বাণিজ্য-সেক্রেটারি মিঃ আযিয আহমদ কড়া লোক। তিনি নিজের যিদ ছাড়িলেন। অন্য পথ ধরিলেন। দুই দুইবার একই ব্যক্তির হাতে মার খাইয়া তিনি অন্যদিকে এর প্রতিকারের উপায় বাহির করিলেন। একই ব্যাক্তি মানে একই মালিক। যে দুইটি জাহাজের ঘটনা উপরে বলা হইল, উভয়টির মালিক একই ব্যক্তি। এডমিরাল চৌধুরী কমিশনের রিপোর্টে এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনেক কুকীতির কথা বলা হইয়াছে। ঐ রিপোর্ট ভিত্তি করিয়া সেক্রেটারি নৌ-আইন অনুসারে চারটে ফৌজদারি মোকদ্দমা দায়ের করার প্রস্তাব করিলেন। আমি তাঁর সাথে একমত হইলাম। তিনি সব মোকদ্দমার পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র তৈয়ার করিয়া পাবলিক প্রসিকিউটরের অনুকূল মন্তব্য সহ আমার দস্তখতের জন্য পেশ করিলেন। বলিলেন : শিগগির দস্তখত দিবেন। দেরি হইলে উপর হইতে চাপ আসিবে।
সত্য-সত্যই উপর হইতে চাপ আসিল। আমি দেওয়ানি উকিল। খুটি-নাটি না দেখিয়া কাগয় সই করি না। সেক্রেটারি সাহেবের হুশিয়ারি ও তাগিদ সত্ত্বেও সই করিবার জন্য মাত্র একটা দিন সময় নিলাম। সেক্রেটারি সাহেবকে বিদায় করার দুই এক ঘন্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্টের ফোন পাইলাম। মামলার আয়োজনের কথা তাঁর কানে গিয়াছে। আপাততঃ ঐ সব বন্ধ রাখিতে এবং তাঁর সাথে কথা না বলিয়া মামলা দায়ের না করিতে তিনি আমাকে অনুরোধ করিলেন। প্রেসিডেন্টের ফোন রাখিয়াই প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করিলাম। তিনি বলিলেন : প্রেসিডেন্ট স্বয়ং যখন অনুরোধ করিয়াছেন, তখন শুধু তাঁর খাতিরে দুই-একদিন বিলম্ব করা তোমার উচিৎ।
আমি অতঃপর প্রধানমন্ত্রীর সহিত দেখা করিলাম। সেক্রেটারির সহিত পরামর্শ করিলাম। সেটা ছিল বোধ হয় বৃহস্পতিবার। সোমবার পর্যন্ত স্থগিত রাখিতে সেক্রেটারি সাহেব রাজি হইলেন। আমি ঐ মর্মে অর্ডার শীটে অর্ডার লিখিয়া সমস্ত কাগপত্র সেক্রেটারিকে দিয়া দিলাম। তিনি সোমবারের মধ্যেই নথিপত্র পাবলিক প্রসিকিউটর মিঃ রেমও (বর্তমানে পশ্চিম পাকিস্তান হাই কোর্টের জজ) সাহেবের কাছে পাঠাইবার ব্যবস্থা করিলেন। আমি প্রধানমন্ত্রীকে এবং প্রেসিডেন্টকে জানাইলাম ও তাঁদের আদেশ আমি রক্ষা করিয়াছি।
যথাসময়ে চার-চারটা মামলা দায়ের হইয়া গেল। বড়লোক আসামী বিলাত, হইতে ব্যারিস্টার আনিলেন। সমানে-সমানে লড়াইর জন্য সরকার পক্ষ হইতেও। বিলাতী ব্যারিস্টার আনার কথা উঠিল। পাবলিক প্রসিকিউটর মিঃ রেমও বলিলেন তিনিই যথেষ্ট। আমি তাঁর সাথে একমত হইলাম। মামলা এত পরিষ্কার যে বিলাতী ব্যারিস্টারের দরকার নাই। তাই হইল। একটা মামলায় সরকারের জিত হইল। বাকী তিনটা মামলা বিচারাধীন থাকাকালেই সুহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার পতন ঘটিল। পরে শুনিলাম ঐ সব মামলা প্রত্যাহার করা হইয়াছে।
৫. ডবল ও বোগাস লাইসেন্সিং
