আমি মিঃ ইসমাইলকে গোপনে তদন্ত করিবার ভার এবং লিখিতভাবে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দান করিলাম। গোটা ব্যাপারটা প্রধানমন্ত্রীর গোচর করা দরকার মনে করিলাম। আশ্চর্য ও খুশী হইলাম। তিনি নিজেও কিছুদিন হইতে এই বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করিতেছিলেন এবং আমাকে কিছু-একটা করিতে বলিবেন বলিবেন মনে করিতেছিলেন। আমি মিঃ ইসমাইলকে গোপন তদন্তের ভার দিয়াছি শুনিয়া তিনি খুশি হইলেন। বুঝিলাম মিঃ ইসমাইলের প্রতি তারও বিশ্বাস আছে। তবে তিনি বলিলেন : এ ধরনের ব্যাপারে একজনের তদন্তে ক্রটি থাকিতে পারে। কাজেই আরেকজনকে দিয়া তদন্ত কান দরকার। তবে দু’জনের একজনও জানিবেন না যে আরেকজনও তদন্ত করিতেছেন। গোপনতদন্ত ষোলআনাই গোপনরাখিতে হইবে।
মনে-মনে প্রধানমন্ত্রীর বুদ্ধির তারিফ করিলাম। তাঁরই প্রস্তাব-মত কর্নেল নাসির নামে মিলিটারি ইনটেলিজেন্সের একজন অফিসারের উপর গোপন তদন্তের ভার দিলাম। মিঃ ইসমাইলের কথা তাঁকে ঘুণাক্ষরেও জানিতে দিলাম না। বলিলাম : ‘ব্যাপারটা সম্পূর্ণ গোপন রাখিবেন। কর্নেল মিলিটারি মানুষ। হাসিয়া জবাব দিলেন : সেকথা আর বলিতে হইবেনা, সার।
যথাসময়ের মাত্র দু-চার দিনের আগে-পরে উভয় রিপোর্টই পাইলাম। আশ্চর্য! উভয় রিপোর্টরই তথ্য-বিবরণই প্রায় এক। সত্যতা ও নির্ভুলতার অকাট্য প্রমাণ। উভয় রিপোর্টের সারমর্ম এই : (১) পশ্চিম পাকিস্তানে তাঁতের সংখ্যা একান্ন শ না, মাত্র বত্রিশ শ। (২) পূর্ব পাকিস্তানে পাঁচটি তাঁত আছে বটে, তবে চালু না। ইনস্টলই করা হয় নাই। (৩) পশ্চিম পাকিস্তানের বত্রিশ শ’র অধিকাংশ (প্রায় দুই হাজার) তাঁতের যে হিসাব সরকারে দাখিল হইতেছে এবং আমদানি লাইসেন্স পাইতেছে, সবই বোগাস। যে তাঁতগুলি চালু আছে তাদেরও ক্যাপাসিটি অনেক বেশি করিয়া দেখান হয়। অত সূতা খাইবার ক্ষমতা তাদের নাই। (৪) যে বত্রিশ শ তাঁতের অস্তিত্ব আছে, তারও মধ্যে প্রায় অর্ধেক (পনর শ) দেশী কারিগরের তৈয়ারী। এ কথার তাৎপর্য এই যে সমস্ত চালু তাঁতের বাবতই মালিকরা বিদেশী মুদ্রা নিয়াছেন বিদেশী তাঁতের মূল্য বাবৎ। অথচ এই তাঁতগুলি বিদেশ হইতে আমদানি করা হয় নাই। এইসব তাঁত মেরামত করিবার নাম করিয়া স্পেয়ার পার্টস বাবৎ যে বিদেশী মুদ্রা নেওয়া হয়, তাও পাটস আমদানিতে ব্যয় না করিয়া অন্য অসদুপায়ে ব্যয় করা হয়। (৫) বছরে যে সাড়ে তিন কোটি টাকার সূতা আমদানির লাইসেন্স দেওয়া হয় উপরোক্ত কারণে তার অর্ধেক সূতাও আমদানি হয় না। বাকী টাকা দিয়া উচ্চ চাহিদার মাল আনিয়া শতা চার-পাঁচ শ টাকা মুনাফায় বিক্রি করা হয়।
