদানি মালের যে দাম বলেন, আসলে তার অর্ধেক দামে মাল আনেন। কিন্তু বেশি দাম দেখাইয়া তৈয়ার খরচা বেশি লেখাইয়া সরকার ও পাবলিক উভয়ের নিকট হইতে প্রায় ডবল দাম আদায় করিয়া থাকেন। আমি ব্যাপারটা লইয়া অর্থমন্ত্রী মিঃ আমজাদ আলীর সঙ্গে পরামর্শ করিলাম। তাঁর উপদেশ মত বিদেশে খবর নিলাম। পাইপ তৈয়ারি হইত পশ্চিম জার্মানি হইতে আমদানি-করা স্টিলের পাত দিয়া। আমি বনে অবস্থিত পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূত কর্মাশিয়াল সেক্রেটারি ও ডি, জি, এস,এও ডি-র অফিসারের মারফত অতি সহজেই উক্ত পাতের জার্মান সরবরাহকারীর-নেওয়া দাম জানিতে পারিলম। হিসাব করিয়া দেখা গেল, উক্ত শিল্পপতি এইরূপ তঞ্চকতা করিয়া এই কয় বছরে সরকারকে বহু লাখ টাকা ঠকাইয়াছেন। পাবলিকের দেওয়া টাকার হিসাব ধরিলে কয়েক কোটি হইবে। আমি স্বভাবতই খুব কড়া আদেশ দিলাম। বিচারাধীনে বিলের টাকা আটক দিলাম। অতীতের দেওয়া টাকা কেন রিফাও হইবে না, তার কারণ দশাইবার অর্ডার দিলাম। লাইসেন্স বাতিল করিলাম। খুবই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী পার্টি। সুরাং ব্যাপারটা কেবিনেটে গেল। তথায় অর্থমন্ত্রী মিঃ আমজাদ আলী আমাকে জোর সমর্থন দিলেন। শিল্পপতি ন্যায্য দামের হিসাবে টাকা নিবেন এই শর্তে শেষ পর্যন্ত সংশোধিত হারে তাঁর লাইসেন্স বজায় রাখা হইল। সরকারের বহু টাকা বাঁচিয়া গেল। আমি উক্ত নিম্নস্তরের কর্মচারির প্রমোশনের সুপারিশ করিয়াছিলাম।কিন্তু শিল্পপতিটি বোধ হয় জীবনেও আমাকে মাফ করিতে পারেন নাই।
৮. নিউ কামার
বাণিজ্য দফতরে আমি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রবর্তন করিয়াছিলাম। এটি আমদানি ব্যবসায়ে ‘নিউ কামারের’ সুবিধা দান। পূর্ববর্তী সরকারেরা আমদানি ব্যবসায়টি একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করিয়াছিলেন। এদেবেলা হইত ‘কেটিগরি হোল্ডার’। ১৯৫২ সালে যাঁরা আমদানি-ব্যবসায়ে লিপ্ত ছিলেন, সরকার তাদের একটা তালিকা করিয়াছিলেন। এদের নামই কেটিগরি-হোন্ডার। শুধু এরাই আমদানি লাইসেন্স পাইতেন। আমি মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিয়া যখন ব্যাপারটা দেখিতে পাইলাম তখন ঘোষণা করিলাম এটা ন্যায়-নীতি গণতন্ত্র এমনকি ইসলামী সমাজ-ব্যবস্থার বিরোধী। কেটিগরি-হোল্ডার নামক শ্রেণী সৃষ্টি করিয়া কার্যতঃ মুসলিম সমাজে এক বৈশ্য সম্প্রদায় আমদানি করা হইয়াছে। ১৯৫২ সালে বা তার আশেপাশে পূর্ব-বাংগালীরা আমদানি ব্যবসায়ে কোনও উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ করে নাই। ফলে কেটিগরি হোন্ডারদের মধ্যে কি সংখ্যায় কি পরিমাণে পূর্ব বাংগালীর কোনও স্থান ছিল না বলিতে পারা যায়। এই ধরনের কেটিগরি-হোর শ্রেণী রাখিলে পূর্ব-বাংলার লোকেরা চিরতরে আমদানি ব্যবসা হইতে বাদ থাকিবে। এই ঘোষণায় কেটিগরি হোন্ডারদের মধ্যে হৈ চৈ পড়িয়া গেল। তাঁরা সবাই বিত্তশালী ও প্রভাবশালী লোক। তাঁদের প্রভাব কাটাইয়া উঠিতে সময় লাগিয়াছিল। অনেক সাধ্য-সাধনার পর বিশেষতঃ প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় সমর্থনের ফলে শেষ পর্যন্ত আমার প্রস্তাবিত ‘নিউ কামার’ নীতি গৃহীত হইল। ব্যবস্থা হইল, নূতন লোক বিশেষতঃ পূর্ব-পাকিস্তানী নূতন ব্যবসায়ীকে আমদানি লাইসেন্সের অধিকার দেওয়া হইবে এবং পুরাতন কেটিগরি হোল্ডারদের কার্য-তৎপরতা, সাধুতা, সততা বিচার করিয়া ঐ তালিকা সময়-সময় সংশোধন করা হইবে। এই ব্যবস্থা প্রবর্তনে পূর্ব-পাকিস্তানী ব্যবসায়ীদের মধ্যে যেমন উল্লাস সৃষ্টি হইল, পশ্চিম পাকিস্তানী বিশেষতঃ করাচির ব্যবসায়ী মহল আমার প্রতি উম্মায় তেমনি ফাটিয়া পড়িল।
