আরেক প্রকার লাইসেন্সিং চলিতেছিল। তাকে বলা যায় বোগাস লাইসেন্সিং। আদতে শিল্পের নামগন্ধ নাই। অথচ এইসব অস্তিত্বহীন ‘শিল্পের জন্য যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের ইণ্ডাস্ট্রিয়াল লাইসেন্স এবং তৈয়ারী মালের কর্মাশিয়াল লাইসেন্স বছরের-পর বছর ইশু হইয়া আসিতেছে। এইরূপ অনেকগুলি বোগাস লাইসেন্সিং এর অভিযোগ আমার কানে আসে। আমি বিনাদ্বিধায় এক-ধারসে এদের লাইসেন্স বাতিল করিয়া দেই। এইরূপ একটি ঘটনার কথা উল্লেখ না করিয়া পারিতেছি না। ইতিহাস বিখ্যাত একজন মুসলিম বৈজ্ঞানিকের নাম অনুসারে এই কোম্পানির কত অজানারে গালভরা নাম। প্রতি শিপিং পিরিয়ডে অর্থাৎ ছয়মাসে এগার লাখ করিয়া এই কোম্পানি ইণ্ডাষ্ট্রিয়াল ও কর্মাশিয়াল লাইসেন্স বাবৎ বছরে বাইশ লক্ষ টাকার লাইসেন্স পাইয়া আসিতেছিল। আমি পরপর কয়েকটি বেনামাপত্র পাই। অভিযোগ গুরুত্তর। কাজেই যাঁকে-তাঁকে দিয়া তদন্ত করান চলিবে না। স্বয়ং শিল্প-সেক্রেটারি মিঃ মোহাম্মদ খুরশিদের উপর এই তদন্তের ভার দিলাম। বলিয়া দিলাম তাঁর নিজের তদন্ত করিতে হইবে।
যথাসময়ে তার রিপোর্ট পাইয়া স্তম্ভিত হইলাম। যতদূর মনে পড়ে তাঁর রিপোর্টের সারমর্ম ছিল এই : করাচির বাহিরে এক রাস্তার ধারে একটি ভাঙ্গা দালানে ঐ নামে একটি সাইনবোর্ড লটকানো। দালানের বারান্দায় কয়েকটি ভেড়া বান্ধা। পাশেই দড়ির খাঁটিয়ায় একটি বুড়া শুইয়া ঘুমাইতেছে। তাকে ডাকিয়া তুলিয়া ঔষধের কারখানার কথা জিগাসা করিলে বুড়া ভড়কাইয়া গেল। সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারায় ভিতর-বাহির তালাশ করিয়া একটি একসারসাইজ বুক পাওয়া গেল। তাতে করাচি শহরের তিন জায়গার-ঠিকানা-দেওয়া তিনজন লোকের নাম পাওয়া গেল। তাদের মধ্যে দুইজনকে পাওয়া গেল। অবশেষে তারা স্বীকার করিল যে তারা কথিত কোম্পানি হইতে মাসে একশ টাকা বেতন পায়। ঔষধ বিক্রির তারা এজেন্ট মাত্র এই কথা বলাই তাদের কাজ। ঔষধ বিক্রি তারা কোনও দিন করে নাই। সেক্রেটারির সুপারিশ মত আমি তৎক্ষণাৎ ঐ লাইসেন্স বাতিল করিয়া দিলাম। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি লাগাইবার ব্যবস্থা করিতে সেক্রেটারিকে নির্দেশ দিলাম। সেই দিন বা পরের দিন রাত্রে প্রেসিডেন্টের বাড়িতে এক ডিনারে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ও প্রাইম মিনিস্টার এক ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলার সাথে আমার পরিচয় করাইয়া দিলেন। উতয়ে প্রায় এই ধরনের কথা বলিলেন : এঁরা আমার বিশেষ বন্ধু লোক। এদের কোনও উপকার করিলে আমি ব্যক্তিগতভাবে উপকৃত হইব। আমি ওদের সঙ্গে আলাপ করিয়া জানিলাম, ঐ কোম্পানি এঁদেরই। সরলভাবে তারা স্বীকার করিলেন, ওটা অপরাধ হইয়াছে। কৈফিয়ত দিলেন, করি-করি করিয়াও