বাণিজ্য দফতরের ডবল লাইসেন্সিং ও বোগাস লাইসেন্সিং এর দিকে আমার নযর পড়িল। বোগাস লাইসেন্সিংটা দুর্নীতি। কিন্তু ডবল লাইসেন্সিং দুর্নীতি নয়। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় নিয়ম মোতাবেকই এই প্রথা চালু ছিল। লাইসেন্সিং দুই প্রকারের : একটা কমার্শিয়াল, অপরটা ইণ্ডাস্ট্রিয়াল। এছাড়া এক প্রকার লাইসেন্সিং আছে, সেটা কর্মাশিয়ালও নয় ইণ্ডাস্ট্রিয়ালও নয়। সরকারী, আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কলেজ-ইউনির্ভাসিটিকে এবং কোন-কোনও বিশেষ অবস্থায় ব্যক্তিকে নিজ-নিজ প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য বিদেশ হইতে যন্ত্রপাতি আমদানির জন্যও লাইসেন্স দেওয়া হয়। কিন্তু আমার এখানকার বক্তব্য তাদের সম্বন্ধে নয়। শুধু প্রথমোক্ত কর্মাশিয়াল ও ইণ্ডাস্ট্রিয়াল লাইসেন্সিং এখানকার আলোচ্য। আমি মন্ত্রিত্ব গ্রহণের কয়েকদিন মধ্যেই কোন কোনও অফিসার এবং পাবলিকের কেউ-কেউ ডবল লাইসেন্সিং-এর দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং এটা যে পরিণামে জনসাধারণেরই ক্ষতিকর তা বুঝাইয়া দেন। একই ব্যক্তিকে উভয় প্রকার লাইসেন্স দেওয়ার নাম ডবল লাইসেন্সিং। কর্মাশিয়াল লাইসেন্সওয়ালারা বিক্রির উদ্দেশ্যে বিদেশ হইতে মাল আমদানি করেন। আর ইণ্ডাস্ট্রিয়াল লাইসেন্সওয়ালারা নিজ-নিজ শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির জন্য লাইসেন্স পান। সুতরাং কর্মাশিয়াল লাইসেন্স সওদাগর-ব্যবসায়ীদের জন্য। আর ইণ্ডাস্ট্রিয়াল লাইসেন্স শিল্পপতিদের জন্য। শিল্পপতিদের কর্মাশিয়াল লাইসেন্স দিলেই এটা হয় ডবল লাইসেন্সিং। ধরুন, ঔষধ তৈয়ারের একটি কারখানাকে যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির ইণ্ডাষ্ট্রিয়াল লাইসেন্স দিলেন। তার উপরেও তৈয়ারী ঔষধ আমদানির কর্মাশিয়াল লাইসেন্স তাকেই দেওয়া হইল। এতে জনসাধারণের কিভাবে ক্ষতি হইল, তার বিচার করা যাউক। দেশী কারখানার তৈয়ারী ঔষধ আমদানি করা বিদেশী ঔষধ একই মালিক-বিক্রেতার হাতে পড়িল। তাতে তারা কৌশলে কৃত্রিম ঘাটতি ও অভাব সৃষ্টি করিয়া উভয় প্রকার ঔষধের দাম বাড়াইয়া অতিরিক্ত মুনাফা লুটিতে পারে। কার্যতঃ অনেকে তাই করিতেছিল। এ ধরনের প্রথম অভিযোগ আসে কয়েকটি ঔষধ তৈয়ারীর কারখানার বিরুদ্ধে। এরা সকলেই নামকরা বিদেশী কোম্পানী। আইন বাঁচাইবার জন্য এরা পাকিস্তানে কোম্পানি রেজিস্টারি করিয়াছে। কিন্তু লোক-দেখানো-গোছের নাম মাত্র ঔষধ এদেশে তৈয়ার করে। আসলে যার-তার দেশের ঔষধ-পত্র মাস-স্কেলে বাহু আমদানি করিয়া এ দেশে শুধু বটলিং ও লেভেলিং করে। বোতলও এদেশে কিনে না। লেভেলও এদেশে ছাপে না। সব যার-তার দেশ হইতে আনে। তবু এদের ঔষধের নাম ‘মেড-ইন-পাকিস্তান’। এরা যে লুটতরাজ করিতেছে তার প্রমাণ বাজারের দাম। জনসাধারণ যে অভিযোগ করিতেছে তার প্রমাণ দফতরেই অনেক নালিশ অভিযোগ পত্র পড়িয়া আছে। অফিসারের সাথে পরামর্শ করিলাম। প্রায় সবাই এক বাক্যে ডবল লাইসেন্সিং এর বিরুদ্ধে সুপারিশ করিলেন। আমি ডবল লাইসেন্সিং উঠাইয়া দেওয়ার আদেশ দিলাম। ভাবিলাম, তবে এতদিন এই ব্যবস্থা চলিল কেমন করিয়া? আমার আদেশ জারী হওয়ায় ঐসব কোম্পানির স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আমার সহিত সাক্ষাত করিয়া আমার আদেশের প্রতিবাদ জানাইলেন। স্থানীয় শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদেরও কেউ-কেউ তাঁদের পক্ষে সুপারিশ করিতে আমার সঙ্গে সাক্ষাত করিলেন। এই অন্যায় ব্যবস্থা এতদিন কেন চলিতেছিল, এখন তার কারণ বুঝিলাম। কোম্পানিগুলি আসলে বিদেশী হইলেও এ সবের পাকিস্তানী সংস্থায় স্থানীয় শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ অংশীদার। এদের সুপারিশে আমি টলিলাম না। এঁরা আমার উপর গোস্সা হইলেন।
