সেক্রেটারি সাহেবের সহিত গোপন পরামর্শ করিয়া এ সম্পর্কে পাকা ব্যবস্থা করিলাম। অতিরিক্ত সাবধানতা স্বরূপ আযিয আহমদ সাহেব এবার জয়েন্ট সেক্রেটারি মিঃ ইউসুফ সাহেবকেও এ-বিষয়ে সংগে লইলেন। উভয়ে পরামর্শ করিয়াই আট ঘাট বাঁধিলেন। মিঃ ইউসুফ খুব মেথডিক্যাল মানুষ। কাজেই এবার চোর ধরা পড়িবেই মনে করিয়া আমি নিশ্চিন্ত হইলাম। আবার আমি কাজের চাপে সব ভুলিয়া গেলাম। কিছুদিন পরে আরেকটা বেনামা পত্র পাইলাম। তাতে দুঃখ করিয়া লেখা হইয়াছে, আগে হইতে সাবধান করা সত্ত্বেও আমরা কিছুই করিলাম না। উক্ত লক্কড় জাহাজটি যথাসময়ে করাচিতে পৌঁছিয়া সিওয়ার্দির সমুদ্রে চলাচলের উপযোগী। সাটিফিকেট লইয়া রেজিস্ট্রেশন পাইয়া সার্ভিসে কমিশন্ড় নিয়োজিত) হইয়া গিয়াছে। এই পত্রখানিও বাণিজ্য সেক্রেটারি ও জয়েন্ট সেক্রেটারিকে দেখাইলাম। আমার মত তাঁদেরও তালু-জিত লাগিয়া গেল। কি ভৌতিক ব্যাপার! অনারেবুল মিনিস্টার, দোর্দন্ডপ্রতাপ সেক্রেটারি, কর্তব্য-চেতন জয়েন্ট সেক্রেটারি সবারই চোখে ধুলা দিয়া, কার্যতঃ আমাদেরে বুড়া আংগুল দেখাইয়া, রাষ্ট্র ও সমাজের শত্রুরা তাদের মতলব হাসিল করিয়া যাইতেছে। অথচ তারা আমাদের হাত দিয়াই ত তামাক খাইয়া যাইতেছে। আমাদেরই দফতরের কোনও স্তরে আমাদের আদেশ আটকাইয়া বা বাতিল হইয়া যাইতেছে। মনে পড়িল প্রধানমন্ত্রী সুহরাওয়ার্দীর এক দিনের হংকারের কথা। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই তিনি একটি আদেশ দিয়াছিলেন। পাঁচ মাস পরে তিনি জানিতে পারিলেন, তাঁর আদেশ তখনও কার্যকারী হয় নাই। সংশ্লিষ্ট দফতরের সেক্রেটারি সহ কতিপয় সেক্রেটারির সামনে তিনি হুংকার দিয়া বলিয়াছিলেন : ‘আমি জানিতে চাই আমিই প্রধানমন্ত্রী না আর কেউ?’ এর পর তাঁর সেই আদেশ কার্যকরী হইয়াছিল। বাণিজ্য-সেক্রেটারিদ্বয়ের ও-ব্যাপার জানা ছিল। আমি তাঁদেরে সে কথা স্মরণ করাইয়া বলিলাম। আমাদেরও সেই দশা নয় কি? তাঁরা উভয়ে এই অবস্থার প্রতিকারের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা জানাইলেন।
যথা সময়ে এডমিরাল চৌধুরী কমিশনের রিপোর্ট পাইলাম। ঐ রিপোর্ট বুঝাইতে তিনি আমার সাথে দেখাও করিলেন। আমরা বিস্তারিত আলোচনা করিলাম। উভয়ে সম্পূর্ণ একমত হইলাম। বেনামা পত্রগুলির সব অভিযোগই সত্য। এ ছাড়াও আরও বহু কেলেংকারি আছে। তিনি সুপারিশ করিলেন। একমাত্র প্রতিকার ন্যাশনাল শিপিং কর্পোরেশন গঠন করিয়া কোস্টাল শিপিং পুরাপুরিভাবে কর্পোরেশনের হাতে তুলিয়া দেওয়া। এডমিরালের সুপারিশ আমার খুবই পছন্দ হইল। দুই অংশের মধ্যে নিয়মিত মাল বহন ছাড়াও গরিব জনসাধারণের যাতায়াত সহজ ও সস্তা করিয়া উভয় পাকিস্তানের মধ্যে অধিকতর যোগাযোপ স্থাপনের ব্যবস্থা হইবে। উভয় পাকিস্তানের মধ্যে একাত্মবোধ সৃষ্টি করিয়া পাকিস্তানী জাতি গড়িতে হইলে জনগণের মিলা মিশারব্যবস্থা অত্যাবশ্যক। রাজধানীর সাথে পূর্ব-পাকিস্তানী জনগণের সস্তা যোগাযোগ স্থাপন শুধুমাত্র জাহাজ-পথেই হইতে পারে। পি. আই. এ.-র যোগাযোগটা বড় লোক ও মধ্যবিত্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কাজেই এডমিরাল চৌধুরীর সুপারিশে আমি অত্যন্ত উৎসাহিত হইলাম।