রিপোর্ট দুইটি বিস্তারিত তথ্য-বিবরণ-পূর্ণ বিশাল আকারের দলিল হইয়াছিল। নষ্ট করা না হইয়া থাকিলে আজও নিশ্চয়ই শিল্প-দফতরে বিদ্যমান আছে। এই রিপোর্ট দুইটি বিচারবিবেচনা করিয়া প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে আমি চলতি শিপিং পিরিয়ডের (ছয় মাসের) সব আমদানি লাইসেন্স এক হুকুমে বাতিল করিয়া দিলাম। করাচি ও সারা পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিবাদের ঝড় উঠিল। খবরের কাগযওয়ালারাও আমার উপর আগুন হইয়া গেলেন। পশ্চিমা অনেক মন্ত্রী ও মেম্বর এবং অফিসারদেরও কেউ-কেউ আমাকে বলিলেন : সৎ-অসৎ সবাইকে আমি এক সঙ্গে শাস্তি দিয়াছি। ফলে আট সিল্ক-শিত একদম মারা পড়িবে। জবাবে আমি বলিলাম যদি শিল্পপতিরা লাইসেন্সের পরিমাণ মত সূতা আমদানি করিয়া থাকেন, তবে এক শিপিং পিরিয়ডের আমদানিতে এক বছরের বেশি চলিবার কথা। কাজেই এই ছয়মাসে শিল্প বন্ধ হইবে না।
সহকর্মী ও অফিসাররা নানা যুক্তি দিলেন। হঠাৎ বিনা-নোটিসে বন্ধ করা উচিৎ হয় নাই। আগে নোটিস দিলে এক বছরের খোরাকি জমা রাখিত। জেনুইন মিল কতকগুলি আছে যাদের কাজে ও হিসাবে কোনও ক্রটি নাই। অন্তত এইসব মিলের লাইসেন্স দেওয়া উচিৎ। ইত্যাদি ইত্যাদি। কারও উপর অবিচার ও পক্ষপাতিত্ব না করিয়া কি করা যায়, অফিসারদের সঙ্গে সে বিষয়ে পরামর্শ করিতেছিলাম। এমন সময় খবরের কাগযে এক রিপোর্ট বাহির হইল। তেষট্টি লক্ষ টাকা আদান-প্রদানের ফলে শিল্প-দফতরের আট-সিল্ক-বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা শীঘ্রই প্রত্যাহৃত হইবে।
এই সময় ন্যাশনাল এসেমব্লির বৈঠক চলিতেছিল। বন্ধু ফরিদ আহমদ হাউসের ফ্লোরে, প্রশ্ন করিলেন এ বিষয়ে শিল্পমন্ত্রীর কি বলিবার আছে? আমি উত্তরে বলিলাম : ‘কতিপয় পশ্চিম পাকিস্তানী সহকর্মীর অনুরোধে ও উচ্চপদস্থ বিভাগীয় অফিসারদের পরামর্শে আমি উক্ত নিষেধাজ্ঞার আংশিক সংশোধনের চিন্তা করিতেছিলাম। কিন্তু এই গুজব প্রকাশের পর এ বিষয়ে আর কোনও উপায় থাকিল না।
পার্লামেন্ট শান্ত হইল বটে, কিন্তু শিল্পপতিরা অশান্ত হইয়া উঠিলেন। আমার সঙ্গে মোলাকাত চাহিলেন। আমি দেখা দিলাম না। আসিল্ক এসোসিয়েশনের পক্ষ হইতে বর্ডার-ঘেরা এক বিশালাকারের বিজ্ঞপ্তিতে তাঁরা মাফ চাহিলেন এবং পর পর কয়েক দিন ধরিয়া ঐ বিজ্ঞপ্তি বড়-বড় দৈনিকে ছাপা হইল। তাতে যা বলা হইল তার সারমর্ম এই ঐ গুজবের মূলে তাঁদের কোনও হাত নাই। শিল্পপতিদের অনিষ্ট করার উদ্দেশ্যেই শত্রুপক্ষ হইতে ঐ গুজব রটান হইয়াছে। গুজবটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আট সিল্ক-শিল্প মালিকদের পক্ষ হইতে এ ব্যাপারে কোনও আদান-প্রদান করা বা তার কথা হয় নাই। শিল্প মালিকরা এই গুজবের জন্য শিল্প মন্ত্রীর খেদমতে ক্ষমা চাহিতেছেন। এই গুজবে প্রভাবিত না হইয়া আট-সিল্ক-মালিকদের প্রতি সুবিচার করিবার জন্য মন্ত্রী মহোদয়কে অনুরোধ করা যাইতেছে। ইত্যাদি।