প্রবল ইচ্ছা সত্ত্বেও কারখানাটা আজো করিয়া উঠিতে পারেন নাই। সেজন্য তাঁরা দুঃখিত। অতএব তাঁদের বিরুদ্ধে। কোনও ব্যবস্থা গ্রহণে বিরত হইতে হইবে। তাঁদের লাইসেন্সটা অন্ততঃ অংশতঃ মঞ্জুর করিতে হইবে। তাঁরা বাদশাহী বংশের লোক। বর্তমানে অভাবে আছেন। আমাদের দেশের টগরিব ভদ্রলোক’ আর কি? ঐ করিয়াই তাঁরা দুইটা পয়সার মুখ দেখেন। নিজেদের অপরাধকে লঘু করিবার উদ্দেশ্যে যুক্তি দিলেন, নিজেরা কারখানা করিতে না পারিলেও তাঁদের লাইসেন্স তাঁরা কালাবাজারে বিক্রয় করো না। জেনুইন ঔষধের কারখানাওয়ালার কাছে সামান্য মাত্র লাভে বিক্রয় করেন। কাজেই আমার বিবেচনা করা উচিৎ যে সরকারের বিদেশী মুদ্রার ঐ লাইসেন্স অপব্যয়িত হয় না, বরঞ্চ সৎকাজেই লাগে।
আমি ভদ্রলোক ও ভদ্র মহিলার দুঃসাহসিক বুকের পাটা দেখিয়া স্তম্ভিত হইলাম। বলা বাহুল্য তাঁদের প্রতি আমি বিন্দুমাত্র দরদ দেখাইতে পারিলাম না। কিন্তু ফৌজদারিও লাগাইতে পারিলাম না।
৬. আর্টসিল্ক ইণ্ডাস্ট্রি
বোগাস লাইসেন্সের কথা বলিতে গিয়া মনে পড়িতেছে একটি এজমালি বোগাস লাইসেন্সের লুটপাটের কথা। এটি আর্ট-সিল্কের ব্যাপার। আর্টিফিশিয়াল সিল্ক নকল রেশম) শিল্প পশ্চিম পাকিস্তানের একটি বিলাসদ্রব্য-শিল্প। আমি শিল্প বাণিজ্য মন্ত্রী হওয়ার সাথে-সাথেই এই শিল্পপতিদের মোলাকাত দাওয়াত ও অভিনন্দনের হিড়িক দেখিয়া আমার মনে সন্দেহ হয়। আমি অফিসারদের মতামত লইতে শুরু করি। এঁদের মধ্যে মিঃ ইসমাইল নামে জনৈক ডিপুটি সেক্রেটারিকে আমার খুব পসন্দ হয়। অফিসারটি সৎ ও ধার্মিক বলিয়া মনে হয়। তিনি এ ব্যাপারে আমাকে অনেক জ্ঞান ও পরামর্শ দান করেন। এই সময় পাকিস্তান সরকার বছরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার বিদেশী মুদ্রা আটসিল্ক শিল্পে ব্যয় করিতেন। বোঝা গেল, প্রচুর অপব্যয় অবিশ্বাস্য দুর্নীতি ঐ ব্যাপারে চলিতেছে। কাগ-পত্রে দেখা গেল পশ্চিম পাকিস্তানে প্রায় পাঁচ হাজার একশ ও পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র ছিয়ানব্বইটা তাঁত চালু আছে। আমার প্রাদেশিক সংকীর্ণ মন প্রথম চোটেই ঐ বিপুল অসাম্যে আহত হইল বটে, কিন্তু দ্বিতীয় চিন্তায় অন্য কথা মনে আসিল। কাগযে-পত্রে ঐ তাঁত চাটগাঁয়ে প্রতিষ্ঠিত বলিয়া দেখা যায়। কিন্তু তথায় কিম্বা পূর্ব পাকিস্তানের কোনও শহরে নকল সিল্কের তাঁত দেখিয়াছি বলিয়া মনে পড়িল না। আমি আগামী সফরে চাটগাঁয় গিয়া ঐ শিল্প পরিদর্শন করিব একথা অফিসে রটনা করিয়া দিলাম। তাতে ফল হইল। সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাঁদের আগের রিপোর্ট সংশোধন করিয়া বলিলেন, পূর্ব-পাকিস্তানের তাঁত সংখ্যা ছিয়ানব্বই নয়, ছয়চল্লিশ। আমার যা বুঝিবার বুঝিলাম। সত্য-সত্যই চাটগাঁয়ে ছয়চল্লিশ কেন ছয়টি তাঁতও পাইলাম না।