৪. উপকূল বাণিজ্য জাতীয়করণ
আমি সেক্রেটারি মিঃ আযিয আহমদ ও জয়েন্ট সেক্রেটারি মিঃ ইউসুফের সাথে পরামর্শ করিয়া ন্যাশনাল শিপিং কর্পোরেশন গঠন করা স্থির করিলাম। কোস্টাল শিপিং সম্পর্কে খুঁটি-নাটি জানিবার জন্য মিঃ ইউসুফকে বোম্বাই পাঠান হইল। কিছুদিন আগে হইতেই ভারত সরকার এই উদ্দেশ্যে ইস্টার্ন শিপিং কর্পোরেশন নামে বোম্বাই এ একটি কর্পোরেশন চালাইয়া আসিতেছিলেন। তিনি বোম্বাই হইতে ফিরিয়া ন্যাশনাল শিপিং কর্পোরেশন বিলের কাঠামো খাড়া করিলেন। আমার অনুমোদনক্রমে বিলের মুসাবিদা রচনার জন্য আইন দফতরে উহা পাঠান হইল। জাহাজের মালিকরা প্রেসিডেন্ট মির্যা ও প্রধানমন্ত্রী শহীদ সাহেবের কাছে হত্যা দিয়া পড়িলেন। মালিকদের প্ররোচনায় খবরের কাগযে হৈ চৈ পড়িয়া গেল : বাণিজ্য মন্ত্রী আবুল মনসুর দেশে কমিউনিয়ম আনিতেছেন। ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ করিতেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রী আমাকে জাহাজের মালিকদেরে আমার দফতরে ডাকিয়া বুঝাইতে উপদেশ দিলেন। আমি তদনুসারে জাহাজের মালিকদের সভা ডাকিলাম। তাঁদেয়বুঝাইলাম। কর্পোরেশন তাঁদেরে শেয়ার দেওয়া হইবে, তাঁদেরে জাহাজগুলি কর্পোরেশনের কাছে উপযুক্ত মূল্যে বেচিতে চাইলে কর্পোরেশন খরিদ করিয়া নিবে, এমন কি কর্পোরেশনের ডিরেক্টর বোর্ডে তাঁদের প্রতিনিধি নেওয়া হইবে, সব কথা বুঝাইলাম। এতে কমিউনিয়মের কিছু নাই, তা বলিলাম। প্রথমে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী সাহেব পি. আই. এ. স্থাপন করিতে গেলে তৎকালীন ওরিয়েন্ট এয়ার ওমেঘনামক কোম্পানির মালিকরা যে হৈ চৈ করিয়াছিলেন, তার দৃষ্টান্ত দিলাম। কর্পোরেশনের শুধু উপকূল বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকিবে। বৈদেশিক বাণিজ্যে মালিকরা নিজ-নিজ ব্যবসা অবাধে চালাইয়া যাইতে পারিবেন, এসবকথাও বলিলাম।
কিছুতেই কিছু হইল না। মালিকরা খবরের কাগযে আন্দোলন করিয়াই চলিলেন। অনেকগুলি কাগ সম্পাদকীয় লিখিয়া আমার কাজের নিন্দা করিতে লাগিলেন। প্রস্তাবিত কর্পোরেশন টন প্রতি পঞ্চাশ টাকাও জনপ্রতি তৃতীয় শ্রেণীর ভাড়া কুড়ি টাকা বাঁধিয়া দিলে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের মধ্যে জনগণের ইনটিগ্রেশন যে কত ত্বরান্বিত হইবে আমার এসব কথা অরণ্যে রোদন হইল। অনেকে মনে করেন, সুহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার পতনের অন্যতম প্রধান কারণ আমার এই প্রস্তাব। অসম্ভব নয়। প্রেসিডেন্টের সহিত জাহাজের মালিকদের যোগাযোগ পুরাদমে চলিল। প্রেসিডেন্ট আমাকে ধমকাইলেন। প্রধানমন্ত্রী আমাকে আস্তে চল’-নীতি গ্রহণের উপদেশ দিলেন। আমি আস্তে চলিলাম।
